মেহেরপুরের ৭২টি কমিউনিটি ক্লিনিকে তীব্র ওষুধ সংকট দেখা দিয়েছে। এক সময় এসব ক্লিনিকে ২৭ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হলেও পরে তা কমিয়ে ২২ প্রকারে আনা হয়। আর বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গর্ভবতী মায়েদের জন্য আয়রন ট্যাবলেট ছাড়া প্রায় কোনো ওষুধই মিলছে না। কোথাও কোথাও সীমিত পরিমাণে ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট পাওয়া গেলেও অধিকাংশ ক্লিনিকের ওষুধের আলমারি ফাঁকা পড়ে রয়েছে।
দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে চলমান এই সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন জেলার প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষ। বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবার অন্যতম ভরসাস্থল কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে গিয়ে প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে হতাশ হয়ে খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে রোগীদের।
মেহেরপুর জেলার তিনটি উপজেলায় প্রতি ৬ হাজার মানুষের জন্য একটি করে মোট ৭২টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সর্বশেষ গত বছরের আগস্ট মাসে এসব ক্লিনিকে ওষুধ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সেই ওষুধ নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। এরপর চলতি বছরে নতুন করে কোনো ওষুধ সরবরাহ না আসায় তীব্র এই সংকট তৈরি হয়েছে।
জোড়পুকুরিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ নিতে আসা সারমিনা খাতুন বলেন, আমরা এখানে ঠান্ডা, জ্বর, কাশি, ব্যথা, গ্যাস, আমাশয়সহ বিভিন্ন রোগের ওষুধ বিনামূল্যে পেতাম। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কোনো ওষুধ পাচ্ছি না। ওষুধ নিতে এলেই বলা হয়, ওষুধ নেই। সরকারি ওষুধগুলো খুব ভালো, খেলে দ্রুত কাজ হয়। মাঝে, মাঝেই আসি, আর হতাশ হয়ে ফিরে যায়। আমরা গরিব মানুষ, বাইরে থেকে বেশি টাকা দিয়ে ওষুধ কিনতেও পারি না। তাই বাধ্য হয়ে এখানেই আসি।
একই অভিযোগ করেন তোহিদা খাতুন। তিনি বলেন, গরিব মানুষের জন্য এই ক্লিনিকগুলো খুবই জরুরি। ওষুধ না থাকায় আমাদের কষ্ট বাড়ছে। ভাড়া খরচ করে শহরে গিয়ে ওষুধ নেওয়াও সব সময় সম্ভব হয় না। বাড়ির কাছে কমিউনিটি ক্লিনিক থাকায় প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা নেওয়া আমাদের জন্য অনেক সুবিধাজনক ছিল।
ওষুধ নিতে আসা মনিরা খাতুন বলেন, আমরা গরিব মানুষ, বাইরে থেকে টাকা দিয়ে ওষুধ কেনা সম্ভব হয়ে ওঠে না। আগে এখানে বিনামূল্যে ওষুধ পেতাম। কিন্তু অনেক দিন ধরে কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু আসছি, পরামর্শ নিয়ে ফিরে যাচ্ছি। তাই দ্রুত কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে দ্রুত ওষুধ সরবরাহের দাবি জানাই।
এদিকে, ওষুধ সংকটের কারণে রোগীদের অসন্তোষের মুখে পড়তে হচ্ছে কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীদেরও।জোড়পুকুরিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি তানিয়া খাতুন বলেন, প্রায় পাঁচ মাস ধরে কোনো ওষুধ পাইনি। প্রতিদিন রোগীরা এসে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। এতে আমাদেরও বিব্রত হতে হচ্ছে। রোগীরা যাতে মনঃক্ষুণ্ণ না হন, সে জন্য আমরা স্বাস্থ্য পরামর্শ দিচ্ছি। যাদের অবস্থা গুরুতর, তাদের হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। গর্ভবতী নারীদের গর্ভকালীন পরিচর্যা বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং আয়রন ট্যাবলেট সরবরাহ করা হচ্ছে। বর্তমানে আমাদের এখানে শুধু আয়রন ট্যাবলেটই রয়েছে।
তেরাইল কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি খাইরুল বাশার বলেন, প্রায় চার থেকে পাঁচ মাস ধরে ক্লিনিকগুলোতে ওষুধ সরবরাহ নেই। কয়েকটি আয়রন ও কৃমিনাশক ট্যাবলেট ছাড়া অন্য কোনো ওষুধ নেই। অধিকাংশ রোগী প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছেন না। তবে খুব দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছি।
ধর্মচাকী কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি শিরিনা আক্তার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কোনো ওষুধ পাইনি। প্রতিদিন রোগীরা আসছেন, আবার খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন। ওষুধ কবে আসবে, সে বিষয়েও আমরা কিছু জানি না। সাধারণ ও দরিদ্র মানুষ এখান থেকে ওষুধ নিয়ে অনেক উপকার পেতেন। এখন কোনো ওষুধ না থাকায় তারা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।
মেহেরপুর সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মোট ৭২টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এর মধ্যে মেহেরপুর সদর উপজেলায় ২৬টি, গাংনী উপজেলায় ৩৫টি এবং মুজিবনগর উপজেলায় ২২টি। শুরুতে কিছু ওষুধের সংকট থাকলেও গত পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে প্রায় সব ধরনের ওষুধ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. একে এম আবু সাঈদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা ওষুধের চাহিদাপত্র পাঠিয়েছি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ আসছে না। তবে সম্প্রতি একটি বরাদ্দপত্র পেয়েছি। পর্যায়ক্রমে ওষুধ সরবরাহ শুরু হবে বলে আশা করছি।
কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে কতদিন ধরে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত আগস্টের পর থেকে মেহেরপুর সদর ও মুজিবনগর উপজেলায় ওষুধ আসেনি। এর মধ্যে গাংনী উপজেলায় সম্ভবত একবার সরবরাহ দেওয়া হয়েছিল।
প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন চিকিৎসাসেবা-প্রার্থীরা।





