চব্বিশের গণঅভুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নেন ভারতে। আর দেশটিতে বসেই জুলাই গণহত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির সাজা পান ক্ষমতাচ্যুত এই প্রধানমন্ত্রী। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডাদেশ পেলেও আইনের সব দরজা বন্ধ হয়ে গেছে কি না—সেই উত্তর খুঁজছেন অনেকেই। আইনজ্ঞদেরও রয়েছে ভিন্নমত। কেউ বলছেন, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ায় আপিলের সুযোগ শেষ। আবার কারও মতে, আদালতের বিবেচনায় এখনও খুলতে পারে কিছু পথ।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ‘আগামী ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার’ ঘোষণার পরই এসব আইনি প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। তার সামনে ঠিক কোন বিচারিক পথ অপেক্ষা করছে; সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তবে শেষ পর্যন্ত সবকিছুই নির্ভর করবে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর।
তথ্য বলছে, ছাত্র-জনতার অভুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতন ঘটে শেখ হাসিনার। ওই দিনই ভারতে পালিয়ে যান তিনি। এরপর কেটে যায় প্রায় দুই বছর। এর মধ্যেই ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় শেখ হাসিনাকে দেওয়া হয় মৃত্যুদণ্ড। একইসঙ্গে সব সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেন আদালত। এছাড়া তৎকালীন এই সরকারপ্রধানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের টানা শাসনামলে গুম-নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের আরও কয়েকটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে ট্রাইব্যুনালে।
জানা গেছে, দেশ ছাড়ার পর দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বিভিন্নভাবেই একের পর এক বার্তা দিচ্ছেন শেখ হাসিনা। সর্বশেষ ৯ জুলাই রাতে রয়টার্সকে প্রায় এক ঘণ্টার টেলিফোন সাক্ষাৎকার দেন তিনি। সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বর নাগাদ দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বলে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক এই বার্তা সংস্থা। ক্ষমতা ছেড়ে পালানোর প্রায় দুই বছর পর হঠাৎ তার কেন এমন ঘোষণা; এ নিয়েই চলছে নানা জল্পনা।
দেশে ফিরলেই যেতে হবে জেলে
বাংলাদেশে আসার সঙ্গে সঙ্গেই শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হবে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তার মতে, নিজে নিজে এসে শেখ হাসিনার আত্মসমর্পণ করার কোনো আইনগত সুযোগ নেই। কারণ তিনি ভারত সরকারের অধীনে রয়েছেন। অতএব চাইলেই আসতে পারবেন না।
আলাপকালে আমিনুল ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনা একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তাই যেকোনোভাবে বাংলাদেশে ফিরলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে প্রথমেই তাকে গ্রেপ্তার হতে হবে। এরপর জেলহাজতে গিয়ে তিনি যদি কোনো আইনজীবী নিয়োগ দিয়ে আপিল করেন, সেটা অন্য প্রসঙ্গ। কিন্তু শেখ হাসিনা আদৌ আসবেন কিনা বা আপিল করবেন কিনা- সেসবের তেমন নিশ্চয়তা নেই।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, শেখ হাসিনা দেশের মাটিতে পা রাখলেও প্রসিকিউশনের কিছু করা লাগবে না। কেননা তার মৃত্যুদণ্ড পাওয়া মামলাটি নিষ্পত্তি করে দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা রয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ২১-এর ৩ ধারায় বলা আছে, যেকোনো রায় প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে আসামি নিজেই আপিল করতে পারবেন। যেহেতু শেখ হাসিনা এ সময়ের মধ্যে আপিল করেননি, সেহেতু আর করতে পারবেন না। এরপরও যদি দেশে এসে আপিল করেন, তখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন সেভাবেই হবে। তবে আপাতত আপিল করার আইনগত সুযোগ নেই তার।
আইনের চোখে শেখ হাসিনা পলাতক থাকলেও ভারতের আশ্রয়ে রয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি ভারত সরকারের অধীনে জীবনযাপন করছেন। সেখানে পলাতক নন। যদিও আইনের দৃষ্টিতে পলাতক। এ কারণে তাকে ফেরত বা হস্তান্তরের জন্য এরই মধ্যে ভারত সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ। তাই ভারত হস্তান্তর না করলে তার কোনোভাবেই আসা সম্ভব নয়।
আইনে কী বলা আছে?
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ২১ ধারায় ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের বিধান রয়েছে। আইন অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনাল কোনো ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করে দণ্ড দিলে তিনি অধিকারবলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করতে পারবেন। একইভাবে সরকার বা ক্ষেত্র অনুসারে অভিযোগকারীও খালাসের আদেশ বা দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার অধিকার রাখেন। রায় প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে এ আপিল করতে হবে। এই সময়সীমা অতিক্রম হওয়ার পর আর কোনো আপিল করা যাবে না। আপিল দাখিল হওয়ার পর তা ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। এছাড়া আপিল করার সময় আপিলকারী যে নথিপত্রের ওপর নির্ভর করবেন, সেগুলোও দাখিল করতে হবে বলে আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
হাসিনাকে প্রত্যর্পণে ভারতের কাছে অনুরোধ জানাবে বিএনপি
‘আকাশ থেকে নেমে ধরবে’ —ইনুকে ফোনে বলেছিলেন শেখ হাসিনা
‘ন্যায়বিচারকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না’, শেখ হাসিনার রায়ে ট্রাইব্যুনাল
এ আইনের ২১ ধারায় ৩০ দিনের সময়সীমা অতিক্রমের পর বিলম্ব মার্জনা করে আপিল গ্রহণের বিষয়ে কোনো পৃথক বিধান উল্লেখ নেই। এ কারণেই নির্ধারিত সময় পেরিয়ে আপিলের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে কি না, সে প্রশ্ন আদালতের বিবেচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
আপিলের পথ খোলা নাকি একেবারেই বন্ধ?
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় মোট তিনজন আসামি। এর মধ্যে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া শেখ হাসিনা ছাড়াও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল দেশের বাইরে পলাতক রয়েছেন। আরেকজন আসামি পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের পাঁচ বছরের সাজা হয়েছে। তিনি বিচারের শুরু থেকেই গ্রেপ্তার রয়েছেন। এরই মধ্যে আপিলও করেছেন, যা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে পেন্ডিং তথা অপেক্ষমাণ রয়েছে। অর্থাৎ এখনও শুনানির জন্য ওঠেনি বলে জানা গেছে। পলাতক থাকায় এখনও আপিল করেননি শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল।
নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হলেও শেখ হাসিনার আপিলের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে মত দিয়েছেন কোনো কোনো আইন বিশেষজ্ঞ। এর মধ্যে ফৌজদারি আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরের মতে, শেখ হাসিনা আপিল ফাইল করার জন্য উদ্যোগ নিতে পারবেন। কিন্তু গৃহীত হবে কিনা, তা শুনানির সময় বলা যাবে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনটি হলো একটি বিশেষ আইন। এই আইনানুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল করতে হয়। অন্যথায় আর কোনো সুযোগ থাকে না। সাধারণ ফৌজদারি মামলায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে হাইকোর্ট বিভাগের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১-এ ধারায় (কোয়াশমেন্ট) আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল হওয়ায় এ ধরনের আবেদনের সুযোগ নেই। সুতরাং বিশেষ আইনে আপিলে বিলম্ব বা তামাদি কখনও মার্জনা করা যায় না। ফলে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে আপিল গ্রহণযোগ্য হবে কি না, সেটি আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে।
অনেকটা কাছাকাছি ব্যাখ্যা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী ব্যারিস্টার এম সরোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে চাইলে শেখ হাসিনার আইনজীবীদের নির্ধারিত সময় অতিক্রমের কারণ আদালতের সামনে তুলে ধরতে হবে। আদালত যদি বিলম্ব মার্জনার আবেদন গ্রহণ করেন, তাহলে আপিলের পথ উন্মুক্ত হতে পারে।
এই আইনজীবী বলেন, সাধারণ দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলায় এমন বহু উদাহরণ রয়েছে। অর্থাৎ বিলম্বের যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে আপিলের অনুমতি মিলেছে। শেখ হাসিনারও যুক্তি থাকতে পারে যে, তিনি বিদেশে পলাতক। এক্ষেত্রে প্রথমে কনডোনেশন অব ডিলে তথা বিলম্ব মার্জনা বা নির্ধারিত সময় পার হওয়ার যথাযথ কারণ দেখিয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে তাকে আবেদন করতে হবে। সেই আবেদনে সন্তোষজনক হলে আদালত গ্রহণ করতেও পারেন।
কনডোনেশন অব ডিলে—কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
কনডোনেশন অব ডিলে বা বিলম্ব মার্জনা নিয়ে তামাদি আইন, ১৯০৮-এর ৫ ধারায় বিধান রয়েছে। এ ধারায় বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো আপিল বা আবেদন করা না গেলে, পরে তা দাখিল করা যেতে পারে। তবে এজন্য আবেদনকারীকে সময়মতো না পারার পেছনে ‘যথেষ্ট কারণ’ থাকার কথা আদালতকে বোঝাতে হবে। আদালত সেই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হলে বিলম্ব মার্জনা করে আপিল বা আবেদন গ্রহণ করতে পারেন।
আইনটির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, নির্ধারিত তামাদি মেয়াদ নিশ্চিতকরণ বা গণনার ক্ষেত্রে আপিলকারী বা আবেদনকারী যদি হাইকোর্ট বিভাগের কোনো আদেশ, রেওয়াজ বা রায়ের কারণে বিভ্রান্ত হয়ে থাকেন, তাহলে সেই পরিস্থিতিকেও ‘পর্যাপ্ত কারণ’ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন আদালত।
আইনজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও আদালত যদি বিলম্ব মার্জনা করেন, তাহলে আপিল গ্রহণ হবে। একইসঙ্গে মামলার মূল বিষয়ে শুনানি এগোবে। কিন্তু বিলম্ব মার্জনা না হলে আপিলই করা যাবে না। সেক্ষেত্রে রায়ের আইনগত বৈধতা, সাক্ষ্য-প্রমাণ বা মৃত্যুদণ্ডের যৌক্তিকতা নিয়ে আপিল বিভাগে আর শুনানির সুযোগ থাকবে না। আর এ কারণেই আপিল গ্রহণযোগ্য হবে কি না- এটিই শেখ হাসিনার সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ এবং জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব ড. শাহজাহান সাজু বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের যে মামলায় মৃত্যুদণ্ডের আদেশ পেয়েছেন শেখ হাসিনা, সেখানে হয়তো তিনি বলতে পারেন যে- আমি বিদেশে ছিলাম। বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে দেশে আসতে পারিনি। কাজেই আমার আপিল গ্রহণের অবকাশ দিন। এরপর আপিল গ্রহণ হলে বাকি বিচারিক কাজ মোকাবিলা করতে পারবেন তিনি। আর যদি আদালত কনডোনেশন অব ডিলের আবেদন মঞ্জুর না করেন, তাহলে মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর হওয়ার পথে আর কোনো আপিলের সুযোগ নাও থাকতে পারে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পার করতে হয় যেসব ধাপ
ব্যারিস্টার সরোয়ার হোসেনের মতে, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে উচ্চতর আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। সাধারণ ফৌজদারি মামলায় দায়রা জজ আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলে সেটি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্ট বিভাগে যায়। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিলের সুযোগ রয়েছে। ফলে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগে আপিল বিভাগে আইনে নির্ধারিত আপিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হবে। আপিল নিষ্পত্তির আগে ওই দণ্ড কার্যকর করা যাবে না।
তিনি বলেন, মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে যেকোনো অবস্থাতেই আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের পরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে আরও দুটি আইনি ধাপ রয়েছে। প্রথমটি হলো রিভিউ তথা পুনর্বিবেচনার আবেদন। রিভিউ নিষ্পত্তির পরও যদি মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে, তাহলে দণ্ডিত ব্যক্তি চাইলে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার (মার্সি পিটিশন) আবেদন করতে পারেন। সেই আবেদন নিষ্পত্তি হওয়ার পর যদি ক্ষমামার্জনা নাকচ হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট আদেশ জেল কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানোর পর ৭ থেকে ২১ দিনের মধ্যে যেকোনো সময় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে পারে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, বিশ্বজুড়ে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয় হলো মৃত্যুদণ্ড। এর বিরুদ্ধে একটি জোরালো আন্দোলন চলমান থাকলেও এখনও অনেক দেশের দণ্ডবিধিতে এ শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে এ ধরনের মামলায় যথাযথ সতর্কতা, ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া এবং সুবিচারের নীতিই সবার আগে অনুসরণ করতে হয়।
তিনি বলেন, শুধু ন্যায়বিচার করলেই হবে না। ন্যায়বিচার যে করা হয়েছে সেটিও মানুষের কাছে দৃশ্যমান হতে হবে। এটি সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তবে কোনো মামলা যদি রাজনৈতিক বা সংবেদনশীল হয়, তাহলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা আরও বেশি প্রয়োজন। যেন কেউ এ বিচারপ্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ না পান।
প্রসিকিউশনের আনা পাঁচটি অভিযোগে এ মামলার রায় ঘোষণা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল। চূড়ান্ত রায়ে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আদালত। এর মধ্যে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শহীদ-আহতদের কথাও তুলে ধরেছিলেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় হাত-পা, নাক-চোখ ও মাথার খুলি হারানো যেসব সাক্ষী আদালতে এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাদের বাস্তব অবস্থা দেখলে যেকোনো মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক মানসিক স্থিরতা বজায় রাখা কঠিন। তাই এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের যেকোনো মূল্যে বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ন্যায়বিচারকে ব্যাহত হতে দেওয়ার সুযোগ নেই।
প্রথম অভিযোগে শেখ হাসিনাকে সাজা দেওয়ার ব্যাখ্যায় ট্রাইব্যুনাল বলেছিলেন, সংঘটিত অপরাধে প্ররোচনা-উসকানি, আন্দোলনকারীদের হত্যার নির্দেশ এবং সংঘটিত অপরাধ প্রতিরোধে নিষ্ক্রিয়তা ও অপরাধ সংঘটনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়ী। এসব অপরাধে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
দুই নম্বর অভিযোগের অপরাধ বর্ণনা করে ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, এ অভিযোগে দুটি অপরাধের জন্য শেখ হাসিনাকে দায়ী করা হয়। এর মধ্যে একটি জুলাই গণআন্দোলন দমনে হেলিকপ্টার ও মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ। দ্বিতীয় হলো শেখ হাসিনার এই নির্দেশ মেনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখারপুল এলাকায় ছয়জনকে গুলি করে হত্যা ও একই দিনে সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে দেওয়া। এসব অপরাধের দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। তার মতে, যদি তিনি (শেখ হাসিনা) দেশে ফেরেন, তাহলে আদালতের দেওয়া রায় গ্রহণের মানসিকতা নিয়েই ফিরবেন। তবে দেশে ফেরার বিষয়ে শেখ হাসিনার অন্যান্য বক্তব্যকে ‘পলিটিক্যাল রেটোরিক’ মনে করেন এই রাজনৈতিক নেতা।
সামান্তা শারমিন বলেন, আসলে এ ধরনের ব্যক্তিরা এক ধরনের ফাঁকাবুলিতে অভ্যস্ত থাকেন। তাদের এসব কথা বা বার্তার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অস্থিরতা তৈরি হয়। এজন্য শেখ হাসিনাও তেমন কিছু চেষ্টা করছেন। তবে কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করার ব্যবস্থা করা উচিত। এছাড়া শেখ হাসিনার বিচার অবশ্যই যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হতে হবে, যেন ভবিষ্যতে কোনো আইনি ফাঁকফোকরের সুযোগ না থাকে।
সবমিলিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা নতুন করে আলোচনার খোরাক জোগালেও আইনি প্রশ্ন- ৩০ দিনের আপিলসীমা পার হয়ে যাওয়ার পরও আদালতের দ্বার কতটা খোলা রয়েছে। দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার কিংবা কারাগারে যাওয়ার বিষয়ে আইনজ্ঞরা একমত হলেও সাবেক এই সরকারপ্রধানের পরবর্তী বিচারিক পথ পুরোপুরি আপিল বিভাগের ব্যাখ্যা আর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।





