বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন একটি প্রশ্ন ক্রমেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসছে যে, দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হতে পারেন?
২২তম রাষ্ট্রপতি স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হবে। নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির কার্যাবলি পালন করবেন। আর এই সাংবিধানিক বাস্তবতার মধ্যেই সম্ভাব্য ২৩তম রাষ্ট্রপতি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা ও জল্পনা। আলোচনায় বেশ কয়েকজনের নাম আসছে। তাদের মধ্যে প্রধান আলোচনায় রয়েছেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। এরবাহিরে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, নজরুল ইসলাম খান, ড. মাহবুব উল্লাহ, আব্দুস সাত্তার ভূইয়া ও আইরিন খান। কিন্তু প্রশ্ন হলো রাষ্ট্রপতি পদে কাকে বেছে নেওয়া উচিত?
রাষ্ট্রপতি কি শুধুই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের পছন্দের একজন ব্যক্তি হবেন? নাকি এমন একজন প্রবীণ, অভিজ্ঞ, প্রাজ্ঞ ও জাতীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসানো হবে, যিনি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারবেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নামটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় আসতে পারে। কারণ তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন। তিনি একজন শিক্ষাবিদ, ভূতত্ত্ববিদ, গবেষক, লেখক, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ অতিক্রম করা একজন প্রবীণ নেতা। তার জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা থেকে মন্ত্রিসভা, সংসদ থেকে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্ব জীবনের প্রায় প্রতিটি পর্যায়েই তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন এবং সফল হয়েছেন।
বাংলাদেশের সর্বকালের সাহসী কর্মবীর ও রাষ্ট্রনায়ক জিয়ার আস্থার মানুষ থেকে জাতীয় রাজনীতির প্রবীণ নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছাত্ররাজনীতি থেকে এরপর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় থেকে বিএনপির রাজনীতি করা। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তার মেধা, যোগ্যতা ও সাংগঠনিক দক্ষতাকে মূল্যায়ন করে তাকে বিএনপির রাজনীতিতে নিয়ে আসেন। ছাত্ররাজনীতির অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তাকে ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও দেওয়া হয়। তার মাধ্যমে সেই সময় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং জেলা ও মহানগরে যে ছাত্ররাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি হয়েছিল, তাদের একটি বড় অংশ পরবর্তীতে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং এখনো করছে। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বে যারা উঠে এসেছেন, তাদের অনেকের রাজনৈতিক শিকড় সেই সময়ের ছাত্ররাজনীতিতে। আজ তাদের কেউ সংসদ সদস্য, কেউ মন্ত্রী, কেউ দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। একজন রাজনৈতিক সংগঠকের সবচেয়ে বড় সাফল্য নিজে কতবার মন্ত্রী হয়েছেন তা নয় বরং তার হাতে গড়ে ওঠা কতজন মানুষ পরবর্তীতে দেশ ও জাতির নেতৃত্বে এসেছে। সেটিই তার রাজনৈতিক অবদানের বড় মাপকাঠি। এই জায়গায় ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের রাজনৈতিক অবদান নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে।
জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির সংকট পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আসা এতো সহজ ছিলনা। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর বিএনপি এক গভীর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সংকটে পড়ে। দল তখন বিভক্তির ঝুঁকিতে। নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা। দলের ভেতরে নানা মত ও পথ। এই কঠিন সময়ে বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং বেগম খালেদা জিয়াকে দলের নেতৃত্বে নিয়ে আসার পেছনে যারা সক্রিয় ছিলেন, তাদের মধ্যে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন অন্যতম। তিনি স্বৈরাচারের নজরদারিকে তোয়াক্কা না করে বারবার বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে তাকে রাজনীতিতে আসার অনুরোধ করেছিলেন। কখনো বাধা এসেছে। কখনো নিরাপত্তার নজরদারি ছিল। কখনো রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল প্রতিকূল। কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি। তার লক্ষ্য ছিল একটাই শহীদ জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির নেতৃত্ব যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে না যায়। দলটি যেন নিঃশেষ না হয়ে যায়। পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়াকে বোঝাতে সমর্থ হন এবং বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। শুরু হয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়। এরপর এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার পাশে ছায়ার মতো ছিলেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসনের পতন এবং গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বিএনপি চেয়ারপারসনের নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সহযোদ্ধা হিসেবে তার ভূমিকা ছিল। অর্থাৎ ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের রাজনীতি কেবল ক্ষমতার রাজনীতি নয়। তার রাজনৈতিক জীবন জড়িয়ে আছে বিএনপির জন্ম, সংকট, পুনর্গঠন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে।
মন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতাঃ
একজন রাষ্ট্রপতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতাগুলোর একটি হলো রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা। ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পান। দায়িত্ব পালন করেন সবচেয়ে জটিল ও চাপে থাকা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের। একজন ভূতত্ত্ববিদ হিসেবে তার একাডেমিক জ্ঞান ও পেশাগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের একটি স্বাভাবিক যোগসূত্র ছিল। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে স্বল্পকালীন তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। অর্থাৎ দেশের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য রাষ্ট্রের তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাতের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। এ অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রপতি পদে তার সম্ভাব্য যোগ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের প্রেসিডেন্ট এবং বাংলাদেশের জন্য বিরল আন্তর্জাতিক অর্জনঃ
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল আন্তর্জাতিক অধ্যায়গুলোর একটি হলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা। ২০০৩ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৫৬তম বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এটি নিঃসন্দেহে একজন বাংলাদেশি রাজনীতিকের জন্য একটি বড় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। একজন বাংলাদেশের মন্ত্রী আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্মেলনের সভাপতিত্ব করছেন এটি শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জন নয় বরং এটি বাংলাদেশেরও একটি মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পরিচয়। ২০০৪ সালে তামাকবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকার জন্য তিনি ‘World No Tobacco Award’-এ ভূষিত হন। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদান এবং গবেষণার ক্ষেত্রেও তার বিভিন্ন পুরস্কার ও স্বীকৃতি রয়েছে। রাষ্ট্রপতি পদে এমন একজন ব্যক্তির প্রয়োজন, যিনি শুধু দেশের রাজনীতি বোঝেন না আন্তর্জাতিক বিশ্বকেও বোঝেন। ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা সেই জায়গায় তাকে এগিয়ে রাখতে পারে।
একজন রাজনীতিক, যিনি একই সঙ্গে একজন জাতীয় পর্যায়ের অধ্যাপকঃ
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শিক্ষাবিদ রাজনীতিকের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা, গবেষণা, অধ্যাপনা, বিভাগীয় চেয়ারম্যানের দায়িত্ব, জাতীয় রাজনীতি, সংসদ এবং মন্ত্রিসভা এইসবগুলো পরিচয় একসঙ্গে বহন করেছেন এমন রাজনীতিকের সংখ্যা খুব বেশি নয়। ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন তাদেরই একজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন তিনি। অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিভাগের চেয়ারম্যানও ছিলেন। রাজনীতির বাইরে তার রয়েছে গবেষণার জগৎ। ভূতত্ত্ব বিষয়ে তার ২১টি গবেষণামূলক প্রবন্ধ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। ‘Structural Analysis’ বিষয়ে তার গবেষণার একটি পদ্ধতি ‘Hossain’s Method of Extension’ নামে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক স্বীকৃতি পেয়েছে। এছাড়াও তিনি ১২টি গ্রন্থের রচয়িতা। একজন রাষ্ট্রপতির জন্য জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্বতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই জায়গায় ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের একাডেমিক পরিচয় একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
মুক্তিযুদ্ধের সময় লন্ডনে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনঃ
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালে তিনি লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। সেই সময় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। লন্ডনে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবদান রাখেন। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে অবদানের জন্য তৎকালীন রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে সম্মানসূচক প্রশংসাপত্র প্রাপ্ত হন। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে তাকে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করে গেজেট প্রকাশ করা হয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে তিন দশকের বেশি সময়ঃ
রাজনীতিতে সময় অনেক কিছু বদলে দেয়। নেতা বদলায়। প্রজন্ম বদলায়। দলের নীতি বদলায়। কিন্তু কিছু মানুষ থেকে যান। ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বিএনপির রাজনীতিতে তেমনই একজন প্রবীণ নেতা। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপির প্রথম কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতে তিনি ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই সময়ে কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৮৪ সালে হন যুগ্ম মহাসচিব। ১৯৯৪ সালে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হন। প্রায় এক যুগ ধরে স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে রয়েছেন। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে অর্থাৎ ৩২ বছরের অধিক বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে তার অবস্থান তাকে দলের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী স্থায়ী কমিটির সদস্যে পরিণত করেছে। আজকের বিএনপির অনেক নেতা যখন রাজনীতিতে আসেননি, তখনই তিনি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে। আজ যারা দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে, তাদের অনেকের রাজনৈতিক বয়স যখন খুবই কম, তখন তিনি ছিলেন দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায়। এটাই একজন প্রবীণ নেতার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
কারাগার থামাতে পারেনিঃ
রাজনীতি কখনোই ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের জন্য ফুল বিছানো পথ ছিল না বরং তার রাজনৈতিক জীবনে এসেছে গ্রেপ্তার, কারাবরণ, মামলা এবং নানা প্রতিকূলতা। ১৯৮৬, ১৯৯৭, ২০০৭ ও ২০১৩ সালসহ বিভিন্ন সময়ে তিনি রাজনৈতিক কারণে গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং জীবনের পাঁচ বছরেরও বেশি সময় কারাগারে কাটিয়েছেন। রাজনৈতিক চাপ ছিল। চাপ ছিল দল ছাড়ার। চাপ ছিল অবস্থান বদলের। কিন্তু তিনি বদলাননি। এই কারণেই বিএনপির নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ তাকে জিয়া পরিবার ও বিএনপির প্রতি বিশ্বস্ত একজন পরীক্ষিত নেতা হিসেবে মূল্যায়ন করেন। রাজনীতিতে পদ পাওয়া সহজ। ক্ষমতার সঙ্গে থাকা সহজ। কিন্তু প্রতিকূল সময়ে নিজের অবস্থান ধরে রাখা কঠিন। আর সেই পরীক্ষায় ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কতটা সফল তার উত্তর তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের মধ্যেই রয়েছে।
পাঁচবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য কিন্তু আরও হতে পারতেনঃ
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে বর্তমানে সুষ্ঠু নির্বাচনে পাঁচবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য অফিসিয়ালি বলা হয়। কিন্তু ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে বিএনপি অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচনে অংশ নিতে পারলে তার সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার সংখ্যা ৮ বার হতো। তবে ভবিষ্যতে তিনি আর সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবেন না এমন ঘোষণা নির্বাচনী জনসভায় দিয়েছেন। যেহেতু তিনি নির্বাচনী রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেহেতু রাষ্ট্রপতি পদে তার মতো একজন প্রবীণ নেতাকে সম্মান দেয়ার এবারই সুবর্ণ সুযোগ।
এখন মূল প্রশ্নে আসা যাক। কেন তাকে রাষ্ট্রপতি করা প্রয়োজন?
কারণ রাষ্ট্রপতি পদে এমন একজন ব্যক্তিকে প্রয়োজন, যিনি দলীয় রাজনীতি বোঝেন। রাষ্ট্র পরিচালনা বোঝেন। সংবিধান বোঝেন। সংসদীয় রাজনীতি বোঝেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বোঝেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানেন। গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছেন। রাষ্ট্রের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় পরিচালনা করেছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং সর্বোপরি দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পরিণত হয়েছেন। ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্যগুলোর সবগুলোই বিদ্যমান। তিনি শুধু বিএনপির একজন নেতা নন। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ সময়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তিনি সক্রিয় ছিলেন জিয়ার স্বনির্ভর বাংলাদেশ গঠনে। তিনি মোকাবিলা করেছেন এরশাদের স্বৈরশাসন। তিনি করেছেন দীর্ঘদিন গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন। তিনি সক্রিয় ছিলেন নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে। তিনি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির উত্থানের অংশীদার ছিলেন। তিনি নিজে মন্ত্রী হয়েছেন। সংসদে দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কারাগারও দেখেছেন। এমন একজন মানুষ রাষ্ট্রপতি হলে রাষ্ট্রপতি ভবনে শুধু একজন রাজনীতিক যাবেন না, যাবেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একজন জীবন্ত সাক্ষী।
একজন রাষ্ট্রপতির কাছে জনগণের প্রত্যাশা একটাই। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবেন। তিনি সংবিধানকে সম্মান করবেন। তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা রক্ষা করবেন। তিনি কোনো বিদেশি শক্তির স্বার্থের কাছে নত হবেন না। তিনি কোনো গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হবেন না। তিনি হবেন বাংলাদেশের জনগণের রাষ্ট্রপতি।
এখন সিদ্ধান্তের সময়ঃ
আজ বাংলাদেশের রাজনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। রাষ্ট্রপতি পদে এমন একজন ব্যক্তির প্রয়োজন, যিনি অভিজ্ঞতায় পরিপক্ব, রাজনৈতিকভাবে পরীক্ষিত, রাষ্ট্রীয় বিষয়ে অভিজ্ঞ এবং জাতীয় স্বার্থে দৃঢ়। যে মানুষটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসবেন, তাকে অবশ্যই বাংলাদেশের মানুষকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোনো বিদেশি শক্তি নয়। কোন গোষ্ঠী নয়। কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়। শুধু বাংলাদেশ। শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা। শুধু বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব। শুধু বাংলাদেশের জনগণ। এই জায়গা থেকে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নামটিই কেবল আলোচনায় আসতেই পারে। কারণ তিনি দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত রাজনীতিক। তিনি জিয়া পরিবারের বিশ্বস্ত সহকর্মী হিসেবে পরিচিত। তিনি বিএনপির প্রবীণ নেতা। তিনি বহুবারের সংসদ সদস্য। তিনি সাবেক মন্ত্রী। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তিনি গবেষক। তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তিনি রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। এবং সবচেয়ে বড় কথা হলো তার রাজনৈতিক জীবনের প্রায় অর্ধশতাব্দী বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
তাই প্রশ্নটি এখন শুধু “কে রাষ্ট্রপতি হবেন?” না হয়ে প্রশ্নটি হওয়া উচিত “কেমন রাষ্ট্রপতি আমরা চাই?”
যদি আমরা এমন একজন রাষ্ট্রপতি চাই, যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকে সবার ওপরে রাখবেন। যিনি রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ, যিনি রাষ্ট্র পরিচালনা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গন সম্পর্কে অভিজ্ঞ, যিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ অতিক্রম করেছেন তাহলে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নামটিই আসবে। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। কিন্তু ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে একটি কথা বলাই যায় রাষ্ট্রপতি পদ কোনো পুরস্কার নয়। এটি একটি দায়িত্ব। এটি একটি আমানত। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রতীক। সেই আমানত এমন একজনের হাতে যাওয়া উচিত, যিনি বাংলাদেশকে সবার আগে রাখবেন। আর সেই বিবেচনায় ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন হতে পারেন বাংলাদেশের জন্য একটি যোগ্য, অভিজ্ঞ ও মর্যাদাপূর্ণ পছন্দ।
দেশের রাষ্ট্রপতি তিনিই হোন, যিনি কোনো বিদেশি শক্তির নন, কোনো গোষ্ঠীর নন শুধুই বাংলাদেশের। বাংলাদেশপন্থী একজন প্রবীণ, অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে চায় দেশের মানুষ।
লেখকঃ
মো. হাবিবুর রহমান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।





