আমরা প্রতিদিন যা করি, তার প্রভাব পরে আমাদের দৈননন্দিন জীবনে। প্রতিদিন যা খাই, প্রতিদিন যা করি, যা পড়ি, যা চারপাশে ঘটে তার সবকিছুরই প্রভাব পড়ে জলবায়ু পরিবর্তনে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এক ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছে খাদ্য উৎপাদন, পুষ্টি এবং খাদ্য নিরাপত্তা। ফলে তৈরি হচ্ছে খাদ্য সংকট। দ্রুততম সময়ে এ বিষয়ে নজর না দিলে আমাদের নিস্তার নাই। খাদ্য সংকটের উপায় খুঁজতে আমাদের নিতে হবে জরুরী পদক্ষেপ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট তৈরির প্রধানতম কারণ হচ্ছে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়। এর ফলে বিশ্বজুড়ে খাদ্য উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে এবং খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়ে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সংকট তৈরি করছে। কোনো কোনো অঞ্চলে শস্য উৎপাদন ২০% থেকে ৪০% পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধির ফলে ফসলের পুষ্টিগুণ (যেমন- প্রোটিন, আয়রন এবং জিঙ্ক) হ্রাস পাচ্ছে, যা ‘হিডেন হাঙ্গার’ বা পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। উৎপাদন ঘাটতি এবং সরবরাহ সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের দাম লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, এবং অনিয়মিত ঋতুচক্রের কারণে প্রধান খাদ্যশস্য যেমন—চাল, গম, ও ভুট্টার উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে। জলবায়ু সংকট কেবল খাদ্যের পরিমাণের ওপরই প্রভাব ফেলছে না, বরং খাদ্যের গুণগত মানও কমিয়ে দিচ্ছে। অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইডের উপস্থিতিতে উৎপাদিত ফসলে প্রোটিন, আয়রন, এবং জিঙ্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ কমে যায়।
খাদ্য সংকট তৈরির আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তৈরি তাপমাত্রা বৃদ্ধি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২০ থেকে ২০৩৯ সালের মধ্যে দেশের অধিকাংশ অঞ্চল আর্দ্রতা-ভিত্তিক উচ্চ তাপ-ঝুঁকির সম্মুখীন হবে। মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কর্মকাণ্ড—যেমন জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার, বন উজাড় এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমনের ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা দ্রুত হারে বাড়ছে। ১৮৫০-১৯০০ তুলনায় ভূ-পৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রায় ১.০৯ থেকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। আগের তুলনায় তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ বা হিট ওয়েভও বাড়ছে। তাপ বাড়ায় পুরো পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্র এবং মানবজীবন এক মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে, দুই মেরুর এবং পর্বতমালার বরফ আশঙ্কাজনক হারে গলে যাচ্ছে। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, যা উপকূলীয় ও নিচু অঞ্চলগুলোতে প্লাবন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির মাত্রা বাড়াচ্ছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং খরার কারণে ধান ও অন্যান্য ফসলে চিটা হওয়া বা ফলন নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এতে বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।স্বাস্থ্যঝুঁকি: অতিরিক্ত তাপমাত্রা মানুষের হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায় এবং বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগ (যেমন—হৃদরোগ ও কিডনি সমস্যা) প্রকট করে।বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রভাববাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। বায়ুমণ্ডলীয় ও সমুদ্র স্রোতের পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের মৌসুম এবং ধরন সম্পূর্ণ পাল্টে যাচ্ছে। অসময়ে বৃষ্টি এবং প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাতের অভাবে ধান ও গমের মতো প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
খাদ্য সংকট তৈরির আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং স্বাভাবিক জোয়ারের লবণাক্ত পানি উপকূলের ভূগর্ভস্থ পানি ও নদীতে প্রবেশ করায় এই সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। লবণাক্ততা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও বাস্তুতন্ত্রে গভীর প্রভাব ফেলছে। নদীর প্রবাহ হ্রাস: শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলোর মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে গেলে সমুদ্রের লোনা পানি সহজেই মোহনা ও নদী বেয়ে অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে উপকূলীয় বাঁধ ভেঙে লোনা পানি লোকালয় ও কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ে। লবণাক্ততা বাড়ার কারণে কৃষিজমির উর্বরতা ও ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় ধান ও অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী ফসল চাষ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এছাড়া কৃষকরা বাধ্য হয়ে শস্যের ধরন বা প্যাটার্ন বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন।
গবেষকরা বলছেন, এমন সব ফসলের জাত উদ্ভাবন করতে হবে যা যা খরা, বন্যা ও লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। কম পানিতে ফসল ফলানোর পদ্ধতি (যেমন- ড্রিপ ইরিগেশন) এবং জলবায়ু-স্মার্ট কৃষিকাজের প্রসার ঘটাতে হবে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের এই ক্ষতি মোকাবিলায় জলবায়ু সহনশীল অভিযোজন কৌশল গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল আগাম ফসলের জাত উদ্ভাবন, ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রসার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুপেয় পানির সংকট নিরসনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ (Rainwater Harvesting) ব্যবস্থা জনপ্রিয় করা হচ্ছে। পাশাপাশি লোনা পানি প্রবেশ ঠেকাতে উপকূলীয় বাঁধ মজবুত করা এবং স্লুইস গেটগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করাও অত্যন্ত জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা এবং পুষ্টিগুণ যে সংকটে পড়েছে, সেই সংকট নিরসনে কৃষি উৎপাদন পদ্ধতির আধুনিকায়ন, পরিবেশবান্ধব কৌশল অবলম্বন এবং সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে জলবায়ু-সহনশীল ও বৈচিত্র্যময় ফসল চাষসহনশীল জাত উদ্ভাবন ও ব্যবহার, খরা, লবণাক্ততা এবং বন্যা সহনশীল ধানের মতো প্রধান শস্যের নতুন জাত উদ্ভাবন ও কৃষকদের মাঝে তা ছড়িয়ে দেওয়া। শুধু ধান বা গমের ওপর নির্ভর না করে পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ বিকল্প ফসল (যেমন- ভুট্টা, জোয়ার, বাজরা এবং বিভিন্ন ধরনের ডাল) চাষে জোর দেওয়া। একই জমিতে বারবার একই ফসল চাষ না করে ভিন্ন ভিন্ন ফসল ফলালে মাটির উর্বরতা শক্তি ও পুষ্টি উপাদান বজায় রাখা। একইসাথে মাটির আর্দ্রতা পরীক্ষা করে সার ও পানির অপচয় রোধ করা। এছাড়াও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সাহায্যে আবহাওয়ার পূর্বাভাস গ্রহণ করে আগে থেকেই কৃষকদের জন্য সঠিক চাষাবাদের পরিকল্পনা নেওয়ার মধ্য দিয়ে আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তৈরি খাদ্য সংকট থেকে উত্তোরণ পেতে পারি। সেদিকে আমাদের নজর দিতে হবে।
লেখক: সাজেদা হক, সম্পাদক, দেশইনফো.কম.বিডি।





