ব্রিকসের সামনে ইরান পরীক্ষা

0
5

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক সংঘাত এখন আর কেবল সাময়িক কোনো দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা নয়। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে এটি এক স্থায়ী সংকট হিসেবে রূপ নিচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরেশিয়া অঞ্চলে গড়ে উঠছে নতুন এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার কেন্দ্র। আগামীতে বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতিপথ কেমন হবে, তা নির্ধারিত হবে এ সংঘাতের মাধ্যমে।

এই সমীকরণ কেবল ইরানের কৌশলগত অবস্থানের কারণেই গুরুত্ব পাচ্ছে না; বরং ইরান এখন ব্রিকস এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) মতো উদীয়মান অ-পশ্চিমি (নন-ওয়েস্টার্ন) জোটগুলোর স্থায়ী সদস্য। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমের সংঘাত একটি পরোক্ষ প্রক্সি রূপ ধারণ করেছে। তবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের বিরোধ পুরোপুরি সরাসরি ও মুখোমুখি। এই বাস্তবতায় আজ প্রশ্ন উঠছে—আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ক্রমাগত বিভাজনের মুখে ব্রিকস ও এসসিও কীভাবে নিজেদের কার্যকর রাখবে এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে কী ভূমিকা পালন করবে?

২০০১ সালে ইউরেশীয় নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে গঠিত এসসিও এবং ২০০৯ সালে উদ্ভূত ব্রিকস—উভয় সংস্থার জন্মই হয়েছিল পশ্চিমা বিশ্ব ব্যবস্থার কার্যকারিতা কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে। যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ ও ইরাকে অবৈধ আগ্রাসন বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করেছিল যে, ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন এক মেরু বিশ্ব ব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে কোনো স্থিতিশীলতা দিতে পারেনি। তবে এই দুই জোট কখনোই পশ্চিমা ব্যবস্থার সরাসরি বিকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায়নি। এই সতর্কতার পেছনে দুটি ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। প্রথমত, পশ্চিমের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের ভিন্নমুখী সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও সবাইকে এক ছাতার নিচে রাখা। দ্বিতীয়ত, চীন বা রাশিয়ার পাশাপাশি যারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, সেই উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জোট থেকে দূরে ঠেলে না দেওয়া।

কিন্তু এর ফলে জোট দুটিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সবসময় চরম সতর্কতা ও সর্বসম্মত পথ বেছে নিতে হয়েছে। এর মাঝে এক ধরনের বৈপরীত্যও রয়েছে। কারণ স্নায়যুদ্ধ-উত্তর মার্কিন নেতৃত্বকে পরোক্ষ অনাস্থা জানিয়েই এসব জোটের সৃষ্টি হয়েছিল।

চলমান ইরান-মার্কিন সংঘাত এই সুপ্ত দ্বিমুখী নীতিকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। তবে একই সঙ্গে জোটগুলোর একক রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার সীমাবদ্ধতাকেও ফুটিয়ে তুলেছে। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে কেবল রাশিয়া সরাসরি মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। বিপরীত দিকে, চীনসহ অধিকাংশ সদস্য দেশ অনেক বেশি মেপে মেপে পা ফেলছে।

সামরিক ও কূটনৈতিক এই সংঘাত ব্রিকস ও এসসিওর সামনে প্রধান তিনটি বড় ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জ হাজির করেছে। পারস্য উপসাগর এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি আগের স্থিতিশীলতায় ফিরে যাবে—এমন ভাবনার সুযোগ আর নেই। ওয়াশিংটন ইরানকে রাজনৈতিক শত্রু থেকে সরাসরি সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত করায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি করিডোর স্থায়ীভাবে বদলে যাচ্ছে। রাশিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো নিজস্ব সম্পদ থাকা দেশের জন্য এটি সামলানো সম্ভব হলেও, চীন ও ভারতের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

এ ছাড়া রাশিয়াকে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে যুক্তকারী কৌশলগত আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোরের কেন্দ্রে অবস্থান করছে ইরান। সেখানে টানা অস্থিরতা বিনিয়োগ ও পরিবহন ব্যবস্থাকে অনিশ্চিত করে তুলছে। পাশাপাশি ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যকার পরোক্ষ উত্তেজনা বাড়তে থাকলে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকেও নতুন করে পরিকল্পনা করতে হবে।

এমনকি, ওয়াশিংটন ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাত জোরাল করার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। তবে পারস্য উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো নিজেদের অঞ্চলকে ইসরায়েলের মতো সামরিকীকরণ এলাকায় রূপ দিতে অনিচ্ছুক। প্রতিটি নতুন সামরিক উত্তেজনা তাদের কৌশলগত সমীকরণকে জটিল করে তুলছে।

এই রূপান্তর ব্রিকস বা এসসিওকে কোনো আদর্শিক যুদ্ধে না জড়িয়েই নিজেদের অবস্থান শক্ত করার সুযোগ এনে দিচ্ছে। ভিন্নমতের সদস্য দেশগুলোর ওপর জোরপূর্বক একক পররাষ্ট্রনীতি চাপিয়ে দিলে কেবল অভ্যন্তরীণ বিভাজনই বাড়ে। এসব জোটের আসল শক্তি লুকিয়ে আছে তাদের নমনীয়তার মধ্যে। এটি এমন এক মুক্ত মঞ্চ, যেখানে দেশগুলো নিজেদের সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি বজায় রেখেও যৌথ স্বার্থে কাজ করতে পারে।

পশ্চিমা আধিপত্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বৈশ্বিক কাঠামোর পতন কোনো সাময়িক ঘটনা নয়। ব্রিকস ও এসসিওর লক্ষ্য কৃত্রিম রাজনৈতিক ঐক্য প্রদর্শন করা নয়; বরং বিশ্বব্যবস্থার এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ফলে যে ভূরাজনৈতিক ফাঁকা জায়গা বা স্ট্র্যাটেজিক স্পেস তৈরি হচ্ছে, তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা। আগামী দিনে এটিই হতে পারে অ-পশ্চিমি জোটগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here