ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১৬৭এ ধারার অধীনে “শো’ন এরেস্ট” (Shown Arrest) পদ্ধতি ব্যবহার করে আদালতের দেওয়া জামিন কার্যত অকার্যকর করে দেওয়ার প্রবণতা বন্ধে যথাযথ নির্দেশিকা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কাছে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
আজ আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছে রেজিস্টার্ড ডাকযোগে নোটিশটি পাঠানো হয়। নোটিশে বলা হয়েছে, নোটিশ পাওয়ার পাঁচ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়েরসহ অন্যান্য আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট এবং তিনজন আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাউছার, মো. মাকসুদুর রহমান ও মারুফ হাসান তমালের পক্ষে নোটিশটি পাঠান।
নোটিশে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ আমল থেকেই জামিনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার নজির রয়েছে। পাকিস্তান আমল পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময়ে একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। অথচ আইনের সাধারণ নীতি হলো, জামিনই হবে স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, একজন ব্যক্তি একটি মামলায় জামিন পাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁকে অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আবার হেফাজতে রাখছে। এর ফলে আদালতের দেওয়া জামিনের কার্যকারিতা নষ্ট হচ্ছে এবং বিচার প্রার্থীদের সংবিধান-স্বীকৃত মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
নোটিশে আরও বলা হয়েছে, ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে কার্যবিধিতে ১৬৭এ ধারা সংযোজন করা হয়েছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, অন্য কোনো মামলায় ইতোমধ্যে হেফাজতে থাকা একজন ব্যক্তিকে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন তখনই ম্যাজিস্ট্রেট অনুমোদন করতে পারবেন, যখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কেস ডায়েরির অনুলিপিসহ তাঁর সামনে হাজির করা হবে, তাঁকে নিজের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে এবং আবেদনটি যথাযথ ভিত্তিসম্পন্ন (well-founded) বলে আদালতের নিকট প্রতীয়মান হবে। নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সংবিধানের ৩২, ৩৩, ৩৫ ও ৩৬ অনুচ্ছেদে ব্যক্তিস্বাধীনতা, গ্রেপ্তার ও আটক থেকে আইনি সুরক্ষা, ন্যায্য বিচার এবং চলাফেরার স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক এবং নারায়ণগঞ্জের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর দৃষ্টান্ত তুলে ধরে নোটিশে বলা হয়, অনেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে জামিন পাওয়ার পর পৃথক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি বিস্তৃত ও নিয়মিত প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়, যার প্রতিকার বিচার বিভাগের মাধ্যমে হওয়া প্রয়োজন।
কার্যবিধির ৫৪, ৬১, ১৬৭ ও ১৬৭এ ধারায় যে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, তা অনেক ক্ষেত্রে যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। অনেক সময় নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে প্রকৃত আইনগতভিত্তিক যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে না, বিস্তারিত কারণ উল্লেখ না করেই রিমান্ড মঞ্জুর করা হচ্ছে এবং ১৬৭এ ধারার আবেদন সত্যিই “যথাযথ ভিত্তিসম্পন্ন” কি না, তা স্পষ্টভাবে পরীক্ষা না করেই অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে।
নোটিশে সাইফুজ্জামান বনাম রাষ্ট্র (৫৬ ডিএলআর, ২০০৪) মামলার রায় উল্লেখ করে বলা হয়েছে, পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা বিচার বিভাগের দায়িত্ব। এ ধরনের অপব্যবহারের ফলে একজন বিচারপ্রার্থী যেন “সাপ-লুডু” খেলায় আটকে যান, যেখানে জামিন পাওয়ার পরও নতুন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তাঁকে আবার শুরুতে ফিরে যেতে হয়। একই রায়ে আরও বলা হয়েছে, যান্ত্রিকভাবে আদেশ দেওয়া আইনের ন্যূনতম শর্ত পূরণ করে না এবং ম্যাজিস্ট্রেটদের নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এছাড়া ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিনয় কুমার সিং বনাম ঝাড়খণ্ড রাজ্য (১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) মামলার পর্যবেক্ষণও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে আদালত বলেছেন, জামিন পাওয়ার পরও কাউকে হেফাজতে রাখতে ধারাবাহিকভাবে নতুন এফআইআর করার প্রবণতা গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে, যথাযথ ভিত্তি ছাড়া “শো’ন এরেস্ট” ব্যবহার করে একজনকে একের পর এক মামলায় আটক রাখা হলে জামিনের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে যায় এবং তা কার্যত আইন বহির্ভূত একটি বিকল্প শাস্তিমূলক ব্যবস্থায় পরিণত হয়। নোটিশে বাংলাদেশ বনাম ব্লাস্ট (৬৯ ডিএলআর (এডি), ২০১৭) মামলার রায়ও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, অবৈধ গ্রেপ্তার ও আটকের ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দায় এড়াতে পারে না। এ ধরনের ঘটনার প্রতিকার পেতে সাধারণ মানুষকে নানা বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।
নোটিশে বলা হয়েছে, শুধু প্রশাসনিক আশ্বাস বা পৃথক পৃথক মামলায় ব্যবস্থা নিয়ে এই পদ্ধতিগত সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কাজেই জামিন রোধের উদ্দেশ্যে ১৬৭এ ধারার অধীনে “শো’ন এরেস্ট” ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর ও বাধ্যতামূলক নির্দেশিকা প্রণয়ন করা জরুরি, যাতে “যথাযথ ভিত্তিসম্পন্ন” শর্তটি শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল কে যথাযথ নির্দেশিকা প্রদানের অনুরোধ করা হয়েছে।
ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব বলেন, নোটিশে তিনটি সুনির্দিষ্ট অনুরোধ জানানো হয়েছে। প্রথমত, জামিন অকার্যকর করার উদ্দেশ্যে “শো’ন এরেস্ট” ব্যবহারের প্রথা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৭এ ধারার আবেদন কখন “যথাযথ ভিত্তিসম্পন্ন” বলে গণ্য হবে, তার স্পষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করে সকল ম্যাজিস্ট্রেট ও তদন্তকারী সংস্থার জন্য বাধ্যতামূলক নির্দেশিকা বা পরিপত্র জারি করতে হবে। তৃতীয়ত, কোনো ব্যক্তি একটি মামলায় জামিন পাওয়ার পর, ১৬৭এ ধারার সব শর্ত কঠোরভাবে পূরণ না হলে তাঁকে অন্য কোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো যাবে না।
তিনি আরও বলেন, নোটিশ পাওয়ার পাঁচ দিনের মধ্যে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে নোটিশকারীদের পক্ষে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে প্রয়োজনীয় আইনি প্রতিকার চাওয়া হবে।





