জুলাই গেজেট : একটি রাষ্ট্রীয় জালিয়াতির দলিল

0
6

সরকারি গেজেট বলছে ৮৩৫, জাতিসংঘ বলছে ১৪০০। মাঝখানের পাঁচশোর বেশি মানুষের নাম কোথায়, পরিচয় কী, তারা আসলে কারা? দেড় বছর পার হয়ে গেছে, অথচ এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি। বরং গেজেটে নাম ওঠা অনেকের মৃত্যুর ঘটনা যখন খোলাসা করা হচ্ছে, তখন আঁতকে ওঠার পালা। যে গেজেট শহীদের তালিকা হওয়ার কথা ছিল, সেটাই হয়ে উঠেছে এক রাজনৈতিক অস্ত্র, যেখানে মেশানো আছে লুটপাট করতে গিয়ে আগুনে পোড়া মানুষ থেকে শুরু করে দলীয় কোন্দলে খুন হওয়া ব্যক্তিও।

সরকারি গেজেটের এই তালিকায় ঢুকেছে বগুড়ার স্কুল শিক্ষক সেলিম রেজা। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া এই মানুষটিকে পুলিশ নয়, খুন করেছে স্বপক্ষের বিক্ষোভকারীরাই। রড দিয়ে পিটিয়ে, ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় তাঁকে। অথচ সেই হত্যার দায় চাপানো হয়েছে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ওপর, মামলায় আসামি করা হয়েছে ১০১ জন আওয়ামী নেতাকর্মীকে। শহীদ গেজেটে তাঁর নাম ৫১৮ নম্বরে।

একইভাবে নারায়ণগঞ্জের ডাচ বাংলা ব্যাংকের শাখায় ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনের কাজ করতে যাওয়া সোহেল আহমদ, আব্দুস সালাম ও সেলিম মন্ডল। আন্দোলনকারীরা ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়, ওপর তলায় পুলিশ ব্যারাক টার্গেট করে। ওই আগুনেই পুড়ে মারা যান এই তিন শ্রমিক। তাঁদের হত্যার দায়ও দেওয়া হয়েছে শেখ হাসিনাকে। গেজেটে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে ৪৪২, ৪৮৫ ও ৫২৬ নম্বরে। ঘটনার ১১ মাস পর আব্দুস সালামকে “গুলি করে হত্যার” অভিযোগে মামলা হয়, অথচ স্বজনরাই বলছেন মৃত্যু হয়েছে আগুনে পুড়ে।

চট্টগ্রামের ট্রাক হেল্পার কিশোর আব্দুল মজিদ। অভাবের সংসারে কাজ নেওয়া এই ছেলেটিকে পুড়িয়ে মারা হয় ট্রাকের ভেতরেই। আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড দিয়ে ট্রাকে আগুন দেয়, সেই আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যায় সে। গেজেটে তার নাম ৩৮ নম্বরে। এই হত্যার দায়ও চাপানো হলো আওয়ামী লীগের ওপর।

আর যশোরের জাবির ইন্টারন্যাশনাল হোটেলের ঘটনা তো রীতিমতো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কীভাবে লুটেরাদের শহীদ বানানো হয়েছে। ৫ আগস্ট বিজয় মিছিল থেকে দুর্বৃত্তরা হামলা চালায় ১৬ তলা ওই বিলাসবহুল হোটেলে। বেসমেন্ট থেকে শুরু করে ১৪ তলা পর্যন্ত লুটপাট চলে, চলে মদ্যপান। তারপর একদল নিচে আগুন ধরিয়ে দেয়। ওই আগুনে ওপরের তলায় আটকা পড়া ২৩ জন লুটেরা পুড়ে মরে। ইন্দোনেশিয়ার একজন নাগরিকও মারা যান এই অগ্নিকাণ্ডে। সেই ২৩ জনই জায়গা করে নিয়েছে শহীদ গেজেটে। ২৯ নম্বর রোকনুজ্জামান রাকিব, ৩০ নম্বর শাওয়ান্ত মেহতাব, ৩১ নম্বর তারেক রহমান, ৩২ নম্বর আলামিন বিশ্বাস, ৬৯ নম্বর আবরার মাসনুন নীলসহ একে একে সবাই। অথচ স্থানীয়ভাবে মৃতের সংখ্যা ২৪ জন জানা গেলেও আরও ৮ জনের নাম বেরিয়ে এসেছে যারা গেজেটেও ঠাঁই পায়নি। লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মামলায় গ্রেপ্তার করা হচ্ছে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের। অথচ এই হোটেলে হামলা, লুটপাট আর অগ্নিসংযোগ কারা করেছিল, তা কারও অজানা নয়।

এই তো বাস্তবতা। যে গেজেটকে ভিত্তি ধরে বসে থাকা হচ্ছে, সেই গেজেটেই লুটপাট করতে যাওয়া সন্ত্রাসী, আন্দোলনের নামে খুন হওয়া নির্দোষ মানুষ আর দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত ব্যক্তিরা সবাই একাকার হয়ে গেছেন। অথচ জাতিসংঘের ওএইচসিএইচআর বেখাপ্পা ১৪০০ সংখ্যা হাজির করে বসে আছে। কোন তথ্যের ভিত্তিতে, কার দেওয়া রিপোর্টের ওপর দাঁড়িয়ে এই সংখ্যা? নদীতে লাশ ভাসানোর গুজব, কোথাও গণকবরের অস্তিত্ব নেই, অথচ সেইসব গল্প ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রচার করা হয়েছে। জাতিসংঘ এই ১৪০০ সংখ্যার পক্ষে কোনো নাম, কোনো পরিচয়, কোনো তথ্যপ্রমাণ আজ পর্যন্ত হাজির করতে পারেনি। পারে না, কারণ সেই সংখ্যা আরোপিত, বানানো, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

অথচ এই ভুয়া সংখ্যার ওপর ভর করেই বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হয়েছে। বিদেশী অর্থায়নে, ইসলামি জঙ্গি গোষ্ঠীর মদদে আর সামরিক বাহিনীর নীরব সমর্থনে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশজুড়ে যে দাঙ্গা বাঁধানো হয়, সেই দাঙ্গার আড়ালেই সাজানো নাটকের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে নেয় সুদী মহাজন ইউনুস ও তার সহযোগীরা। বিএনপি আর জামাতে ইসলাম আজ সেই ক্ষমতার ভাগ বসানো অংশীদার। বর্তমানে ২০২৬ সালের জুলাই মাস, বিএনপি এখন পুরোদস্তুর ক্ষমতায়। অথচ জুলাই গেজেটের এই ফারসি নাটক, শহীদের পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশা, জাতিসংঘের ভিত্তিহীন রিপোর্টের ওপর নির্ভর করে সংঘটিত অন্যায়ের কোনো বিচার তো দূরের কথা, জবাবদিহিতাও হচ্ছে না।

প্রশ্নটা এখন সোজা। জাতিসংঘ যদি সত্যিই মানবাধিকারের কথা ভাবে, তাহলে তাদেরই উচিত ১৪০০ সংখ্যার পক্ষে প্রমাণ হাজির করা। বাকি সেই সাড়ে পাঁচশো মানুষের নাম, পরিচয়, মৃত্যুর স্থান আর ঘটনার বিবরণ জনসম্মুখে আনা। যদি সেই প্রমাণ না থাকে, তাহলে এই পুরো আখ্যানটাই যে একটি সাজানো অপপ্রচার, সেটা স্বীকার করে নিতে তো তাদের বাধা থাকার কথা না। আর যারা এই ভুয়া গেজেট তৈরি করে দেশি-বিদেশি চক্রান্তের হাতিয়ার হয়েছে, তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা অতি জরুরী। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ঠগ বাছতে গাঁ উজাড়ের এই জুলাই ষড়যন্ত্রের ক্ষেতে লোভী বিড়ালের গলায় ঘন্টাটা বাঁধবেটা কে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here