রুম নাম্বার ১৪৬ (৪৮)

0
216
Showkat Ahsan Farugue-Deshinfo
Showkat Ahsan Farugue-Deshinfo

শওকত আহসান ফারুক: আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন নিয়ে পড়েছি। বেড়ে উঠা কুমিল্লা শহরে, শৈশব কেটেছে জন্মভুমি হাটখোলা কুমিল্লা গ্রামের বাড়িতে। শহর ও গ্রামের রসায়ন নিয়ে গড়েছি নিজের জীবন।

এখন আবসর জীবন যাপন করছি। পঁয়ষট্টি বৎসরের জীবনে ফিরে দেখা অতীত ও ঐতিহ্য নিয়ে লিখছি, রুম নাম্বার ১৪৬। সেটিকেই এখানে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা।

১৪২.
দেশের এবং যুদ্ধের সামগ্রীক পরিস্থিতি বিচার বিশ্লেষণ করে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধান মন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, ১১ই ডিসেম্বর যশোরে এক বিরাট জনসভায় কয়েকটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন।

হিন্দু সম্প্রদায়, আওয়ামী লীগ এবং স্বাধীনতার স্বপক্ষের লোকজন বাড়িঘর, ব্যবসা বাণিজ্য ছেড়ে, ২৫ মার্চ থেকে শরণার্থী ও মুক্তিযুদ্ধে চলে যায়। সারাদেশে আলবদর, রাজাকারসহ স্বাধীনতা বিরোধী একদল লোক সেইসব বাড়িঘর ও প্রতিষ্ঠান দখল, ধর্ষণ, লুটপাট এবং নির্বিচারে অগ্নিসংযোগ করেছিলো।

একটা নৈরাজ্য কায়েম করেছিলো, কোন কোন বাড়ির দরোজা, জানালা এমনকি চৌকাঠ পূর্যন্ত খুলে নিয়ে গিয়েছিলো। সেই সময় বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিলো হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা মুদি, ঔষধ, কাপড়, জুয়েলারীসহ সব ধরণের ব্যবসা ছিলো তাদের একছত্র আধিপত্য। সেইসব দোকানপাঠ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করে নিয়েছিলো পাকিস্তানি সমর্থন পুষ্ট লোকেরা। সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে স্বাধীনতার প্রাগ্য নেতাগণ দিয়ে ছিলেন সেই গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ। এর মধ্য উল্লেখযোগ্য ছিলো,

১. সমস্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে হবে।
২. ২৫ মার্চের আগের মালিককে দখলকৃত সব সম্পত্তি ফেরত দিতে হবে।
৩. দেশের সব নাগরিকের সমঅধিকার এবং
৪. স্বাধীনতা বিরোধী চারটি রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেছিলেন।

সেদিন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, দেশী-বিদেশী সাংবাদিকদের সম্মুখে যশোর সার্কিট হাউসে, এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলে, ‘আমরা অনতিবিলম্বে বাংলাদেশের সংবিধান রচনা করবে, যা ২৪ বছরে পাকিস্তান করতে পারেনি।’

একাত্তরের এই দিনে হিলি সীমান্তে যৌথবাহিনী প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখোমুখি পড়েছিলো। মার্কিন সপ্তম নৌবিহারের টাস্কফোর্স বঙ্গোপসাগর অভিমুখে। মিত্রবাহিনী এগিয়ে চলছে। মৌলভীবাজার, নরসিংদীতে যৌথবাহিনীর দখল প্রতিষ্ঠা হয়। এদিকে দেশের অধিকাংশ জেলা স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো। সন্ধ্যায় গোবিন্দগঞ্জে হানাদার বাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটিতে তীব্র আক্রমণ করেছিলো, সারারাত যুদ্ধ শেষে ভোরে গোবিন্দগঞ্জ শত্রুমুক্ত হয়েছিলো।

সেইদিন জাতিসংঘের অনুরোধে বিদেশি নাগরিকদের স্থানান্তরের জন্য ঢাকা বিমানবন্দরে মিত্রবাহিনী সাময়িক সময়ের জন্য বিমান হামলা স্থগিত করেছিলো। যুদ্ধ বিরতির জন্য প্রাদেশিক সরকারের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী জাতিসংঘ সদর দফতরে জরুরি বার্তা প্রেরণ করেছিলেন।

ময়মনসিংহ, গাইবান্ধা, চণ্ডীপুর, টাঙ্গাইল, কুষ্টিয়া, ফুলছড়িহাট ও বাহাদুরবাদ ঘাটসহ অবরুদ্ধ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ এই সব জায়গা হয় মুক্তাঞ্চল। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর ৬ দিনব্যাপী অবরোধ ও প্রচণ্ড যুদ্ধের পর সেদিন ভোরে জামালপুর স্বাধীন হয়েছিলো। জামালপুর গ্যারিসনে অবস্থানকারী পাকিস্তানি বাহিনী ২১ বেলুচ রেজিমেন্টে অফিসার সহ শত শত সেনা সদস্য যৌথবাহিনীর আছে আত্মসমর্পণ করেছিলো, সেই যুদ্ধে প্রায় চারশতাধীক পাকিস্তানি হতাহত হয়েছিলো।

১১ই ডিসেম্বরে জাতিসংঘে পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা ত্মাসমর্পণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

১৪৩.

১২ ডিসেম্বর যৌথবাহিনীর টাঙ্গাইলে আক্রমণ এবং সারাদিন-রাত যুদ্ধ শেষে ভোরে পাকিস্তানি বাহিনী অস্ত্র সংবরণ করেছিলো। ঢাকায় সামরিক অবস্থানের ওপর বিমান হামলা অব্যাহত ছিলো। সেইদিন কোনো সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়নি। ঢাকায় কারফিউ অব্যাহত এবং ঘরে ঘরে তল্লাশি চলেছিলো। রাতে এক বৈঠকে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো প্রাদেশিক সরকারের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর সভাপতিত্বে, আলবদর, আলশামস কেন্দ্রীয় অধিনায়কগণ এতে যোগ দিয়েছিলেন।

সেই বৈঠকে পরাজয় নিশ্চিত জেনে বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা প্রণয়ন করা হয়েছিলো। রাও ফরমান আলী আলবদর ও আলশামসের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, সারাদেশে বুদ্ধিজীবীসহ বিশেষ বিশেষ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের নামের তালিকা। ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা অপারেশন সার্চ লাইটের মূল পরিকল্পনাকারী ‘রাও ফরমান আলী’।

পূর্ববাংলার জনগণকে বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করার কাজে বরাবরই তৎপর ছিলেন বুদ্ধিজীবীরা, তাঁরা পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের স্বৈরাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনগণকে আন্দোলনে অনুপ্রাণিত করেছিলেন, এই কারণে পূর্ববাংলার বুদ্ধিজীবীরা বরাবরই ছিলেন পাকিস্তানি শাসকদের বিরাগভাজন।

মূলত ২৫ মার্চ থেকেই চলেছে বুদ্ধিজীবী হত্যা, লক্ষ্য ছিল বুদ্ধিজীবীদের নিশ্চিহ্ন করে বাঙালি জাতিকে নেতৃত্বহীন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়ায় পরিণত করা।

বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা হিসেবে সে রাতে থেকেই আলবদর, আলশামস বাহিনী সারা দেশে সাংবাদিক, দার্শনিক, আইনজীবী, শিক্ষাবীদ, বিজ্ঞানী, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক সহ বিশিষ্ট জনকে নিজ নিজ বাস ভবন, কর্মস্থল থেকে তুলে নেওয়া শুরু করেছিলো। যাদের অপহরণ করেছিলো। তারা আর কখনও ফিরে আসেননি। পাক হানাদার বাহিনীর দোসর ধর্মান্ধ ফ্যাসিস্ট বাহিনীর হাতে তারা সারা দেশে প্রায় নয় শতাধীক বুদ্ধিজীবী অপহৃত হয়েছিলো।

সেইদিন চার নম্বর সেক্টরের বীর মুক্তিবাহিনী হরিপুর আক্রমণ করেছিলো এবং পরদিন হরিপুর শত্রুমুক্ত হয়েছিলো, নীলফামারী, গাইবান্ধা, নরসিংদী, সরিষাবাড়ী, ভেড়ামারা, শ্রীপুর সহ বহু এলাকায় সেইদিন উড়ছে স্বাধীনতার পতাকা।

ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ব্যাপকভাবে সমর্থন দেয়ার জন্য ভারত সরকার ও ভারতীয় জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়ে ছিলেন। বিবৃতিতে তিনি বলেছিলেন, আমার শেষ সংগ্রাম বাংলাদেশকে স্বাধীন করা ও সমাজতন্ত্রবাদ প্রতিষ্ঠা করা।

দেশবাসী উৎকন্ঠা আতঙ্কের মাঝেও জয়ের উৎসবে আনন্দিত।

১৪৪.

জনযুদ্ধে জয় সুনিশ্চত। ১৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে জাতিসংঘের যেসব কর্মী, কূটনৈতিক, প্রতিনিধি ও বিদেশি নাগরিক নিরাপদে সরে আসতে চান বাংলাদেশ সরকার তাদের সম্ভাব্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেবে।’

দিকে দিকে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণ শুরু হয়ে গেছে। যৌথবাহিনী, মুক্তিবাহিনী, মিত্রবাহিনী ঢাকায় ঢুকে গেছে। ঢাকায় রাজপথে নেমেছে জনতার ঢল। জয় বাংলা শ্লোগানে বিজয়ের পতাকা উড়ছে। আকাশে, জলে, স্থলে সবদিকে হানাদাররা অবরুদ্ধ। সেইদিনও জেনারেল নিয়াজি রাওয়ালপিন্ডিতে আরজি পাঠিয়েছিলেন, ‘আরো সাহায্য চাই।’

সেইদিন ময়ানমতি সেনানিবাসে আত্মসমর্পণ করল এক হাজার ১৩৪ জন, সৈয়দপুরে আত্মসমর্পণ করে ৪৮ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অধিনায়কসহ ১০৭ জন। খুলনা, বগুড়া ও চট্টগ্রামে হানাদারদের সঙ্গে মুক্তিবাহিনী ও স্থানীয় মানুষের অবিরাম যুদ্ধ চলছে। মুজিবনগরে তখন চরম উত্তেজনা।

রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্রের অনুষ্ঠান বন্ধ। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের স্টুডিওতে বসে বার্তা বিভাগীয় প্রধান কামাল লোহানী, আলী যাকের ও আলমগীর কবির ঘন ঘন সংবাদ বুলেটিন পাঠ করছিলেন। বুলেটিনের প্রধান শিরোনাম, ঢাকা ছাড়া বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা এখন মুক্তাঞ্চল, জয় বাংলা ধ্বনিতে প্রাবিত সারাদেশ, জয় আনন্দে ভাসছে দেশ।

১৪ ডিসেম্বর রাতে, রাও ফরমান আলীর নির্দেশে আলবদর আলশাম বাহিনী অপহরণ চালিয়ে যাচ্ছে। সেদিন ঢাকায় দুই শতেরও বেশি বুদ্ধিজীবীকে তাঁদের বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিলো। ঢাকায় এ হত্যাকান্ড শুরু হয় এবং ক্রমে ক্রমে তা সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের জেলা ও মহকুমা শহরেও সম্প্রসারিত হয়েছিলো, হত্যাকারীরা চিহ্নিত বুদ্ধিজীবীদের তুলে নিয়ে কালো কাপড়ে চোখ বেঁধে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, নাখালপাড়া, রাজারবাগ, ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার নির্যাতন কেন্দ্র নিয়ে নির্যতন করেছিলো, শহরে জারীকৃত কার্ফু্যর সুযোগে বুদ্ধিজীবীদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে তাঁদের উপর চালিয়ে ছিলো নির্মম দৈহিক নির্যাতন, বেয়নেটের আঘাতে তাঁদের দেহ ক্ষতিবিক্ষত করে হত্যা করেছিলো।

ঢাকা শহরের প্রধান প্রধান বধ্যভূমি ছিল আলেকদি, কালাপানি, রাইনখোলা, মিরপুর বাংলা কলেজের পশ্চাদ্ভাগ, হরিরামপুর গোরস্তান, মিরপুরের শিয়ালবাড়ি, রায়ের বাজার, মিরপুরের জলাভূমির ডোবানালা। চলবে………….।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here