পরিবহন ধর্মঘটে শ্রমিকদের বাধার মুখে পড়ে অ্যাম্বুলেন্স আটকা পড়ে শিশুর মৃত্যু

0
294

হাসপাতালে যাওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্সটি পরিবহন শ্রমিকদের বাধার মুখে পড়ে। এতে শিশুটি মারা যায় বলে অভিযোগ করা হয়।

সড়ক পরিবহন আইনের কয়েকটি ধারা সংশোধনসহ ৮ দফা দাবিতে পরিবহন শ্রমিকদের ডাকা ৪৮ ঘণ্টার ধর্মঘটে বিপাকে পড়েছেন যাত্রীরা। পথে পথে অ্যাম্বুলেন্স, ওষুধের গাড়ি, বিদেশ যাত্রী, পরীক্ষার্থীর যানবাহনও আটকে দেওয়া হয়েছে।

শিশুর অভিভাবকরা অ্যাম্বুলেন্সে করে সকাল ১০টার দিকে শিশুটিকে নিয়ে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা হন। যাওয়ার পথে উপজেলার পুরাতন বড়লেখা বাজার, দাসেরবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে অ্যাম্বুলেন্সটি পরিবহন শ্রমিকদের বাধার মুখে পড়ে। অ্যাম্বুলেন্সটি চান্দগ্রাম নামক স্থানে গেলে পরিবহন শ্রমিকরা গাড়ি আটকে চালককে মারধর করে। এখানে প্রায় দেড় ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্সটি আটকা থাকে। দুপুর দেড়টার দিকে গাড়ি ছাড়া পেলে শিশুটিকে পাশের সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এরই ধারাবাহিকতায় মৌলভীবাজারের বড়লেখায় পরিবহন শ্রমিকদের বাধায় আটকা পড়া অ্যাম্বুলেন্সে সাত দিনের এক কন্যা শিশু মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। রবিবার দুপুর আড়াইটার দিকে উপজেলার নিজবাহাদুরপুর ইউনিয়নের চান্দগ্রাম এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

শিশুর পরিবারের অভিযোগ, বড়লেখা উপজেলার সদর ইউনিয়নের অজমির গ্রামের কুটন মিয়ার সাত দিনের শিশু কন্যাকে অসুস্থ অবস্থায় রবিবার সকালের দিকে বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালের চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য শিশুটিকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন।

মৃত শিশুর চাচা আকবর আলী ওরফে ফুলু মিয়া বলেন, ‘আমার ভাতিজী মায়ের দুধ খাচ্ছিল না। এজন্য তাকে বড়লেখা হাসপাতালে নিয়ে যাই। ডাক্তাররা তাকে সিলেট ওসমানীতে রেফার করেন। সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে সিলেট রওনা দিই। প্রথমে দাসেরবাজারে গাড়ি আটকে চালককে মারধর করেন পরিবহন শ্রমিকরা। পরে অনুরোধ করলে গাড়ি ছাড়ে। চান্দগ্রামে আবার অ্যাম্বুলেন্স আটকে গাড়ির চাবি নিয়ে যায়। ৫০০ টাকা দাবি করে। প্রায় দেড় ঘণ্টা এখানে আটকে ছিলাম। এখানে মেয়েটা মারা গেছে। আমরা বড়লেখা থানায় গিয়ে অভিযোগ দিছি।’

সিএনজি পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন বড়লেখা উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন  সন্ধ্যায় বলেন,  ‘সিএনজি শ্রমিকরা যেখানে যেখানে ব্যারিকেড দিয়েছিল সকালেই তা তুলে দিয়েছি। অ্যাম্বুলেন্স আটকানোর সঙ্গে কোনো সিএনজি শ্রমিক জড়িত না।’

বড়লেখা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জসীম বলেন, ‘একটি শিশু মারা যাওয়ার কথা লোকজন বলাবলি করছে। সিলেটে যাওয়ার পথে রাস্তায় আটকে মারা গেছে। এরকম কথা উঠেছে। তবে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আট দফা দাবি আদায়ে মানুষের দুর্ভোগ বুঝলেও ধর্মঘট চলবেই

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, ‘এই কর্মবিরতি আমরা বাধ্য হয়ে ঘোষণা করেছি। সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ পাস হওয়ার আগে আমরা একাধিকবার স্মারকলিপি দিয়েছি। আমাদের দাবি-দাওয়া সরকারকে জানিয়েছি। মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করেছি। কিন্তু কেউ আমাদের দাবি-দাওয়ায় কর্ণপাত করেননি। বরং আমাদের শ্রমিক ভাইদের অসহায়ত্বের সুযোগ নেয়া হয়েছে। যে কারণে আজকে কর্মবিরতি চলছে।’

সংসদে সদ্য পাস হওয়া ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ এর কয়েকটি ধারা সংশোধনসহ আট দফা দাবি আদায়ে পরিবহন শ্রমিকদের ডাকা ৪৮ ঘণ্টার ধর্মঘট প্রত্যাহার করা সম্ভব না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতারা।

পরিবহন শ্রমিকদের আট দফা দাবি হলো

১. সড়ক দুর্ঘটনায় মামলা জামিনযোগ্য করতে হবে;

২. শ্রমিকদের অর্থদণ্ড পাঁচ লাখ টাকা করা যাবে না;

৩. সড়ক দুর্ঘটনা তদন্ত কমিটিতে শ্রমিক প্রতিনিধি রাখতে হবে;

৪. ড্রাইভিং লাইসেন্সে শিক্ষাগত যোগ্যতা পঞ্চম শ্রেণি করতে হবে;

৫. ওয়েটস্কেলে (ট্রাক ওজন স্কেল) জরিমানা কমানোসহ শাস্তি বাতিল করতে হবে;

৬. সড়কে পুলিশের হয়রানি বন্ধ করতে হবে;

৭. গাড়ির রেজিস্ট্রেশনের সময় শ্রমিকদের নিয়োগপত্র সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সত্যায়িত স্বাক্ষর থাকার ব্যবস্থা করতে হবে;

৮. সব জেলায় শ্রমিকদের ব্যাপকহারে প্রশিক্ষণ দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করতে হবে এবং লাইসেন্স ইস্যুর ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করতে হবে।

সোমবার ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিনে ফেডারেশনের নেতারা বলেছেন, ঢাকাসহ দেশব্যাপী ঘোষিত ৪৮ ঘণ্টার কর্মবিরতি প্রত্যাহারের সুযোগ নেই। সরকার এখনও ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। আমরা সরকারকে জানান দিতে চাই, সংসদে সদ্য পাস হওয়া ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ এর কয়েকটি ধারা সংশোধন না করলে আমরা গাড়ি চালাব না।

তিনি বলেন, ‘শ্রমিক ফেডারেশনের ধর্মঘটে চরম দুর্ভোগে পড়েছে মানুষ। আমরা সেটা উপলব্ধি করছি। কিন্তু সরকার তো আমাদের কষ্ট, দাবি-দাওয়া উপলব্ধি করছে না। এখন পর্যন্ত সরকার ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। তাই দেশব্যাপী চলমান ৪৮ ঘণ্টার পরিবহন ধর্মঘট এই মুহূর্তে প্রত্যাহার করা সম্ভব নয়।’

ওসমান আলী বলেন, ‘এই মুহূর্তে আইন পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ নেই বলে গণমাধ্যমে মতামত জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি আমাদের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন। আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করা যেত। আমাদের সঙ্গে বসতে পারতেন। কিন্তু কোনোটাই হয়নি।’ ধর্মঘট শেষে মঙ্গলবার (৩০ অক্টোবর) পরবর্তী কর্মসূচি সম্পর্কে ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মোহাতার হোসেন বলেন, ‘আমাদের কর্মবিরতি চলছে, ধর্মঘট নয়। আমাদের কর্মবিরতির কারণে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। তা দেখে আমাদের খারাপ লাগছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে আমাদের এই কর্মসূচি নয়। আমরা সরকারকে জানান দিতে চাই-এই আইন থাকলে আমরা গাড়ি চালাব না।’

সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা ও হত্যা প্রমাণিত হলে ৩০২ ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে সংসদে পাস হয় ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’। তবে এই আইন না মানার ঘোষণা দিয়ে আট দফা দাবি উত্থাপন করে ধর্মঘটে নেমেছে শ্রমিক ফেডারেশন। বেশ কয়েকটি পরিবহন মালিক সংগঠন শ্রমিকদের আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছে। তারা গাড়ি বের না করার নির্দেশনাও দিয়েছেন।

দ্বিতীয় দিনে পরিবহন ধর্মঘটের কারণে সড়কে চলছে চরম ভোগান্তি। গণপরিবহন বলতে শুধু বিআরটিসির বাস চলছে। আধাঘণ্টা কিংবা ২০ মিনিট পর একটা করে বাস চলতে দেখা গেলেও যাত্রীতে ঠাসা। এর মধ্যেই অনেককে ঝুঁকি নিয়ে উঠতে দেখা গেছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here