তিন সরকারের বাজেটে আসলে কী আছে?

0
190

সাজ্জাদ আলম খান: বাংলাদেশে দীর্ঘ বা স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে যেমন জনআগ্রহ নেই; তেমনি বোদ্ধা মহল এ বিষয়ে উচ্চবাচ্যে সময় ব্যয় করে না। তবে বাজেট পর্যালোচনার প্রস্তুতি থাকে যথেষ্ট। মূলত মেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাজেটে গুরুত্ব পায় বিনিয়োগ পরিকল্পনা, ঋণ গ্রহণের প্রবণতা, ব্যয়ের অগ্রাধিকার খাত।

এসব পর্যালোচনায় বের হয়ে আসে সরকারের রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। প্রতিবছর বাড়ছে বাজেটের অবয়ব; কিন্তু বাস্তবায়ন সক্ষমতা বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাচ্ছে। তবে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনার বাস্তবায়ন কতটুকু হবে, তা নিশ্চিত করেননি অর্থমন্ত্রী।

মূলত তিনটি সরকার এ বাজেট বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে। বিদায়ী, নির্বাচনকালীন ও নতুন সরকার এক্ষেত্রে কোন ধরনের কর্মকৌশল গ্রহণ করে, তা ভাবার বিষয়। সংস্কারবিমুখ এ বাজেট সংখ্যাগরিষ্ঠের যাপিত জীবনে যে যথেষ্ট প্রভাব ফেলবে, তা সহজেই অনুমেয়।

তাই এবারের চ্যালেঞ্জ অন্যবারের চেয়ে বেশি। অংশীদারিত্ব কাঠামোর ভিত্তিতে বাজেট তৈরির নজির নেই। গণতান্ত্রিক শাসনামলে এ ধারা নিশ্চিত করা যায়নি। তবে জনপ্রতিনিধি ও অন্য রাজনৈতিক নেতারা স্থানীয় উন্নয়নে বরাবরই সোচ্চার থাকেন। এটা কখনও গোষ্ঠী স্বার্থে আবার কখনও ভোট টানতে। তবে উন্নয়ন মডেল ও সে অনুযায়ী বিনিয়োগ নিয়ে অনেক সময় সব জিজ্ঞাসার উত্তর মেলে না। বাজেট কেন বাস্তবায়ন হয় না?
এ প্রশ্নের জবাব, গতানুগতিক। এটা এখন প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের মর্যাদা পাচ্ছে। বলা হচ্ছে, সক্ষমতার ঘাটতি। কেন একটি কারণ ঘুরপাক খাবে? উত্তরণের জন্য আইনি কাঠামো থাকলেও জবাবদিহিতা থাকবে না, তা ভাবাও কষ্টকর। বাংলাদেশের বাজেট যেন স্বপ্নের ফানুস ওড়ানো। অর্থমন্ত্রীর আক্ষেপ, স্বপ্নের সীমারেখা স্পর্শ করতে না পারার।

যে বেদনা তিনি লিখলেন, এ সরকারের শেষ বাজেট বক্তৃতায়, এ যেন মিলনাত্বক ও বিয়োগান্তক নাটকের মিলন ক্ষেত্র অথবা যেন বিতর্কের রেখে যাওয়া উপ্যাখ্যান। তবে অতৃপ্তি বোধের মাত্রা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে বাজেটে বক্তব্যের বিভিন্ন পরতে।

২০০৯ সালের সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইনে, আঞ্চলিক সমতা এবং নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। অর্থ বরাদ্দ ও ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্যাদি সব মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট নিয়মিত প্রকাশ করবে। আঞ্চলিক বৈষম্য নিরসনে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। আর তা হতে পারে বাজেটে বরাদ্দের মাধ্যমে।

সংবিধান ও আইন এ সমতার জন্য বিশেষ তাগিদ দিচ্ছে। কিন্তু তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব যাদের কাছে, তারা অনেকাংশেই উদাসীন। সরকারি পরিসংখ্যানেই প্রকট চিত্র উঠে আসছে। ২০০০ থেকে ২০০৫ সাল দেশের দারিদ্র্য হ্রাসের হার ছিল ১ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ২০১০ থেকে ২০১৬ সালে নেমে হয়েছে ১ দশমিক ২ শতাংশ। দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রেও আছে দারুণ বৈষম্য।

দেশের ৩৬ জেলার দারিদ্র্যের হার দেশের গড় হারের চেয়ে বেশি। নারায়ণগঞ্জে দারিদ্র্যের হার ২ শতাংশ, মুন্সীগঞ্জে ৩ শতাংশ, অথচ কুড়িগ্রামে ৭২ শতাংশ মানুষ দরিদ্র। দেশের ভেতরেও অঞ্চলভেদে এতোটাই বৈষম্য আছে। অথচ এসব এলাকায় নানা প্রকল্প নেয়ার কথা প্রচার করা হয়; কিন্তু সেগুলোর সুফল মিলছে না। টেকসই প্রকল্প গ্রহণে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি না, বরাদ্দ করা অর্থ লুটপাট হয়ে যাচ্ছে। বাজেট ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত আইনে সর্বোত্তম সেবার নিশ্চয়তার প্রতিশ্র“তি দেয়া হয়েছে। এ আইনে সরকারি কর্মচারীরা অর্পিত দায়িত্ব পালন না করলে অসদাচরণের অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন। এ অভিযোগের শাস্তি কতটুকু হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।

বাজেট প্রণয়নের সময়, শেকসপিয়রের এ বক্তব্য হয়ত মনে রাখা কঠিন। বিশেষ করে বিকাশমান অর্থনীতির এদেশে। তিনি বলেছিলেন, ও must be cruel only to be kind. তবে বাজেটে দেখা গেল, অর্থমন্ত্রী বেশ সদয় হয়েছেন, সমাজের উঁচু স্তরের প্রতিনিধিদের জন্য। তৃণমূল ও নিুমধ্যবিত্তের প্রতি তিনি নাখোশ। গুরুত্বের দিকে কিছুটা পিছিয়ে রেখেছেন। বৈষম্য দূরের বিষয়টি এ সরকারের শেষ বাজেটেও স্থান পেল না।

ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ছাড়া অর্থনীতিতে টেকসই গতি প্রবাহ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। মূলধন সংকটে ধুঁকছে সরকারি ব্যাংক। বেইল আউটের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ সরকার, এখন শুধু সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানেই মূলধন জোগান দিয়ে আসছে না, অন্যদিকে বেসরকারি ব্যাংককে টেনে তুলতে আবার বাধ্য করছে সরকারি প্রতিষ্ঠানকে।

বেইল আউট কর্মসূচি সাময়িক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হলেও, বাংলাদেশে অনেকটা স্থায়ী রূপ পেয়েছে। ব্যাংকিং খাতের অবস্থা যাই হোক, সরকারি প্রাক্কলন বলছে, অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবাহ কিছুটা লাগাম টেনে ধরা হতে পারে। আগামী অর্থবছরে মোট অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবাহ হবে ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ; যা বিদায়ী অর্থবছরে ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ।

আর বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ হবে সাড়ে ১৫ শতাংশ; যা বিদায়ী অর্থবছরে আছে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। সরকার এসব বিষয়ে মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করেছে। এখন দেখা যাচ্ছে, টাকার মান কমে যাচ্ছে। ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে এ ধারা শুরু হয়েছে; যা এখনও চলমান। আর গেল বছরের মে মাস থেকে ইউরোর বিপরীতে টাকা ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে।

সরকারি নথিপত্রে বলা হচ্ছে, চলতি অর্থবছরের ৮ মাসে সরকারি ব্যয়, বিশেষ করে উন্নয়ন ব্যয়ের গতি কিছুটা ধীর। উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে হলে সরকারি ব্যয় বাড়াতে হবে। সরকারের এ উপলব্ধির প্রভাব খুব একটা নেই। বিনিয়োগের গতি ফিরিয়ে আনবে, এমন কোনো প্রণোদনা নেই।

কিন্তু বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, নির্বাচনী বছরে বিনিয়োগ গতি তলানিতে চলে যায়। চারটি নির্বাচনী বছরের বিনিয়োগ পরিসংখ্যান অন্তত তাই বলছে। ১৯৯৬ সালে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই অর্থবছরের বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল প্রায় সাড়ে ১৮ শতাংশ। তবে এর আগের অর্থবছরে এটা ছিল প্রায় ২২ শতাংশ।

তবে ২০০১ সালের নির্বাচনী বছরে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির চিত্রও অনেকটা এমন। বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিতে ছিল ধীরগতি। ওই অর্থবছরে ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও, এর আগের অর্থবছরে ছিল এর সামান্য বেশি। রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতের পর ২০০৯ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই অর্থবছরে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ।

আর এর আগের অর্থবছরে ছিল সাড়ে ৭ শতাংশের ওপরে। আর সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালে। ওই অর্থবছরে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি হয় ৬ দশমিক ৭ ভাগ। আর এর আগের অর্থবছরে ছিল সাড়ে ৭ শতাংশ। নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়ে থাকে। আগামী বাজেটে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের কোনো স্পষ্ট রূপরেখা নেই।

সরকারি বিনিয়োগ নিয়ে অর্থমন্ত্রী পরিকল্পনার কথা জানালেও বেসরকারি খাতে কী পরিমাণ বিনিয়োগ আসবে বা এর মাধ্যমে দেশে কত মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে- তা নিয়ে নির্দেশনা অনুপস্থিত। এজন্য আগামী বাজেট কতটা বিনিয়োগসহায়ক হবে তা নিয়ে চিন্তিত উদ্যোক্তারা। প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। এ হারে প্রবৃদ্ধির জন্য জিডিপির ৩৫ শতাংশ বিনিয়োগ দরকার।

যা বর্তমান বিনিয়োগের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি। ব্যবসার খরচ কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেটার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও ৫ বছর। বিনিয়োগ বাড়াতে প্রয়োজন প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা, যা সুশাসন ছাড়া বাস্তবায়ন অসম্ভব। তবে নির্বাচনী বছর হওয়ায় বিনিয়োগ পরিবেশ সংস্কারে তেমন হাত দেয়া হয়নি। দেশের মোট বিনিয়োগের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে। কিন্তু এ অর্থবছরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। আগামী অর্থবছরেও এ বিনিয়োগ বাড়বে এমন নিশ্চয়তা নেই।

বড় ঘাটতির এ বাজেট নিয়ে অবশ্য তেমন দুঃশ্চিন্তার কারণ নেই। অংকের হিসাব যাই হোক, আয় ও ব্যয়ে প্রতিবছরই লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো যায় না। বাজেট প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, সামগ্রিক ঘাটতি দাঁড়াবে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। জিডিপির শতকরা হারে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। আইএমএফ বরাবরই বলে আসছে, এ ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যেই রাখতে হবে। তাই একে বর্ডার লাইনে এনে রেখে দেয়া হয়। বৈদেশিক ঋণ, অনুদান, ব্যাংকিং খাত ও সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে সরকার মূলত এ ঘাটতি মিটিয়ে থাকে। বাজেট বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ, কর সংগ্রহের কাঠামোগত দুর্বলতা, প্রকল্প বাস্তবায়নের অদক্ষতা আর ভঙ্গুর ব্যাংকিং ব্যবস্থা।

লেখক: সাংবাদিক ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
sirajgonjbd@gmail.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here