সেন্টমার্টিন: যেন এক অদেখা স্বর্গ!

0
191

মুনতাসীর হাসান: আমরা ১১ জন গিয়েছিলাম গত ৫ তারিখ। অনেকেরই ধারনা এই দ্বীপ ঘুরে আসার জন্য ভালো একটা বাজেট থাকা জরুরী, ইচ্ছা থাকলেও টাইট বাজেটে এই ট্যুর প্লান অনেকেরই হয়তো করা হচ্ছেনা।

চট্টগ্রাম থেকে সেন্ট মার্টিন যেতে হলে প্রথমে টেকনাফ যেতে হবে এরপর জাহাজে করে দ্বীপে। সিনেমা প্ল্যালেস থেকে আমরা সৌদিয়া নন এসি বাসে টেকনাফ গিয়েছিলাম ৪০০ টাকা টিকেটে। বাস রাত ১২:৫০ এ ছেড়ে গিয়ে সকাল ৬:৩০ এর দিকে আমাদেরকে টেকনাফ ঘাটে নামিয়ে দেয়। এইদিকে একটা ব্যাপার খেয়াল রাখবেন যেন বাস আপনাদেরকে টেকনাফের লাস্ট স্টপেজে নিয়ে না যায়! কারন সেখান থেকে সেন্ট মার্টিন যাওয়ার জাহাজ ঘাটে আসার জন্য আবার উলটো পথের সিএঞ্জি নেয়া লাগবে!! বাসের হেল্পারকে অবশ্যই ভালোভাবে বলে দিবেন যেন জাহাজ ঘাটে নামিয়ে দেয়। টেকনাফের মানুষগুলো তেমন সুবিধার মনে হয়নি আমাদের!! এইদিক দিয়ে সেন্ট মার্টিনের মানুষজনের আচারব্যবহার অনেক ভালো…

তাই টেকনাফে একটু সাবধান থাকবেন, লোকাল মানুষের সাথে কোনো ঝামেলা হলে পুলিশের সাহায্য চাইলে ভালো রেস্পন্স পাবেন। ঘাটে নেমে প্রথমেই জাহাজের টিকেট কেটে ফেলা ভালো, অনেকগুলো জাহাজ একসাথে ছেড়ে যায় সকাল ৯-৯:৩০ এর মধ্যে।

মেইন ডেকের(সিট দেয়া হবেনা) টিকেট জাহাজ ভেদে ৩৫০-৫৫০ টাকা (যাওয়া আসার একসাথে) পর্যন্ত পাবেন। সৌভাগ্য বশত যাওয়া এবং আসা দুইবারেই আমরা বসার সুযোগ পেয়েছিলাম যাত্রি কম থাকার কারনে, কিন্তু বাইরে এত সুন্দর দৃশ্য, গাংচিল রেখে ভিতরে বসে থেকে কোনো মজা নেই, আমরা ১০মিনিট ও বসে থাকতে পারিনাই!তাই ভাববেন না যে দাঁড়িয়ে যেতে অনেক কষ্ট হবে…সত্যি কথা বলতে গেলে ভিতরে বসে বসে যেতে অনেক কষ্ট হবে আপনার।

টিকেট কাটার সময় অবশ্যই দরদাম করে নিবেন। আমরা ১১ জন Bay Cruiser এর টিকেট নিয়েছিলাম ৪০০ টাকা করে। এইটার একটা বিশেষত্ব হচ্ছে এই জাহাজটা ছেড়ে যাবে সবার শেষে(৯:৩০ এ) কিন্তু সেন্ট মার্টিনে নামিয়া দিয়ে সবার আগে(১১:৩০ এ)। ফেরার দিন জাহাজ ছাড়বে দুপুর ৩-৩:৩০ এ।

জাহাজের টিকেট কেটে সকালের নাস্তা সেরে ফেলুন ঘাটের আসেপাশের হোটেলগুলোতেই…পরটা-৭, ডিম-২০, ডালভাজি-২০, চা-১০। জাহাজে উঠার আগে পটেটো চিপ্স কিনে নিতে পারেন গাংচিলদের খাওয়ানোর জন্য চিপ্স দিলে ওরা একদম হাতের কাছে চলে আসে।

জাহাজ নাফ নদী থেকে সাগরে নামলেই পানির পরিষ্কার নীল রঙ আপনাকে বিমোহিত করতে বাধ্য! জাহাজ দ্বীপের কাছাকাছি আসার পর যে ভিউটা পাবেন সেটা ক্যাপচার করতে ভুলবেন না!

দ্বীপে নেমে হেঁটে অথবা ভ্যানে চড়ে চলে যেতে পারেন ওয়েস্ট বিচে, ঐদিকের হোটেলগুলোর দাম তুলনামুলকভাবে কম এবং একই সাথে পাবেন বিচ ভিউ হোটেল!! ভ্যানে জন প্রতি ২০টাকা নিলেও পর্যটক বেশি থাকলে দাম আরো বেশি চাইতে পারে।

আমার মতে মানুষ অনেক বেশি না থাকলে আগে থেকে হোটেল বুকিং না দেয়াই ভালো!! ফোনে বুকিং দিলে দাম অনেক বেশি রাখে ওরা। সেন্টমার্টিনে পর্যটকের তুলনায় হোটেলের সংখ্যা অনেক বেশি, তাই নিজে ঘুরে দেখে রুম ঠিক করাই ভালো!

আমরা চেক ইন করেছিলাম “হোটেল সী প্রবাল” এ, বিচ থেকে এর দূরত্ব ছিলো ম্যাক্সিমাম ৩০ কদম, রুমের দরজা খুলে বাইরে তাকালেই সাগরের নীল পানির দেখা মিলে যায়।

১১ জনের জন্য ডাবল বেডের দুই রুম দুই রাতের জন্য ৩৬০০ টাকায় ঠিক করেছিলাম। প্রতি রুম ৯০০ টাকা করে। তবে বাজারের ভিতরের দিকের হোটেলগুলো, বিচ থেকে একটু দূরে যেগুলো আছে সেগুলো আরো কমে পেয়ে যাবেন। খাওয়াদাওয়ার জন্য বাজারের দিকে গেলে কম দামে ভালো খাবার পাবেন।
আমরা ৩ দিনের মধ্যে বেশিরভাগই ‘পোউষি’তে খেয়েছি যেটা Hotel Sea Inn এর ঠিক অপজিটে। ওদের ব্যাবহার এবং খাবারের মান খুবই ভালো লেগেছে,
দরদাম করে খাবেন যেখানেই খান!

সামুদ্রিক মাছগুলো ঐখানে প্যাকেজ হিসাবে বিক্রি করে, প্যাকেজে যে মাছটা নিবেন সেটা প্লাস ভাত-ডাল (যত ইচ্ছা), সবজি, আলুর ভর্তা ইনক্লুডেড থাকবে!
ফ্লাইং ফিশ সেখানে মজাদার সামুদ্রিক মাছগুলোর মধ্যে অন্যতম।

আমরা অন্যান্য বেলায় টুনা, স্যালমন, কোরাল এসব মাছ খেয়েছি…সবগুলোই পাবেন ১০০-১৫০ টাকার মধ্যে প্যাকেজ। আরো কমে মাছ ছাড়া অন্য কিছু খেতে চাইলে বাজারের ভেতর ছোটোখাটো অনেক হোটেল রয়েছে সেখানে খেতে পারেন।

সেন্টমার্টিন গেলে ছেঁড়া দ্বীপ যেতে ভুল করবেন না। ছেড়া দ্বীপে হেটে যাওয়া যায়, গাম বোট রিজার্ভ করে যাওয়া যায়, ট্রলারেও যাওয়া যায়…
হেটে যেতে চাইলে লোকাল মানুষদের কাছ থেকে জোয়ার-ভাটার সময় জেনে নিয়ে রওনা দিবেন…।

আমাদের হেটে যেতে ১ ঘন্টা ৪৫ মিনিটের মত লেগেছিলো। ছেঁড়া দ্বীপে গিয়ে ডাব আর তরমুজ খেতে পারেন, ডাব পাবেন ৫০-৭০ টাকার মধ্যে আর তরমুজ পাবেন ৮০-১৫০ টাকার মধ্যে। দুপুরে ওখানেই লাঞ্চ সেরে ফেলতে পারেন তবে সেখানে খাবারের দোকান ৩/৪ টা হওয়ায় খাবেরের দাম অনেক বেশি পড়বে!
আসার সময় হেটে আসতে না চাইলে স্পিড বোটে চলে আসতে পারেন। আমরা ১১ জন স্পিড বোট নিয়েছিলাম ১৪০০ টাকায়। স্পিড বোটে ছেঁড়া দ্বীপ থেকে ফেরার জার্নিটা অসাধারণ সময় লাগবে ২০ মিনিটের মত।

ছেঁড়া দ্বীপ থেকে হোটেলে ফিরে রেস্ট নিয়ে বিকালে সাইকেল ভাড়া নিয়ে দ্বীপটা ঘুরে দেখতে পারেন। ৩০ টাকায় সাইকেল পাবেন ১ ঘন্টার জন্য। খেয়াল রাখবেন সাইকেলের কোনো কিছু ডেমেজ থাকলে সেটা আগে থেকে ওদেরকে জানিয়ে নিবেন, নয়তো ওরা এসব নিয়ে ক্যাচাল করতে পারে…আমাদের সামনেই এক পর্যটকের সাথে সাইকেলের কিক স্ট্যান্ড নষ্ট হওয়া নিয়ে প্রায় মারামারি পর্যায়ের ঝগড়া হয়ে গিয়েছিলো!!

বিচের কোনো লোক দিয়ে কোনো কিছু আনাতে হলে তাদেরকে ভাংতি টাকা দিন, বাড়তি টাকা দেবেন না! দিলে সেগুলো ওরা নিজ দায়িত্বে টিপ্স হিসেবে রেখে দিবে।

আমাদের ১১ জনের গ্রুপে জনপ্রতি ২৬০০-৩০০০ খরচ হয়েছে পার্সোনাল খরচ বাদ দিয়ে, কেউ চাইলে অবশ্যই আরো কিছু কমে ৩ দিনের ট্যুর দিতে পারবে সেন্টমার্টিনে।

আমার মতে সেন্ট মার্টিন মিনিমাম ২ রাত ৩ দিনের প্ল্যান নিয়ে যাওয়া ভালো, তাহলে রিলাক্সভাবে ঘুরে দেখে এনজয় করা যায়। সাগরের নীল জলরাশি আপনাকে এক মিনিটের জন্যও বোর হতে দেবেনা।

ছবির মত সুন্দর এই দ্বীপটিকে সবাই পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করবেন, চিপ্সের প্যাকেট সাগরে ফেলবেন না, বিচে ময়লা ফেলার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা না থাকলেও নিজেদের ময়লা বিচ থেকে দূরে কোথাও ফেলার জন্য অনুরোধ করছি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here