বাজেটে অসমতা দূরে কর্মকৌশল চাই

0
170

সাজ্জাদ আলম খান: আমলাতন্ত্রের বেড়াজালে আবদ্ধ বাংলাদেশের বাজেট প্রস্তুত প্রক্রিয়া। জনযুদ্ধে জয়ী এই জাতি, প্রকৃত অংশীদারিত্বমূলক বাজেট তৈরি করতে পারেনি। দেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদও পুরনো ধাঁচেই বাজেট তৈরি ও উপস্থাপন করেছিলেন।

সেখানে অর্থনীতি পুনর্গঠনের কথা থাকলেও, গুরুত্ব অনুধাবনের জন্য জনপ্রতিনিধিদের তেমন অংশগ্রহণ ছিল না। সে ধারা আজও অব্যাহত আছে। সে জন্য জনগণের মতামতের প্রতিফলন বাজেটে খুব একটা ঘটে না। উত্তরে মরুকরণ বা দক্ষিণের লবণাক্ততা বা পিছিয়ে থাকা কুড়িগ্রামের দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টি জনমতের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয় না।

তিন সপ্তাহের কম আলোচনায় বাজেট অনুমোদন হয়ে যায় জাতীয় সংসদে। প্রায় ৪০ ঘণ্টার আলোচনায় এক বছরের আর্থিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। যথারীতি জাতীয় সংসদের বিরোধী দল বাজেটের মৃদুমন্দ সমালোচনা করবে আর রাজপথের অন্য দলগুলো তা প্রত্যাখ্যান করবে। তবে অভিনন্দন জানাবে সরকার। এটাই আমাদের রীতি।

আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে তা প্রণীত হয়; যা জনগণের চাহিদা নির্ধারণে অনেক সময় ব্যর্থ হয়। আর বৈষম্য তাড়ানোর মতো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সে তো ভাবনার জগতে প্রভাব ফেলে না। বঞ্চনা ও উন্নয়নের টানাপড়েনে নির্বাচনী বাজেটে অর্থনৈতিক অসমতা দূরের কর্মকৌশল বছরের পর বছর উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।

আয়বৈষম্য সামষ্টিক চাহিদায় ব্যাপক সংকট সৃষ্টি করে। এর প্রভাবে পশ্চিমা দেশগুলোতে সংরক্ষণবাদ ও জাতীয়তাবাদের উত্থান হচ্ছে। এর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে সচেতন হওয়া এখন জরুরি। সংকুচিত আয়ের প্রতিকার হিসেবে সামাজিক সহায়তা কর্মসূচিতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারে সরকার। আইএমএফের তথ্যমতে, গেল দেড় দশকে আয়বৈষম্যের কারণে বৈশ্বিক ভোগব্যয় সাড়ে ৩ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।

আয় ও সম্পদ-বৈষম্যের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে রাজনীতি ও সমাজনীতিতে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসুর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় চলমান সহিংস সংঘাত এবং হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ড শুধু নয়, আরও কিছু ইউরোপীয় দেশে ফ্যাসিবাদী বিভিন্ন উপাদান উত্থানের পেছনে অর্থনৈতিক অনিরাপত্তাই অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো পুরনো গণতান্ত্রিক দেশগুলোয়ও অর্থনৈতিক প্রান্তিকীকরণ জাত্যভিমানী ও শ্রেষ্ঠত্ববাদী পরিচয় এবং আফিম মাদকের মহামারীর মতো অন্য সামাজিক সমস্যা শক্তিশালী করে চলেছে। ২০১৩ সালে বিভিন্ন তথ্য বিশ্নেষণ করে বিশ্বব্যাংক দেখিয়েছে, বিশ্বের মোট ৭৬৬ মিলিয়ন জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ এখনও অতি দারিদ্র্যের প্রান্তসীমা দৈনিক ১ দশমিক ৯০ ডলারের নিচে আয় করছে।

মাথাপিছু আয় মানে দেশের মানুষের গড় আয়। এতে সাধারণের বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন হয় না। লাখো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার ৪৬ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এ সময় দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এর মধ্যে মাথাপিছু আয়ে এগিয়েছে অনেক দূর। স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে মানুষের মাথাপিছু গড় আয় ছিল মাত্র ১২৯ মার্কিন ডলার। চলতি অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৭৫২ ডলার।

তবে ১৯৭২ সালে কোটিপতির সংখ্যা ছিল ৫ আর ২০১৬ সালের নভেম্বরে ছিল এক লাখ ১৯ হাজার জন। প্রতি বছর দেশে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে কমপক্ষে ৫ হাজার। ২০১৬ সময়ে দেশে আয়বৈষম্য পরিমাপক জিনি অনুপাত বেড়ে হয়েছে ০.৪৮। ২০১০ সালে এটি ছিল ০.৪৬। জিনি অনুপাত যত কম, বৈষম্যও তত কম। এই অনুপাত ০.৫০ মানেই হলো এটা অতি উচ্চ বৈষম্যের দেশ। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন দেখিয়েছেন, ভারতের ভেতরেই রাজ্য থেকে রাজ্যে বেশ তফাত রয়েছে। আফ্রিকার বহু দেশে মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের চেয়ে বেশি; কিন্তু সেখানে মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্ন।

যে সমাজে বৈষম্য বেশি সেখানে গড় আয়ের হিসাব আরও বিভ্রান্তিকর। একটি পরিবার যদি এক লাখ টাকা আয় করে, পাশাপাশি অন্য একটি পরিবার যদি ১০ হাজার টাকা আয় করে, তাহলে উভয় পরিবারের গড় আয় হবে ৫৫ হাজার টাকা। এতে কি দুই পরিবারের প্রকৃত অবস্থা বোঝা যায়? গড় আয় দিয়ে পরিসংখ্যান ভারী হয়, প্রকৃত অর্থে বৈষম্য আড়াল করা যায়। দারিদ্র্য হ্রাসের উপাত্তেও তা প্রকট আকার ধারণ করেছে।

২০০০ থেকে ২০০৫ সালে দেশের দারিদ্র্য হ্রাসের হার ছিল ১ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ২০১০ থেকে ২০১৬ সালে নেমে হয়েছে ১ দশমিক ২ শতাংশ। এ ক্ষেত্রেও দেশের ভেতরেও আছে দারুণ বৈষম্য। দেশের বেশিরভাগ জেলায় দারিদ্র্যের হার দেশের গড় হারের চেয়ে বেশি। নারায়ণগঞ্জে দারিদ্র্যের হার ২ শতাংশ; অথচ কুড়িগ্রামে ৭২ শতাংশ মানুষ দরিদ্র। দেশের ভেতরেও অঞ্চলভেদে এতটাই বৈষম্য আছে। বিবিএস বলছে, ২০১৬ সালে দেশের মানুষের মোট আয়ের ০.২৩ শতাংশ আসে সবচেয়ে দরিদ্রদের পাঁচ ভাগ থেকে, যা ২০১০ সালে ছিল ০.৭৪ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৬ সালে মোট আয়ে সবচেয়ে ধনী পাঁচ শতাংশের অবদান ২৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ, যা ২০১০ সালে ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ ছিল।

নির্বাচন সামনে রেখে ভোটারদের খুশি করতে বেশ কিছু ‘রাজনৈতিক’ প্রকল্প নিতে যাচ্ছে সরকার। বরাদ্দ বাড়ানো হবে চলমান প্রকল্পে। উন্নয়ন বাজেট বাড়বে। করারোপের ক্ষেত্রে জনগণের ওপর চাপাচাপি থাকছে না, যা ইতিমধ্যে স্পষ্ট করেছেন এনবিআর চেয়ারম্যান। অপ্রয়োজনীয় কর থেকেও মিলবে অব্যাহতি। ভর্তুকি প্রসারিত হবে। জিডিপির ১ দশমিক ১ শতাংশ বরাদ্দ থাকছে ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে। আগামী বাজেটের সম্ভাব্য আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা।

ঘাটতি বাজেটের আকার হবে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। জিডিপির প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ এবং মূল্যস্টম্ফীতির হার সাড়ে ৫ শতাংশ। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সুবিধাভোগীদের ভাতা গভর্নমেন্ট টু পাবলিক পদ্ধতিতে সরাসরি প্রদান পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি পেনশন ডাটাবেজ প্রণয়ন, ই-চালান ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে সরকারের অর্থ অপচয় রোধ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা গতিশীল করা হবে। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সরকার দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখিয়ে ভোট টানার চেষ্টা করবে।

এ জন্য পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল লাইন, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, রামপাল থার্মাল পাওয়ার পল্গ্যান্ট, চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর এবং এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এদিকে প্রতি মাসে একনেক বৈঠকে হাজার হাজার কোটি টাকা প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। অনুমোদিত প্রকল্পগুলো এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। যার ফলে বরাদ্দ বাড়ছে। তবে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনী বছরে ব্যয়ের মাত্রা বাড়াতে চাইবে সরকার। এ জন্য ব্যয় বেশি করা হচ্ছে।

বৈষম্য আড়ালে চলছে অর্থনৈতিক উল্লম্ম্ফনের ঢাকঢোল পেটানোর উৎসব। সম্প্রতি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণকে ঘিরে দেশজুড়ে আয়োজন করা হয় নানা ধরনের আনন্দ আয়োজন। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের যোগ দিতে উৎসাহিত করা হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ বার্তা পৌঁছে দিতে রাজনৈতিক কর্মীরাও মাঠে নেমে পড়েন। নিকট অতীতে একনেক সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, মাথাপিছু আয় বেড়েছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছাড়িয়ে রেকর্ড তৈরি করবে। ৭.৬৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন, বাংলাদেশের জন্য রেকর্ড বটে।

কিন্তু সমাজের তলানিতে যে এর সুফল তেমন মিলছে না, তা দেখার যেন কেউ নেই। নীতিনির্ধারকরাও বিষয়টি জনসমক্ষে তুলে ধরেন না। বৈষম্য দূরীকরণে আমাদের পূর্বসূরিরা রক্তভেজা সংবিধান দিয়েছে। তারা বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য। সংবিধানেও স্থান পেল বৈষম্য দূরের ঘোষণা। সাড়ে চার দশকে বৈষম্য বাড়ার গতি আমাদের চ্যালেঞ্জ করেই এগিয়ে চলছে। এখন উন্নয়ন কার্যক্রমের মূল দলিলে, এই অগ্রগতি রোধে পদক্ষেপ নিতে হবে। আসন্ন বাজেটে এসবের প্রতিফলন ঘটবে- এমন কোনো কার্যক্রম সুস্পষ্ট নয়।

sirajgonjbd@gmail.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here