পুলিশের কর্মকাণ্ড ছিল হঠকারী: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়

0
32

দেশইনফো ডেস্ক: কক্সবাজারে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যার ঘটনাটি তাৎক্ষণিক নাকি পরিকল্পিত—এ প্রশ্নের মীমাংসা করতে পারেনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই গুলিবর্ষণ নিছক আত্মরক্ষার জন্য ছিল, না নেপথ্যে অন্য কোনো রহস্য আছে, বিষয়টি কমিটিকে ভাবিয়ে তুলেছে।

সিনহা হত্যাকাণ্ডকে পুলিশের হঠকারী (অবিমৃশ্যকারী), প্রস্তুতিহীন ও অপেশাদারি আচরণ বলে উল্লেখ করে তদন্ত কমিটি বলেছে, যথাযথ তদারকি ও জবাবদিহির অভাবে গুলিবর্ষণের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মনে অসংবেদনশীলতা তৈরি হয়েছে। আত্মরক্ষার আইনি সুবিধার অপপ্রয়োগ হচ্ছে। এসব বন্ধে কমিটি ১৩ দফা সুপারিশও করেছে।

তদন্ত কমিটির প্রধান চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান গত সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের কাছে এই প্রতিবেদন জমা দেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন কমিটির সদস্য লে. কর্নেল এস এম সাজ্জাদ হোসেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত চার সদস্যের তদন্ত কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শাহজাহান আলী ও পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক জাকির হোসেন খান।

তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সাংবাদিকদের বলেন, এটি একটি পুলিশি তদন্তের বিষয়। কমিটি তাদের দায়িত্ব পালন করেছে। এখন সচিব এটা বিশ্লেষণ করে দেখবেন। পরবর্তী সময়ে আদালত এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের কাছ পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, তদন্ত প্রতিবেদনে কিছু ঘটনাকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো হলো, পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকতকে মারিশবুনিয়া গ্রামের নুরুল আমিনের আটবার ফোন দেওয়া, কোনো রকম যাচাই না করে ডাকাত ধরার অবিশ্বাস্য প্রস্তুতিহীন অভিযান পরিচালনা, গুলি করার স্পষ্ট কোনো কারণ না থাকার পরও গুলি করা, ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে গুলিবিদ্ধ সিনহাকে ওসি প্রদীপের আঘাত করা, আহত সিনহাকে দ্রুত হাসপাতালে না নিয়ে ফেলে রাখা, ট্রাকে করে হাসপাতালে পাঠানো ও নিহত সিনহাকে আসামি করে ইয়াবা ও খুনের মামলা দেওয়া।

গত ৩১ জুলাই রাত সাড়ে নয়টায় কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর পুলিশের তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের তৎকালীন কর্মকর্তা পরিদর্শক লিয়াকত আলীর গুলিতে নিহত হন মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান। তাঁর সঙ্গে থাকা সাহেদুল ইসলামকে (শিফাত) পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এরপর সিনহা যেখানে ছিলেন, সেই নীলিমা রিসোর্টে ঢুকে তাঁর ভিডিও দলের দুই সদস্য শিপ্রা দেবনাথ ও তাহসিন রিফাত নুরকে পুলিশ আটক করে। পরে নুরকে ছেড়ে দিলেও শিপ্রা ও সিফাতকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। পরে তাঁরা জামিনে মুক্তি পান।

এ ঘটনার পর উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ও পুলিশের মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ কক্সবাজারে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন। তাঁরা এটাকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উল্লেখ করেন।

দুই বাহিনীর প্রধান যেদিন বিষয়টি ‘বিচ্ছিন্ন’ বলে কক্সবাজারে সংবাদ সম্মেলন করেন, সেদিনই ঢাকায় রাওয়া ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সংগঠন। সংগঠনের সদস্যরা সিনহা হত্যার বিচারের দাবিতে রাস্তায় নামারও হুমকি দেন। এরপর বিসিএস পুলিশ কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন, থানার ওসিদের সংগঠন বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন এবং রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকেও বিবৃতি দেওয়া হয়।

সিনহা হত্যার ঘটনায় মোট চারটি মামলা হয়। ঘটনার পরপরই পুলিশ বাদী হয়ে বাকি তিনটি মামলা করে। পুলিশের মামলায় নিহত সিনহাকেও আসামি করা হয়। এর কয়েক দিন পর হত্যা মামলা করেন নিহত সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। চারটি মামলাই তদন্তের দায়িত্ব পায় র‌্যাব। পরে র‌্যাব এ ঘটনায় টেকনাফ থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ ও বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ ১০ পুলিশ সদস্য এবং নিহত হওয়ার আগে সিনহা যে পাহাড়ে গিয়েছিলেন, সেই গ্রামের তিন বাসিন্দাকে গ্রেপ্তার করে। এঁদের মধ্যে প্রদীপ ছাড়া পাঁচ পুলিশ সদস্য ও স্থানীয় তিন ব্যক্তি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। চার আসামি এখনো রিমান্ডে আছেন। ওসি প্রদীপসহ নয়জন আসামি কারাগারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here