চীন-রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন ব্রিকস জোট যদি বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য নতুন মুদ্রা চালু বা প্রচলিত মুদ্রার বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তাহলে জোটের সদস্য দেশগুলোর ওপর শতভাগ শুল্ক আরোপ করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এদিকে ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিকল্প গঠনের আহ্বান জানিয়েছে রাশিয়া। পশ্চিমা বিশ্বের রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলায় এই পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব করেছে মস্কো।
গেলো ৩০ নভেম্বর ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে পোস্ট করা এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, মার্কিন ডলার থেকে ব্রিকস দেশগুলোর দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা আর সহ্য করা হবে না। আমরা চাই, তারা অঙ্গীকার করবে যে, নতুন ব্রিকস মুদ্রা তৈরি করবে না এবং ডলারের বিকল্প কোনো মুদ্রাকে সমর্থন দেবে না। অন্যথায়, তারা শতভাগ শুল্কের সম্মুখীন হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার হারাবে।
২০১১ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে গঠিত হয় ব্রিকস জোট। চলতি বছর ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইথিওপিয়া এবং মিশর এর নতুন সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী নালেদি প্যান্ডর জানিয়েছিলেন, ৩৪টি দেশ এই জোটে যোগদানের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আগ্রহীদের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশও।
ব্রিকসের মূল সদস্য ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত এবং চীনের সঙ্গে সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতও যুক্ত হয়েছে। রাশিয়ার অর্থমন্ত্রী আন্তোন সিলুয়ানভ জোটের প্রথম বৈঠকে বলেন, বিশ্বব্যাপী আর্থিক ব্যবস্থা পশ্চিমা দেশগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। অথচ বৈশ্বিক অর্থনীতির ৩৭ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে ব্রিকস জোট। সুতরাং আমাদের একটি বিকল্প ব্যবস্থা গঠন করা প্রয়োজন। তিনি দাবি করেন, আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক নিজেদের মূল কাজগুলো করছে না। সংস্থাগুলো ব্রিকস দেশগুলোর স্বার্থে কাজ করছে না বলেও অভিযোগ করেন রুশ মন্ত্রী।
এর আগে ব্রিকস ব্রিজ পেমেন্ট সিস্টেমের প্রস্তাব দিয়েছিলেন রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এলভিরা নাবিউলিনা। যা সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আর্থিক লেনদেনের একটি বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে। ২০১৫ সালে ব্রিকস দেশগুলো একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে, যার উদ্দেশ্য হলো ব্রিকস সদস্য এবং অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির জন্য অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করা। তবে রাশিয়ার নতুন আহ্বান ইঙ্গিত দেয় যে, এই দেশগুলো একটি আরও কার্যকর আর্থিক কাঠামো তৈরির দিকে অগ্রসর হতে চায়, যা তাদের পশ্চিমা প্রভাব থেকে মুক্তি দেবে।
ব্রিকস নিজস্ব মুদ্রা ও ডলারের বাইরের ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলে রাশিয়া, চীন এবং ইরানের মতো দেশগুলো পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সক্ষম হবে। তবে জোটের ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে খুব শিগগির একটি নতুন মুদ্রা প্রচলনের সম্ভাবনা আপাতত কম। চীন ও রাশিয়ার জন্য ব্রিকস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারা এই জোটকে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখছে। বর্তমানে ব্রিকসের চেয়ারম্যানশিপের দায়িত্ব পালন করছে রাশিয়া। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক হুমকি এমন সময়ে এলো, যখন তিনি প্রথম দিন থেকেই মেক্সিকো, কানাডা এবং চীন থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর বড় শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন।
ব্রিকসের নতুন সদস্য দেশ হিসেবে মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, আর্জেন্টিনা, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এই তালিকায় নেই বাংলাদেশ। আগামী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন সদস্যপদ কার্যকর হবে। ফলে ব্রাজিল, রাশিয়া, চীন, ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকার এই বিশ্ব অর্থনীতির জোটে মোট সদস্য দেশ হবে ১১টি। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এই অর্থনৈতিক জোটের সদস্য হতে ইরান, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, আর্জেন্টিনা, আলজেরিয়া, বোলিভিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মিশর, ইথিওপিয়া, কিউবা, কঙ্গো, কমোরোস, গেবোন এবং কাজাখস্তানসহ ৪০টির বেশি দেশ আগ্রহ দেখিয়েছে।





