বাংলাদেশ এলডিসি গ্রুপে থাকার মতো দেশ না: ড. দেবপ্রিয়

0
63

শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা, আইএমএফের উপাত্ত, প্রকাশিত সংবাদ এবং এসবের ভিত্তিতে নিজস্ব অনুমানের ভিত্তিতে অর্থ পাচারের পরিমাণ প্রাক্কলন করেছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলন এসব কথা বলেন শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি।

সংবাদ সম্মেলনে কমিটির প্রধান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আমি জাতিসংঘের বিভিন্ন দেশ নিয়ে কাজ করি। আমি বলতে চাই, এটা (বাংলাদেশে) এলডিসি গ্রুপে থাকার মতো দেশ না। আমাদের সক্ষমতা, যোগ্যতা, স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা- এসব দিয়ে এলডিসি গ্রুপে থাকার মতো কারণ নেই।বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে ফাঁদে পড়েছে। দেশে দারিদ্র্য নিরসনে যে অর্জন তা টোকা দিলেই ভেঙে পড়বে। বাংলাদেশের অবস্থা এলডিসি (লিস্ট ডেভেলপড কান্ট্রি বা স্বল্পোন্নত দেশ) গ্রুপে থাকার মতো না। বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে গেছে। এর থেকে উত্তরণে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও যথাযথ সংস্কার প্রয়োজন।

বর্তমান সরকারকে আগামী দুই বছরের কর্মপরিকল্পনা তৈরির পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কার্যক্রম করা যাবে না। বিগত সরকারের আমলে চামচা পুঁজিবাদ থেকে চোরতন্ত্রে পরিণত হয়েছিল পুরো কাঠামো।

শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, রাষ্ট্রক্ষমতায় যখন আপনি কাউকে দায়িত্ব দেন, সেটা আইনসভা বলেন বা নির্বাহী বিভাগ বলেন অথবা বিচার বিভাগ— তারা সকলে যখন গোষ্ঠীবদ্ধভাবে একটি চুরির অংশ হয়ে যায় তখন সেটাই চোরতন্ত্র। আর দেশে চোরতন্ত্র সৃষ্টির উৎস গত ৩টি নির্বাচন। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, চোরতন্ত্রের ভেতরে আপনি দেখবেন একটি রাজনৈতিকগোষ্ঠী, একটি আমলাগোষ্ঠী এবং আমলা যখন বলি আমরা তখন— উর্দি পরা এবং উর্দি ছাড়া দুটোর কথাই বলছি। রাজনীতিবিদ, আমলা এবং ব্যবসায়ী এই তিন সহযোগে চোরতন্ত্র হয়। তিনি আরও বলেন, আপনারা যদি বলেন, এই চোরতন্ত্রের উৎস কোথায়? তাহলে উৎসে ফিরে যেতে হবে ২০১৮-এর নির্বাচন। তারপর ২০২৪-এর নির্বাচন। গত তিনটি নির্বাচন বিষবৃক্ষ সৃষ্টি করেছে এই চোরতন্ত্রে। এবং এর ভেতর দিয়ে আমার দেশে যে মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো ছিল, যে জবাবদিহির জায়গা ছিল, সেই জায়গাগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ড. দেবপ্রিয় বলেন, শ্বেতপত্রের প্রতিবেদনের ভেতর যে কথাগুলো-পরামর্শগুলো আছে, সেগুলো কী আগামী দিনে এতিমের মতো ঘুরে বেড়াবে? নাকি কেউ দায়িত্ব নিয়ে অভিভাবকত্ব নিয়ে বাস্তবায়নের পথে এগোবো। আমরা মনে করি, ন্যূনতম একটা দুই বছরের পরিকল্পনা সামনে থাকা উচিত। আর এই সময়ের মধ্যে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে।

শ্বেতপত্র কমিটির অন্য সদস্যরা বলেন, পূর্বে দুর্নীতির একটা বড় অংশ দেশেই বিনিয়োগ হয়েছে। কিন্তু বিগত ১৫ বছরে ১০০ টাকা দুর্নীতি হলে ৬০ টাকাই দেশ থেকে পাচার হয়েছে। এসব পাচার হুন্ডি করে নয়, বরং প্রকল্পের মাধ্যমে পাচার হয়েছে। সরকারি ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশই তছরুপ হয়েছে। তারা বলেন, জ্বালানি ক্ষেত্রে নিজেদের প্রচেষ্টা বাদ দয়ে এলএনজি আমদানি করা হয়েছে। প্রযুক্তি খাতেও উল্লেখযোগ্য দুর্নীতি হয়েছে। মূলত বিভিন্ন পলিসি তৈরি করে দুর্নীতি করা হয়েছে।

কমিটির সদস্যরা বলেন, মেগা প্রকল্পে যে লুটপাট হয়েছে তা কয়েক প্রজন্ম ধরে শোধ করতে হবে। তাই বৈদেশিক ঋণের সুদের হার, গ্রেস পিরিয়ড এগুলো নিয়ে বৈদেশিক উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে অন্তর্র্বতী সরকারকে আলোচনা করতে হবে। ঋণ পুনর্বিবেচনার কোনো বিকল্প নেই। এ ব্যাপারে সরকারকে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। পাশাপাশি দেশের রাজস্ব বাড়াতে আয়কর আদায়ে জোর দিতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমদানি ও রপ্তানি পণ্যের প্রকৃত মূল্য না দেখিয়ে এবং হুন্ডির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে কেনা সম্পদের মূল্য পরিশোধের মাধ্যমে মূলত অর্থ পাচার হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, হংকং, সিঙ্গাপুর, ভারত এবং ‘করের স্বর্গ’ বলে পরিচিত বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচার হয়েছে।

প্রতিবেদনে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। ইইউ ট্যাক্স অবজারভেটরি রিপোর্টের (২০২৪) তথ্য অনুযায়ী, দুবাইতে ৪৫৯ বাংলাদেশির ৯৭২টি আবাসিক স্থাপনা রয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। একই সংস্থার ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী ‘করের স্বর্গ’ বলে পরিচিত বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। ‘এন্ড স্নো ওয়াশিং’ নামে একটি সংস্থার প্রতিবেদনে কানাডায় বাংলাদেশিদের ৫ লাখ ৬৪ কোটি থেকে ১২ লাখ কোটি টাকার মতো সম্পদের প্রাক্কলন করা হয়েছে। গত মার্চ পর্যন্ত মালয়েশিয়ার ‘সেকেন্ড হোম’ প্রকল্পে বাংলাদেশিদের ৩ হাজার ৬০০র বেশি স্থাপনা রয়েছে।

এর আগে রোববার (১ ডিসেম্বর) প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি তাদের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here