ইউক্রেন ক্রমশ যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যর্থতার মুখোমুখি হচ্ছে। তিন বছরের দীর্ঘ যুদ্ধে ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছেন দেশটির বহু সেনা। প্রশ্ন উঠছে, ইউক্রেন কি আরেক বছর যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে? ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি রণক্ষেত্রের সেনাদের সঙ্গে কথা বলে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির বাহিনী এখনও পূর্বাঞ্চলে রাশিয়ার অগ্রগতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। তবে তারা প্রায়ই কুরাখোভে শহরের চারপাশে ঘিরে পড়ার শঙ্কায় রয়েছে, যেখানে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সবচেয়ে তীব্র লড়াই চলছে। ‘ব্ল্যাক প্যাক’ নামে একটি মর্টার ইউনিট কুরাখোভের চারপাশে ঘেরাও প্রতিরোধের চেষ্টা করছে। রাশিয়ার সেনাবাহিনী তিন দিক থেকে চাপ দিচ্ছে।
একটি নিরাপদ ঘাঁটিতে ইউনিট সদস্যদের সঙ্গে দেখা হয় বিবিসির রিপোর্টারের। এখানে তারা যুদ্ধের ক্লান্তি কাটানোর চেষ্টা করছেন। এই সেনারা প্রথাগত নয়—তারা একজন ভেগান শেফ, একজন মেকানিক, একজন ওয়েব ডেভেলপার ও একজন শিল্পী। একদল বন্ধুরা, যারা নিজেদের অরাজনৈতিক বলে মনে করেন। তারা সবাই স্বেচ্ছাসেবী।
তাদের ৩১ বছর বয়সী কমান্ডার সুরত বলেন, তিনি রাশিয়ার সর্বাত্মক আক্রমণের পরপরই সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। শুরুতে তিনি মনে করেছিলেন যুদ্ধ তিন বছর স্থায়ী হবে। এখন তিনি আরও দশ বছরের যুদ্ধের জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সুরত বিশ্বাস করেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধের ইতি টানতে চাইবেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্টও আলোচনার জন্য প্রস্তুতি দেখিয়েছেন। তবে একটি কার্যকর সমাধান এখনও দুরাশা।
তিনি বলেন, আমরা বাস্তববাদী। আমরা বুঝি ইউক্রেনে ন্যায়বিচার পাবে না। অনেকে হয়তো মেনে নিতে বাধ্য হবেন যে তাদের বাড়ি ধ্বংস হয়েছে, তাদের প্রিয়জন নিহত হয়েছেন। এটি অনেক কঠিন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় তিনি আলোচনা চান, না যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চান। সুরত দৃঢ়ভাবে বলেন, যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাই।
ইউনিটের বেশিরভাগ সদস্যের মতও এমনই। ভেগান শেফ সের্হি মনে করেন, আলোচনা যুদ্ধকে সাময়িকভাবে বন্ধ করতে পারে। কিন্তু এটি এক বা দুই বছরের মধ্যে আবার ফিরে আসবে। শিল্পী দাভিদ বিশ্বাস করেন, ট্রাম্পকে নিয়ে পূর্বানুমান কঠিন। তিনি ইউক্রেনের জন্য খুব ভালো অথবা খুব খারাপ হতে পারেন। ইউনিটটি এক সপ্তাহ রণক্ষেত্রের সম্মুখভাগে কাটিয়েছে। বিশ্রামের সময়ও তারা প্রশিক্ষণ চালিয়ে যায়। তারা বলছে, এটি তাদের মনোবল ধরে রাখতে সাহায্য করে।
নতুন যোগ দেওয়া সদস্য ডেনিস নিরাপদ জীবন ছেড়ে জার্মানি থেকে এসেছেন। তার কথায়, আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছিলাম, ইউক্রেন ছাড়া পৃথিবীতে বাঁচতে পারব কি? ডেনিস মনে করেন, ইউক্রেনের হতাহতের সংখ্যা সরকার স্বীকার করা সংখ্যার চেয়ে বেশি। তিনি বলেন, আমাদের অনেক সেনা হয় হারিয়ে গেছে, না হয় খুবই ক্লান্ত। আমরা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারব না।
ইউক্রেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর ডনিপ্রোতেও যুদ্ধের ক্লান্তি স্পষ্ট। রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার শহরটির বাসিন্দারা সাইরেনের ফাঁকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে থিয়েটারে যান। একটি হাস্যরসাত্মক নাটকের প্রদর্শনীর আগে, নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এখানে উপস্থিত হওয়া লুদমিলা বলেন, আমরা সাহায্য পাচ্ছি, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। আলোচনা করতেই হবে।
একটি শরণার্থী শিবিরে ৮৭ বছর বয়সী ভ্যালেনটিনা বলেন, অতিথি হিসেবে থাকা ভালো, কিন্তু নিজের বাড়ি আরও ভালো। শরণার্থীদের অনেকেই মনে করেন, শান্তির জন্য আলোচনার বিকল্প নেই। তবে, মারিয়া বলেন, কেউ সামরিকভাবে জিততে পারবে না। তাই আলোচনার দরকার।
তবে আলোচনায় ইউক্রেনকে হয়তো কিছু ভূমি ছাড়তে হবে। অনেকের মতে, সেটাই হবে শান্তির জন্য তাদের সবচেয়ে বড় ত্যাগ।




