অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর জনপ্রশাসনে ব্যাপক রদবদল শুরু হয়। বিগত সরকারের আমলের সুবিধাভোগীদের বাদ দিয়ে যারা বঞ্চিত তাদের পদায়ন করা হচ্ছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের শীর্ষ পদে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর জনপ্রশাসনে ব্যাপক রদবদল শুরু হয়। বিগত সরকারের আমলের সুবিধাভোগীদের বাদ দিয়ে যারা বঞ্চিত তাদের পদায়ন করা হচ্ছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের শীর্ষ পদে। তবে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার আসার পর প্রশাসন ক্যাডারের ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তারাই সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছেন। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর শীর্ষ পদে তাদেরই পদায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ। সর্বশেষ গতকাল সচিব পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি পান ১১৯ জন। এর মধ্যে ৩৫ জনই প্রশাসন ক্যাডারে ৮২ নিয়মিত ব্যাচের সদস্য।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ছয় মাস পার হলেও এখনো সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত আন্দোলনে আহতরা। নানা দাবি নিয়ে প্রায়ই রাস্তায় নামছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। বেড়েই চলেছে জীবনযাত্রার ব্যয়। নানা উদ্যোগ নিয়েও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না মূল্যস্ফীতি। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি পণ্যে ভ্যাট বৃদ্ধির ফলে চাপে পড়েছে ভোক্তা। বাড়ানো যায়নি কর্মসংস্থান। এ পরিস্থিতিতেও একটি পক্ষ ক্রমাগত সুবিধা নিয়ে যাচ্ছে।
আওয়ামী লীগ আমলে বঞ্চিত হয়েছিলেন—এমন দাবি করে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে পদোন্নতির আবেদন করেন প্রায় দেড় হাজার কর্মকর্তা (অবসরপ্রাপ্ত)। তাদের মধ্যে গতকাল ৭৬৪ জনকে উপসচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব, গ্রেড-১ ও সচিব পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা পৃথক পাঁচটি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সচিব পদে ১১৯, গ্রেড-১ পদে ৪১, অতিরিক্ত সচিব পদে ৫২৮, যুগ্ম সচিব পদে ৭২ ও উপসচিব পদে চারজন ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি পেয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদিক হাসান বলেন, ‘প্রশাসন ক্যাডারের ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তারা এরশাদ আমলে নিয়োগ পান। পরবর্তী সময়ে তারা বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় টার্মেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। এ কারণে তাদের যোগাযোগটা ভালো। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তারা সচিব পদে পদোন্নতি পাওয়া শুরু করেন। আর যারা বিগত রেজিমের সময় পদোন্নতিবঞ্চিত ছিলেন এখন তারা পাচ্ছেন। বলা যায় যে গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী প্রশাসন ক্যাডারের ৮২ ব্যাচ। সর্বশেষ পদোন্নতিতেও তাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে।’
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বিসিএস ৮২ ব্যাচের নিয়োগ শুরু হয় ১৯৮৩ সালের শেষের দিকে। দুই ধাপে পুরো নিয়োগ শেষ হয় ১৯৮৪ সালে। এ ব্যাচে মোট কর্মকর্তা ছিলেন ১৯১ জন। তাদের মধ্যে সচিব পদে নিয়োগ পাওয়া শুরু করেন ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর। ধীরে ধীরে প্রশাসনে আধিপত্য বিস্তার শুরু করেন এ ব্যাচের কর্মকর্তারা। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা চার মেয়াদেই তারা নিজেদের এ প্রভাব ধরে রাখেন।
গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরও নিজের অবস্থান ধরে রাখেন প্রশাসন ক্যাডারের নিয়মিত ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তারা। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। সর্বশেষ গতকাল পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যেও এ ব্যাচের আধিপত্য বজায় রয়েছে। এর মধ্যে সচিব পদে ১১৯ কর্মকর্তার মধ্যে প্রশাসন নিয়মিত ৮২ ব্যাচের সদস্য রয়েছেন ৩৫ জন। আর বিশেষ ব্যাচের ১০ জন পদোন্নতি পেয়েছেন। এছাড়া অতিরিক্ত সচিব পদে ৫২৮ পদোন্নতিপ্রাপ্তের মধ্যে ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা রয়েছেন ১৪ জন। আর বিশেষ ব্যাচের ৬৪ জন পদোন্নতি পেয়েছেন। যদিও শেখ হাসিনার পতনের পর এ ব্যাচের কর্মকর্তাদের প্রভাব কিছুটা কমে এসেছিল। তাদের অনেকেই চলে যান আত্মগোপনে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার গত ১২ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর দায়িত্ব পান। যদিও ১৬ আগস্ট তিনি ব্যক্তিগত সহকারীর পরিবর্তে শপথ নেন উপদেষ্টা হিসেবে। তিনিই মূলত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জনপ্রশাসন ঢেলে সাজানোর কাজে সহযোগিতা করছেন। নিজের একজন সাবেক ব্যক্তিগত সহকারীকে তিনি এ কাজে লাগান। প্রশাসনে ৮২ ব্যাচের পুনরুত্থান ঘটেছে এর পর থেকেই।
আওয়ামী লীগ আমলে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের বেশ কয়েকজন প্রশাসন ক্যাডারের নিয়মিত ৮২ ব্যাচের আধিপত্যের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পদবঞ্চিত এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বিসিএস ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দিয়ে যে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে তা বঞ্চনার এক নতুন দলিল। আওয়ামী আমলে সকল প্রকার সুবিধাভোগী অতিরিক্ত সচিবদের যেমন সচিব করা হয়েছে, তেমনি আবার ওই আমলে বঞ্চিতদের করা হয়েছে অতিরিক্ত সচিব গ্রেড-১। ২০২৪ সালে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাকে বঞ্চিত করে তার জুনিয়র এবং আগে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাকে সচিব করা হয়েছে।’
এবারের পদোন্নতি বিবেচনায় কোনো বিধি মানা হয়নি বলে দাবি করে ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘গ্রেড-১ পাওয়া একজন কর্মকর্তা উপসচিব হিসেবে সবচেয়ে দীর্ঘকাল চাকরি করেছেন অথচ তার চেয়ে জুনিয়র এবং আগে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের সচিব পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। এটা প্রশাসনিক ইতিহাসের আগের সব অনিয়মকে ছাড়িয়ে গেছে। তালিকা দেখে মনেই হয় যে পছন্দমতো পদ বণ্টন করা হয়েছে। কোনো নীতিমালা মানা হয়েছে বলে মনে করার কারণ নেই।’
প্রশাসন ৮২ নিয়মিত ব্যাচের সদস্য ড. শেখ আব্দুর রশীদ মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান গত ১৬ অক্টোবর। সচিব পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতিপ্রাপ্তদের তালিকায়ও তিনি স্থান পেয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব হিসেবে কর্মরত রয়েছেন সিরাজ উদ্দিন মিয়া। তিনিও প্রশাসন ৮২ নিয়মিত ব্যাচের কর্মকর্তা। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর প্রশাসনিকভাবে চাপে পড়েন। ২০০৯ সালে যুগ্ম সচিব অবস্থায় ওএসডি হন এ কর্মকর্তা। পরে ২০১৬ সালে অবসরে যান। তিন নম্বর গ্রেডে থেকে অবসরে যাওয়া সিরাজ উদ্দিন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বর্তমান সিনিয়র সচিব ড. মো. মোখলেস উর রহমান বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনিও একই ব্যাচের সদস্য। কর্মজীবনে তিনি সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার মো. জমিরউদ্দিন সরকারের একান্ত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ছিলেন রাষ্ট্রপতির একান্ত সচিবও। ২০০৯ সালে অতিরিক্ত সচিব থাকা অবস্থায় তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। এর চার বছর পর ২০১৩ সালে নাসিমুল গনিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় আওয়ামী লীগ সরকার।
প্রশাসন ক্যাডারের দশম ব্যাচের সদস্য মাহবুব কবির মিলন নিয়মিত ৮২ ব্যাচের সমালোচনা করে বলেন, ‘বঞ্চিতদের তালিকায় ভূতাপেক্ষ সচিব পদে পদোন্নতিপ্রাপ্তদের মধ্যে ৫১ জন ছিলেন অতিরিক্ত সচিব। কেবিনেট সচিব, জনপ্রশাসন সচিবসহ বর্তমান সরকারে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত প্রায় সবাই ১৯৮২ ব্যাচের। এ ১১৯ জন সচিব পদোন্নতির মধ্যে একটা বড় অংশই ৮২ ব্যাচের (বিশেষ ব্যাচসহ)। পদোন্নতিপ্রাপ্ত সব অতিরিক্ত সচিব যদি আমার চেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়ে থাকেন, তাহলে আমার কোনো চাওয়া বা দাবি নেই। কিন্তু আমার চেয়ে কম হলে অবশ্যই আমি প্রতিবাদ ও দাবি করব।’
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক ১৯৮৩ সালে নোয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। বিএনপির শাসনামলে তিনি জননিরাপত্তা বিভাগের উপসচিব, ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এক-এগারোর সময়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এহছানুল হক।
প্রশাসন ক্যাডারের নিয়মিত ৮২ ব্যাচের আধিপত্যের বিষয়ে জানতে জনপ্রশাসন সচিব মোখলেস উর রহমানকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি সাড়া দেননি। এ বিষেয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ ধরনের পদোন্নতিতে একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। এজন্য কমিটি গঠন করা হয় এবং সে কমিটি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। এখানেও কমিটির মাধ্যমে এ পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলে জানি।’




