মা ও শিশু স্বাস্থ্যে পিছিয়ে বাংলাদেশ

0
64

বাংলাদেশের লাখ লাখ শিশু, কিশোরী ও মা অপুষ্টির শিকার। অপর্যাপ্ত সেবা ও বারবার সংক্রমণের প্রভাব এবং সেইসাথে শাকসবজি, ফলমূল এবং প্রোটিন যেমন ডিম, মাছ, মাংস এবং ডাল থেকে পর্যাপ্ত পুষ্টি না পাওয়ার কারণে অপুষ্টি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এটি বৃদ্ধি এবং বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। অপুষ্টির কারনে অনেকে বেশিমাত্রায় পাতলা হয়ে যেতে পারে আবার অতিরিক্ত খাবার খেলে ওজন এবং স্থূলতা বাড়ে। শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের জীবনকে এটি ক্রমবর্ধমান হারে ব্যাহত করছে।

বাংলাদেশে, ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ২৮ শতাংশ খর্বকায় এবং ১০ শতাংশ কৃশকায়তায় ভোগে। যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভোগে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং তাদের অন্যান্য রোগের সংক্রমণের ঝুঁকিও বেশি। তারা প্রায়শই একাগ্রতার সমস্যায় ভোগে এবং কোনো কিছুতে বেশি মনোযোগ দিতে পারে না। একারনে তাদের শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কিছু শিশুর অন্যদের তুলনায় অপুষ্টির ঝুঁকি বেশি থাকে। শহরের বস্তিতে, চা বাগানে বা রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে, দরিদ্র পরিবারে এবং অশিক্ষিত মায়েদের ঘরে যেসব শিশু জন্মগ্রহণ করে, তাদের খর্বকায় এবং কৃশকায় হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।

বাংলাদেশে ১৮ বছর বয়সের আগেই ৫১ শতাংশ নারী ও মেয়ের বিয়ে হয় । বাল্যবিবাহের উচ্চমাত্রার ফলে পরিণত বয়সের আগে গর্ভধারণের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। অকালে গর্ভাধারণের ফলে প্রায়ই কম ওজনের শিশুর জন্মদানের আশঙ্কা থাকে। এই হার বাংলাদেশে এখনও ১৫ শতাংশের বেশি।

জন্মের প্রথম ঘন্টার মধ্যে নবজাতককে মায়ের দুধ খাওয়ানোর সুপারিশ করা হয়। তবে বাংলাদেশে জন্মের প্রথম ঘন্টার মধ্যে নবজাতকদের মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার মাত্র ৪৭ শতাংশ। ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে মাত্র ৬৩ শতাংশ শুধুমাত্র মায়ের দুধ পান করে। এছাড়া ছয় মাসের বেশি বয়সী শিশুদের মধ্যে মাত্র ২৮ শতাংশ পযা©প্ত সুষম খাদ্য পায়। পরিবারগুলো হয় অতি দারিদ্র অথবা অজ্ঞতার কারণে জানেনা কীভাবে তাদের সন্তানদের স্বাস্থ্যকর খাদ্য দিতে হয়। কম ওজন নিয়ে জন্মানো শিশু এবং নবজাতক ও ছোট শিশুদের সুষম খাদ্য অভ্যাসের অপর্যাপ্ততার সংমিশ্রণে শিশুদের খর্বকায় এবং কৃশকায় হয়ে বেড়ে ওঠার আশঙ্কা বেড়ে যায়।

অনুপুষ্টির ঘাটতি এখনও ছোট শিশু এবং গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসাবে বিবেচিত হয়। মা এবং তাদের শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির জন্য মায়ের রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারপরও বাংলাদেশে গর্ভবতী কিশোরীদের মধ্যে দুই শতাংশেরও কম স্বাস্থ্যকর গর্ভধারণ নিশ্চিত করতে আয়রন এবং ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট গ্রহণ করে।

সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নবজাতক, শিশু, নারী এবং কিশোর-কিশোরীদের জলবায়ু-জনিত দুর্যোগ ও জরুরী পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় ও মানসম্পন্ন পুষ্টি পরিষেবা পাবার সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইউনিসেফ কমিউনিটি প্রচারকে শক্তিশালী করতে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করছে। জনসচেতনতা বাড়াতে এবং অপুষ্টি প্রতিরোধে কাজ করে এমন সব পরিষেবার প্রাপ্যতা বাড়াতে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের সাহায্যে কমিউনিটির সাথে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির মাধ্যমে এটি করা হচ্ছে।

খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহের মধ্যে অন্যতম। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হচ্ছে সব নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা; আবার সংবিধানের ১৮ (১) অনুচ্ছেদে জনগণের ‘পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জন স্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রাথমিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়েছে’। তবে পুষ্টি নিরাপত্তা যেহেতু খাদ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত সেহেতু বাংলাদেশে খাদ্যের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রথমেই সংক্ষেপে আলোকপাত করছি।

২০০৮ সালে বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণকালে চালের ঘাটতি ছিল ২৬ লাখ টন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফল নেতৃত্বে আজকে বাংলাদেশে চাল উৎপাদন অনেক গুণ বেড়েছে। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে এখন মোট চাল উৎপাদনের পরিমাণ ৩৮ দশমিক ৬ মিলিয়ন টন। আমাদের Human Consumption হলো প্রায় ২৫ মিলিয়ন টন। Non-human Consumption হলো ১০ দশমিক ০৬ মিলিয়ন টন। তাই দেশের সাধারণ চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত খাদ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন টন। ভুট্টা উৎপাদনে বাৎসরিক চাহিদা প্রায় ৬৪ লাখ টন; উৎপাদন হয় ৫৪ লাখ টন। অন্যদিকে, গমের বাৎসরিক চাহিদা ৬৬ লাখ টন; উৎপাদনের পরিমাণ মাত্র ১২ লাখ টন। এক্ষেত্রে বলা প্রয়োজন গমের উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ খুব কম। প্রথমত, গম উৎপাদনের জন্য আমাদের দেশের আবহাওয়া ততটা অনুকূল নয়। দ্বিতীয়ত, গমের উপযোগী চাষের জমির পরিমাণ তুলনামূলক কম। তাই বিকল্প জমি বৃদ্ধির মাধ্যমে গমের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান খাদ্য উৎপাদন ও পুষ্টিকে সর্বদাই গুরুত্ব দিয়েছেন। পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের বিষয়টিকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি তিনি ১৯৭৫ সালের ২৩ এপ্রিল বাংলাদেশ পুষ্টি পরিষদ গঠনের আদেশে স্বাক্ষর করেন।

সার্বিকভাবে দেখা যায়, বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে উদ্বৃত্ত হলেও পুষ্টি নিরাপত্তার দিক থেকে পিছিয়ে আছে। অথচ, বাস্তবে আমরা দেখছি পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের জন্য খাদ্যের এ সব উপাদান বহনকারী মাছ, মাংস, ডিম, ফল, সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ অনেকদূর এগিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ অবস্থায় চলে এসেছে। অর্থাৎ সুষম খাদ্যের ছয়টি প্রধান উপাদান কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন, খনিজ লবণ এবং পানির কোনোটিরই তেমন অভাব দেখছি না। তাই স্বীকার করতেই হবে সুষম খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের জানার অভাব রয়েছে এবং খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে অনীহা আছে। আমরা যখন খাদ্য গ্রহণ করি তখন পুষ্টিকর কি না, তা চিন্তা না করে মুখোরোচক হলো কি না, তাতে বেশি গুরুত্ব দেই। এজন্য দেখা যাচ্ছে হাতের কাছে অনেক পুষ্টিকর খাবার থাকার পরেও আমাদের সচেতনতার অভাবে তা গ্রহণ করি না। এছাড়া আমাদের রন্ধনপ্রণালির মধ্যেও পুষ্টিমান বজায় রাখার ক্ষেত্রে ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়।

পুষ্টিহীনতার প্রবণতা ক্ষুধা পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত সূচকের হার ১৯৯৯-২০০১ সময়ে গড়ে ২০ দশমিক ৮ থেকে হ্রাস পেয়ে ২০১৭-১৯ সময়ে গড়ে ১৩ তে উপনীত হয়েছে। একইভাবে ২০০৪ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে খর্বতার (stunting) হার ৫১ শতাংশ থেকে কমে ২৮ শতাংশ এবং কৃশকায়তায় শতকরা ১৫ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ এবং কম ওজনের শিশুর হার ৪৩ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ২২ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে।
এছাড়াও বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নীতি ২০২০ প্রণয়ন করেছে।

সরকার এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি যৌথভাবে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু করে যা বর্তমানে দেশের ১০৪টি উপজেলায় সম্প্রসারিত হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় ৩২ দশমিক ৩৮ লাখ প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ বিস্কুট সরবরাহ করা হচ্ছে। জাতীয় স্কুল মিল্ক নীতিমালা ২০১৯ প্রণয়ন করা হয়েছে যার মাধ্যমে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয় গমন উপযোগী শিশুদের পুষ্টির মান উন্নয়নে অবদান রাখবে আশা করা যায়। নিঃসন্দেহে এগুলো সাম্প্রতিককালে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনে বাস্তব পদক্ষেপ এবং সফলতার পরিচয় বহন করে।

সাজেদা হক
সিনিয়র সাংবাদিক ও গবেষক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here