বিশ্ব বেঈমানদের করুণ পরিণতি

0
74

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব।বিশ্ব-ব্রম্মান্ডের সেরা জীব হলেও মানুষের মধ্যে অনেক ঘৃণিত অভ্যাস রয়েছে, যার অন্যতম হলো- বেঈমানী ও বিশ্বাসঘাতকতা । পৃথিবীর সর্বত্রই এমন কিছু ঘৃণ্য স্বভাব-চরিত্রের মানুষ খুঁজে পাওয়া যায়। যারা অতীতের সব ঋণ অস্বীকার করে উপকারীর বুকে ছুড়িকাঘাত করতেও দ্বিধা বোধ করে না। যেমন ধরেন মীর জাফর, গোলাম আজম ও তার দোসর ও অনুসারীরা, জুডাস, ব্রুটাস, মিঙ তান হুঙ, এফিয়েলটস, বেনিডিক্ট আর্নল্ড, আলফ্রেড রেড, ওয়াঙ জিং ওয়াইকে, জন ড্যান ড্যাস, ভিডকুন কুইসলিং, জুলিয়াস রসেনবার্গ এবং ইথেল রসেনবার্গ এবং রবার্ট হ্যানসেন। আসুন জেনে নেয়া যাক বিস্তারিত।

মীর জাফর
পলাশীর যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য “মীর জাফর” নামটির সাথে পরিচিত সবাই। তার পরিণতি ছিল মর্মান্তিক। প্রথমে তাকে বাংলার নবাব করা হলেও, কিছুদিনের মধ্যেই, মীর জাফর ইংরেজদের শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হলে, তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে তার জামাতা মীর কাসিমকে নবাব করা হয়। ১৭৬৩ সালে, মীর কাসিমের সাথে ইংরেজদের বিবাদের পর মীর জাফরকে আবার নবাব করা হয়। ইংরেজদের দেওয়া বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা ও ছাড়ের কারণে, মীর জাফরের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা ভেঙে পড়ে। মীর জাফর কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং আফিম সেবনে আসক্ত ছিলেন। ১৭৬৫ সালে, মীর জাফর মারা যান।

গোলাম আজম ও তার দোসর ও অনুসারীরা
স্বাধীন বাংলাদেশের ঘৃণিত নাম গোলাম আজম। তার দোসর ও অনুসারীরাও এদেশের মানুষের কাছে সমান ঘৃণিত। ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধে এরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরও তিনি বাংলাদেশ বিরোধী কর্মকান্ড চালিয়েছেন বিদেশের মাটিতে। গোলাম আজমকে বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি হিসাবে গণ্য করা হয়।১৯৭১ সালে স্বাধীনতা বিরোধী কর্মকান্ডের পাশাপাশি গোলাম আজম তার দোসর-অনুসারীরা মানবতা বিরোধী কর্মকান্ডেও লিপ্ত ছিল। এইসব যুদ্ধাপরাধীর কথা নতুন করে কিছু বলার নাই। গোলাম আজম ও তার দোসর নিজামী, মুজাহিদ, সাঈদী, কাদের মোল্লাদের ই যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বর্তমানে বিচার হয়েছে এবং তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

জুডাস
খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের কাছে ঘৃণিত নাম জুডাস। তাদের মতে, পৃথিবীর সব চেয়ে জঘন্য বিশ্বাসঘাতক হলো এই জুডাস্। যীশুর সহচর ছিল সে। মাত্র ৩০ রৌপ্য মুদ্রার বিনিময়ে জুডাস যীশুকে রোমান সৈন্যদের হাতে ধরিয়ে দিতে সহায়তা করে । রোমান সৈন্যদের সাথে চুক্তি অনুযায়ী, জুডাস লাস্ট সাপারের পরে যীশুর গালে চুমো খাবে । জুডাসের চুমো দিয়েই যীশুকে সনাক্ত করা হবে। ঐ চুমোটা ছিলো একটা ইশারা মাত্র এবং লাস্ট সাপারের পরে যখন জুডাস , যীশুর গালে চুমো খায় তখনই রোমান সৈনিকরা যীশুকে চিনতে পারে এবং যীশুকে আটক করে ।

ব্রুটাস
প্রাচীন রোমে একসময় আংশিক গণতন্ত্র প্রচলিত ছিলো , সেখানে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল না । যাবতীয় প্রশাসনিক ক্ষমতা , আর্থিক ব্যবস্থা পৃথকভাবে চলতো । কিন্তু সেইসময় জুলিয়াস সিজার একজন একনায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চান , অর্থাৎ যাবতীয় ক্ষমতা তার হাতের মুঠোয় নিয়ে আসাই ছিলো তার ইচ্ছা , এই ঘটনায় সিনেটররা ক্ষুব্ধ হন এবং তারা যে কোনো মূল্যে এই ব্যবস্থা ঠেকানোর জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন । তখন সিনেটররা সিজারকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে এবং এই পরিকল্পনার মূল হোতা ছিলো ব্রুটাস । সিজার আর ব্রুটাসের সম্পর্কে বন্ধুর মত ছিলো ,এমনকি ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার পরিকল্পনায় ব্রুটাস সিজারকে সমর্থনও দিয়েছিলো। শেষ পর্যন্ত সেই ব্রুটাসের নেতৃত্বে অন্যান্য সিনেটরেরা , রাজদরবারে সিজারকে একের পর এক ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে । হত্যাকাণ্ডের সময় ব্রুটাস নিজে মুখ ঢেকে আসে , সিজার যখন একের পর এক ছুরিকাঘাতে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পরতে থাকেন , তখন ব্রুটাসের মুখের পর্দা সরে যায় ,এবং সিজার তাকে দেখতে পায় এবং বলে “Et tu, Brute?” অর্থাৎ ব্রুটাস তুমিও!

মিঙ তান হুঙ
চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে মঙ্গোলরা পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী সেনাবাহিনীতে পরিনত হয় , যার ফলসরূপ তারা এই পৃথিবীর বুকে বৃহত্তম সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে সমর্থ হন । কিন্তু হয়তো মঙ্গোলরা এত সহজে এত বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে পারতো না , যদি না মিঙ তান হুঙ-এর মত বিশ্বাসঘাতকরা না থাকতো । ১২১১ সালে চেঙ্গিস খান চীন আক্রমন করেন , যখন চীনে জিন রাজবংশের শাসন চলছিলো । এই জিন সেনা প্রধানের বার্তাবাহক ছিলো মিঙ তান হুঙ , যে কিনা মঙ্গোলদের কাছে চাইনিজ সৈন্যদের অবস্থান সহ অন্যান্য তথ্যাদি পাচার করে দেন । যার ফল হয়েছিলো ভয়ানক চাইনিজরা মঙ্গোলদের বিরুদ্ধে নূন্যতম প্রতিরোধও গড়ে তুলতে পারে নাই। তবে তার পরিণতি কি হয়েছিলো সে বিষয়ে নিশ্চিত কিছু জানা যায়নি ।

এফিয়েলটস
‘এফিয়েলটস’ সিনেমাটা অনেকেরই দেখা । এটি সত্য ঘটনার উপর তৈরী । গ্রীক ঐতিহাসিক হিরোডাটাস এর নথিতে এই ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়, যেটাকে তিনি “Battle of Thermopylae’” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। খৃস্টপূর্ব ৪৮০ সালে ৩০০ বা তার থেকে বেশী কিছু সৈন্য নিয়ে পার্সীয়ান রাজা জেরেক্সের বিশাল সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে । স্পার্টান রাজা লিওনাইডাসের যুদ্ধকৌশলের জন্য যুদ্ধটা স্পার্টানদের অনুকূলে ছিলো । কিন্তু এফিয়েলটস নামক এক স্পার্টান, পার্সীয়ান রাজার সাথে হাত মিলিয়ে তাদের স্পার্টান যোদ্ধাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয় । এফিয়েলটস পার্সীয়ান সৈন্যদের একটি গোপন পথ দেখিয়ে দেয় , যেটা দিয়ে সহজেই স্পার্টানদের পিছন দিক দিয়ে আক্রমন করা যায় । পরবর্তীতে উভয়মুখী আক্রমনের জন্য স্পার্টান রাজা লিওনাইডাস সহ অন্যান্য যোদ্ধারাও মৃত্যুর মুখে পতিত হন। যুগে যুগে এফিয়েলটস তাই ইতিহাসে বেঈমান হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

বেনিডিক্ট আর্নল্ড
আমেরিকান রেভুলশনারী ওয়্যার ,যেটা পৃথিবীর অন্যতম সফল বিপ্লব হিসেবে পরিচিত ,যার ফলাফল আজকের সুপার পাওয়ার আমেরিকা । ১৭৭৫-৭৬ সালে আমেরিকান সিভিল ওয়্যারের অন্যতম সফল জেনারেল ছিলেন বেনিডিক্ট আর্নল্ড , অনেক বীরত্বপূর্ন কাজের জন্য তার অনেক সুনাম ছিলো , কিন্তু পরবর্তীতে সেও ব্রিটিশদের টাকার কাছে হার মানে এবং টাকার বিনিময়ে ব্রিটিশদের সাথে যোগ দেয় এবং পরবর্তীতে ইংল্যান্ডে চলে যায় , যদিও যুদ্ধের পরে ব্রিটিশরাও তাকে ছুড়ে ফেলে দেয় । এই বিশ্বাসঘাতক অনেক কস্টে জরাজীর্ণ অবস্থায় ১৮০১ সালে কানাডায় মৃত্যুবরণ করেন।

আলফ্রেড রেড
ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত বিশ্বাসঘাতক আলফ্রেড রেড ,যার বিশ্বাসঘাতকতার মূল্য দিতে হয়েছিলো অস্ট্রিয়ার ৫ লক্ষ্য মানুষের জীবন দিয়ে । আলফ্রেড ছিলেন অস্ট্রিয়ার কাউন্টার ইন্টিলেজেন্সীর প্রধান , কর্মক্ষেত্রে তার অনেক সুনাম ছিলো । কিন্তু কেউ জানতোনা সে গোপনে রাশিয়ার হয়েও কাজ করছিলো , সে মূলত ছিলো একজন ডবল এজেন্ট ,১৯০৩ থেকে ১৯১৩ পর্যন্ত সে একজন ডবল এজেন্টের কাজ করেছিলো ।১ম বিশ্বযুদ্ধের সময় সে অস্ট্রিয়ার ,সাইবেরিয়া আক্রমণের পরিকল্পনা রাশিয়ানদের হাতে তুলে দিয়েছিলো , যার ফলে অস্ট্রিয়ানদের সেখানে চরম মূল্য দিতে হয় একই সাথে রাশিয়ান সেনাবাহিনী সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়ে অস্ট্রিয়ান সেনাবাহিনীকে বিভ্রান্ত করে , এমনকি মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে রাশিয়ায় নিয়োজিত অস্ট্রিয়ান এজেন্টদের নাম সে রাশিয়ানদের কাছে বিক্রি করে দেয় । যখন তার এই বিশ্বাসঘাতকতার কথা প্রকাশ হয়ে যায় তখন সে নিজে আত্মহত্যা করে।

ওয়াঙ জিং ওয়াইকে
চাইনিজ ইতিহাসের সবথেকে বড় বিশ্বাসঘাতক হিসেবে ওয়াঙ জিং ওয়াইকেই ধরা হয়। তিনি ছিলেন চাইনিজ বামপন্থী দলের অন্যতম সদস্য এবং চীনের বিখ্যাত নেয়া সান ইয়াত সেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী । সান ইয়াত সেনের মৃত্যুর পর তিনি দলনেতা হবার চেস্টা করেন , কিন্তু ব্যার্থ হন তবুও তিনি দল ছেড়ে যাননি । কিন্তু ১৯৩৭ সালে জাপান যখন চীনে আগ্রাসন চালায় , তখন সে আগ্রাসনের পক্ষে অবস্থান নেয় , চীনে পুতুল সরকার বসানো সহ এবং অন্যান্য প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে। বিশ্বাসঘাতক হওয়া সত্ত্বেও তার ভাগ্য অনেক ভালো ছিলো , কারন তাকে কোন বিচারের সম্মুখীন হতে হয়নি , জাপানীরা পরাজয় বরন করার পূর্বেই তিনি মৃত্যুবরন করে।

জন ড্যান ড্যাস
১৯৪২ সালে আমেরিকার অর্থনীতিতে ধ্বস নামানোর জন্য , জার্মানরা এক নতুন কৌশল অবলম্বন করে । জার্মানদের উদ্দেশ্য ছিলো আমেরিকার বাজারে জাল টাকা ছড়িয়ে দেয়া , এই জন্য তারা আটজন ইংরেজি ভাষা জানা জার্মানকে আমেরিকায় পাঠায় । যাদের মধ্যে অন্যতম ছিল জন ড্যাস। প্রথম দিকে জার্মানদের এই মিশন খুব ভালো ভাবেই চলছিলো , পরবর্তীতে জন ড্যাস অর্থলোভী সরাসরি জার্মানদের এই পরিকল্পনা FBI এর কাছে ফাঁস করে দেয় পরবর্তীতে ঐ মিশনের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে মার্কিনীরা আটক করে । জার্মান জনগণের কাছে জন ড্যান ড্যাস আর বিশ্বাসঘাতক শব্দটি সমার্থক আজও।
ভিডকুন কুইসলিং
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক খলনায়ক ভিডকুন কুইসলিং। তিনিএকজন নরোয়েজিয়ান আর্মী অফিসার এবং রাজনীতিবিদ । জার্মানদের নরওয়ে দখলের জন্য যাবতীয় সামরিক তথ্য হিটলারের কাছে পাচার করেন , অনেক ইহুদীদের অবস্থান নাৎসিদের হাতে তুলে দেন । পুরস্কার হিসেবে হিটলার তাকে দখলকৃত নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী বানান । ১৯৪৫ সালে জার্মানদের আত্মসমর্পণের পরে নরওয়ের জনগণ তাকে বিচারের সম্মুখীন করে এবং তার ফাঁসি হয়।

জুলিয়াস রসেনবার্গ এবং ইথেল রসেনবার্গ
৫০-এর দশকে আমেরিকার দুই ঘৃণিতনাম জুলিয়াস রসেনবার্গ এবং ইথেল রসেনবার্গ । তারা ছিলেন স্বামী-স্ত্রী। দুজনই বৈজ্ঞানিক ছিলেন। আমেরিকান এই দম্পতি আনবিক ও পারমানবিক বোমা নিয়ে গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে দেশের স্বার্থ ত্যাগ করে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে আমেরিকান পারমানবিক প্রযুক্তি সম্পর্কে অনেক গোপন তথ্য রাশিয়ানদের কাছে পাচার করে । ১৯৫৩ সালে তাদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয়।

রবার্ট হ্যানসেন
রবার্ট হ্যানসেনের জন্ম আমেরিকায়। একজন পুলিশ অফিসার হিসেবে নিজের কর্ম জীবন শুরু করেন , ১৯৭৬ সালে FBI তে যোগ দেন । কম্পিউটার এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত কাজ যেমনঃ নেটওয়ার্ক ইনট্রুডার , ওয়ার ট্যাপিং ইত্যাদি কাজে অনেক দক্ষ ছিলেন । ১৯৮৩ সালে কাউন্টার ইন্টিলিজেন্সীর অংশ হিসেবে একটা দলের সাথে তাকে সোভিয়েত ইউনিয়নে (বর্তমান রাশিয়া) পাঠানো হয় । সেখানে সে টাকার বিনিময়ে মার্কিন ডবল এজেন্টদের নামসহ অন্যান্য কিছু গুরুত্বপূর্ন তথ্য কেজিবির এক এজেন্টের কাছে বিক্রি করতে থাকে।পরবর্তীতে সে ধরা পরে , এবং বর্তমানে সে আজীবন দণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামী হিসেবে জেলে আছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here