জনপ্রশাসন সংস্কারের ২০৮ সুপারিশের মধ্যে বাস্তবায়ন তিনটি

0
42

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর নানা খাতে সংস্কার কমিশন গঠন করে। সেই ধারাবাহিকতায় জনপ্রশাসন সংস্কারের জন্যও কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন সুপারিশমালা তৈরি করে এরই মধ্যে সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। তবে কয়েক মাস পার হলেও উল্লেখযোগ্য বড় সংস্কার বাস্তবায়িত হয়নি। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের ২০৮ সুপারিশের মধ্যে আশু বাস্তবায়নযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল ১৮টি। পরে তার মধ্য থেকে অপেক্ষাকৃত সহজে বাস্তবায়নযোগ্য আটটি প্রস্তাব বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র তিনটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

বাস্তবায়ন হওয়া প্রস্তাব তিনটি হলো– মহাসড়কের ফিলিং স্টেশনে স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, নাগরিকের পাসপোর্ট পাওয়ার মৌলিক অধিকার এবং সব সরকারি দপ্তরে নির্দিষ্ট বিরতিতে গণশুনানি নিশ্চিত করা।

জনমুখী, জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও নিরপেক্ষ জনপ্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে গত বছরের ৩ অক্টোবর জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। গত ৮ ফেব্রুয়ারি কমিশনপ্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দেন।

নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুদক, পুলিশ ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ ১৬৬টি সুপারিশের বিষয়ে মতামত চেয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে গত ৬ মার্চ ‘স্প্রেডশিট’ পাঠিয়েছিল ঐকমত্য কমিশন। এই ১৬৬টি সুপারিশের মধ্যে ২৬টি সুপারিশ ছিল জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের।

এরপর মধ্য জুনে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর জানায়, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ জন্য জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের ১৮টি সংস্কার প্রস্তাব আশু বাস্তবায়নযোগ্য হিসেবে বাছাই করা হয়েছে। ১৬ জুন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন প্রস্তাবিত আশু বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সভার প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের ১৮টি প্রস্তাব। এই ১৮ প্রস্তাবের মধ্যে আটটি অপেক্ষাকৃত সহজে বাস্তবায়নযোগ্য প্রস্তাব নিয়ে সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়। এগুলো হলো– মহাসড়কের পেট্রোল পাম্পগুলোয় স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট-সংক্রান্ত, মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটকে ডায়নামিক করা, কলেজ ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠন, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনা, গণশুনানি, তথ্য অধিকার আইন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পুনর্গঠন এবং ডিজিটাল রূপান্তর ও ই-সেবা।

বাস্তবায়ন না হওয়া সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে– স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন, এনবিআর পুনর্গঠন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ভূমি রেজিস্ট্রেশন অফিস সংস্কার, উপজেলা পরিষদ শক্তিশালী করা, পার্শ্বনিয়োগ, পদোন্নতি না পেলে বেতন সুবিধা ও স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন।

আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদের সমন্বয়ক মুহম্মদ মফিজুর রহমান সমকালকে বলেন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন না করা হলে পরবর্তী সরকারের আবারও প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে স্বৈরতন্ত্র কায়েম করার ঝুঁকি রয়েছে। কারণ, প্রশাসন ক্যাডারের ক্ষমতা কমবে– জুলাই সনদে এমন কোনো সুপারিশও নেই। লোকচক্ষুর আড়ালে রয়েছে সব সংস্কার।

জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সদস্য ফিরোজ আহমেদ বলেন, আমরা আমাদের কাজ করেছি। প্রতিবেদন জমার পরই এগুলো বাস্তবায়ন করা যেত। কিন্তু কেন বিলম্ব হচ্ছে, জানি না। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে দেরি হলে অন্যান্য বিষয় ঝুলে যাবে।

নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান ও ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দুর্ভাগ্যবশত জনপ্রশাসনের সমস্যা সমাধানে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি।

সচিবালয়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র নজরুল ইসলাম বলেন, সংস্কার কমিশনগুলো জনপ্রশাসন সংস্কারের কথা বললেও কর্মচারীদের বিষয়ে কোনো কাজ করেনি। শীর্ষ পদের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি, গাড়ি-বাড়িসহ নানা সুবিধা বাড়লেও নিচের পদের কর্মচারীদের কিছুই হয়নি। স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও কর্মচারীদের তেমন কোনো উন্নতি হয়নি।

সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার গতকাল শনিবার রাতে বলেন, প্রশাসনিক সংস্কারবিষয়ক প্রতিবেদন সুচিন্তিত ও বাস্তবভিত্তিক হয়েছে বলে কোনো পক্ষই মনে করে না। ফলে এ প্রতিবেদন কোনো পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। এ বিষয়টি রাজনৈতিক সরকারের জন্য রেখে দেওয়াই ভালো হবে।

তিনি বলেন, এটি নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা এবং বিচার বিভাগের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে। একটি দক্ষ ও গতিশীল জনপ্রশাসন রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করে এবং জনগণের কাছে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে প্রশাসনিক সংস্কার ও পুনর্গঠনের জন্য বেশ কয়েকটি কমিশন গঠন করা হয়। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রশাসনিক পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে ‘সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন রেস্টোরেশন কমিটি’ গঠন করেন। এরপর ১৯৭২ সালে ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রি-অর্গানাইজেশন কমিটি’ এবং ‘ন্যাশনাল পে-স্কেল কমিশন’ গঠন করা হয়।

এসব কমিশনের মাধ্যমে মন্ত্রণালয় পুনর্গঠন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিষ্ঠা এবং একটি নতুন বেতন কাঠামো তৈরি হয়। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ‘পে অ্যান্ড সার্ভিস কমিশন’ গঠন করা হয়। যার লক্ষ্য ছিল প্রশাসনের পুনর্গঠন ও বেতন কাঠামো উন্নয়ন। তাঁর পরবর্তী সময়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১০টি সংস্কার কমিশন গঠন করেন। এগুলোর মধ্যে ‘মার্শাল ল কমিটি’, প্রশাসনিক সংস্কার ও পুনর্গঠন কমিটি (সিএআরআর) এবং জাতীয় বেতন কমিশন ছিল।

এসব কমিশনের উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন বলতে থানাকে উপজেলায় উন্নীত করা এবং নতুন বেতন কাঠামো প্রবর্তন করা হয়। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার প্রশাসনিক পুনর্গঠনের জন্য একটি সংস্কার কমিটি গঠন করে। যদিও এই কমিটি কোনো সুপারিশ জমা দিতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তী সময় ১৯৯৬ ও ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকার প্রশাসন সংস্কার কমিশন (এসিআর) এবং জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন (পিএআরসি) গঠন করে। যার লক্ষ্য ছিল স্বচ্ছ, জবাবদিহি ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা। ২০০৫ সালে বিএনপি সরকার ‘ট্যাক্স ওমবাডসম্যান আইন’ পাস করে, যা আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সহায়ক ছিল।

সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭ সালে ‘রেগুলেটরি রিফর্ম কমিশন’ গঠন করে এবং নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করার মতো সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আবার ক্ষমতায় এসে প্রশাসনিক সংস্কারের জন্য কর্মদক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি (পিবিইএস) প্রবর্তনের চেষ্টা করে, যা জনগণের অংশগ্রহণ ও প্রশাসনিক কার্যকারিতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল।

তবে এসব কমিশনের বেশির ভাগ প্রস্তাবনাই সরকার বাস্তবায়ন করেনি। প্রশাসনিক সংস্কার কমিশনের ব্যর্থতার পেছনে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অভাব, উপনিবেশবাদী আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর প্রভাব, ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা ও ক্ষমতাসীন দলের অনুগত কর্মকর্তাদের স্বার্থ বড় বাধা বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (সিপি অধিশাখা) এম রায়হান আখতার বলেন, গত দুই মাস আমি প্রশিক্ষণে ছিলাম, তাই সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে কাজ করতে পারিনি। রোববার থেকে সংস্কারকাজ আবার শুরু করব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here