জামতাড়া: সাইবার প্রতারণা যে এলাকার নতুন ‘চাষাবাদ’

0
38

আগে থেকে ধারণা না থাকলে ভারতের ঝাড়খণ্ডের জামতাড়া শহরকে খুবই সাধারণ মনে হবে। আর দশটা শহর যেমন হয়। কিন্তু আসল খবর হলো; এই শহরের কিছু পরিবার অস্বাভাবিকভাবে ধনী হয়েছে একদল তরুণের কারণে। যারা কেবল মোবাইল ফোন দিয়ে প্রতারণার কৌশল রপ্ত করেছে।

প্রায় ১৫ বছর আগেও ঝাড়খণ্ডের জেলাটি ছিল নিভৃত গ্রামের মতো। স্বাভাবিকভাবেই এলাকাটি নিয়ে ভারতের অন্য অংশের মানুষের খুব বেশি ধারণাও ছিল না। এখন সেখানে জাঁকজমকপূর্ণ কিছু বাড়ি দেখা যায়। লাখ লাখ ভারতীয় হয়; জামতাড়ার গল্প শুনেছেন কিংবা নিজে ভুক্তভোগী হয়েছেন। মূল বিষয় হলো- নিভৃত এলাকাটির উন্নয়ন ব্যাপক আকারে কৃষি কাজের মাধ্যমে হয়নি। বরং কৃষি কাজ ফেলে অনেকেই প্রতারণার সঙ্গে জড়িয়েছেন।

যে একদল তরুণের কথা শুরুতে বলা হয়েছে, বেশ কয়েক বছর আগে তারা মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কৌশল আয়ত্ত করে ফেলেছিল। যে টাকা চুরি করত, সেটির পরিমাণ এত বেশি ছিল যে, মাঝে মধ্যে তাদের প্রতারণা ব্যাংক ডাকাতির মতোই মনে হতো।

ভারতের ডিজিটাল বাজারে যখনই নতুন কিছু এসেছে (স্মার্টফোন, ডিজিটাল ওয়ালেট, ই-কমার্স, ক্রিপ্টো) জামতাড়ার প্রতারকরা তাদের প্রতারণার ধাপ আরেক দফা বাড়িয়েছে। দিল্লির নীতি নির্ধারকেরা ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ নিয়ে গর্বে বুক থাপড়ালেও, সাধারণ মানুষের কাছে এই ডিজিটাল বিপ্লবের মানে হয়ে দাঁড়ায় ‘জামতাড়া স্ক্যাম’।

জামতাড়ার গল্প নিয়ে নেটফ্লিক্সও একটি সিরিজ বানিয়েছে। যেটির ট্যাগলাইন, ‘সবকা নম্বর আয়েগা’ বা ‘একসময় সবার কাছে ফোন যাবে’ অথবা ‘একসময় কারও না কারও সর্বনাশ হবেই’। জামতাড়ার স্ক্যামারদের কাছে ধনী বা সেলিব্রেটিকে ঠকানো ছিল বিশেষ গর্বের বিষয়। অর্থ লুট ছিল মূল উদ্দেশ্য, কিন্তু কোনো তারকা বা এমপিকে বোকা বানানো মানে ছিল নিজের মর্যাদা কয়েক ধাপ বাড়িয়ে নেওয়া।

২০১৫ সাল থেকে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশ জামতাড়ায় নিয়মিত অভিযান চালাতে শুরু করে। অনেকে গ্রেপ্তার হলেও জামিন পাওয়া ছিল সহজ। মামলা নিষ্পত্তি হতো ধীরগতিতে, আর দণ্ডের হার এত কম ছিল যে প্রতারণার স্রোত থামেনি।

ভারতের এই ‘কুখ্যাত’ শহরে গিয়েছিলেন স্নিগ্ধা পুনম। সেই অভিজ্ঞতা থেকে লেখা তাঁর একটি বই সম্প্রতি প্রকাশ হয়েছে। নাম- ‘স্ক্যামল্যান্ডস: ইনসাইড দ্য এশিয়ান এম্পায়ার অব ফ্রড দ্যাট প্রেজ অন দ্য ওয়ার্ল্ড’।

স্নিগ্ধা লিখেছেন, ঝাড়খণ্ডে যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে আমি দিল্লির অত্যাধুনিক সাইবার ক্রাইম থানা পরিদর্শন করি। উপপুলিশ কমিশনার আমাকে তাঁর ফোনে একটি ভিডিও দেখালেন। এক প্রতারকের বাড়ির জাঁকজমকপূর্ণ চেহারা। যেখানে উজ্জ্বল রঙে আঁকা একটি বাংলো, বিশাল বারান্দা, আর্ট ডেকো নকশা, প্রতিটি অংশ শিশুদের খেলনার মতো চকচকে গোলাপি, সবুজ ও হলুদ।

পুনম খুঁজে বের করতে চাইলেন কীভাবে অবহেলিত এক রাজ্যের অজপাড়াগাঁ ভারতের ডিজিটাল প্রতারণার প্রতীক হয়ে উঠল। প্রথমে ভেবেছিলেন, এটি হবে প্রযুক্তির অন্ধকার দিক আর সহজ টাকার প্রলোভনের গল্প। কিন্তু সপ্তাহ ধরে রিপোর্টিং করতে করতে অন্য চিত্র ফুটে ওঠে। সেটি হলো ভারতীয়দের জীবনযাত্রার দুই রকমের সংঘর্ষ। একাংশ দৌঁড়াচ্ছে আধুনিক জীবনের সাফল্যের দিকে, আরেক দল টিকে থাকার সংগ্রাম করছে। এই সংঘর্ষই সব হারানো মানুষকে ঠেলে দেয় অপরাধের দিকে।

জামতাড়ায় জিতু নামের যে যুবকের সঙ্গে স্নিগ্ধা পুনমের পরিচয় হয় তাঁর উপাধি হলো ‘চিফ স্ক্যামার’। জিতু নিজেও বেশ গর্বের সঙ্গে এই উপাধি ধারণ করে। পুনম লিখেছেন, পীচ রঙের টি-শার্ট, শর্টস ও পুরোনো স্লিপার পরা জিতুকে দেখে কোনোভাবেই কুখ্যাত স্ক্যামার মনে করার উপায় ছিল না। বরং গ্রামের কোমল সহজ সরল যুবক মনে হয়েছে। তাঁকে দেখে আরও মনে হয়েছে, কীভাবে সম্মান দেখিয়ে মানুষের মনোজগতকে প্রভাবিত করা যায়। ঠিক এটিই জামতাড়ার স্ক্যামারদের কার্যপদ্ধতির মূল হাতিয়ার।

২০১২ সালে জিতু যখন স্কুলে পড়ে তখন এলাকার কয়েক ‘সিনিয়রের’ সঙ্গে সখ্যতা বাড়ে। ওই সিনিয়ররা জিতুকে বেছে নিয়েছিল কারণ, তাঁর মধ্যে সম্মান দেখানোর একটি ব্যাপার ছিল। জিতুর পরিবার দলিত শ্রেণির। কিন্তু তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায় যখন বাবা তাকে ফোন কিনে দেন। এটি ছিল স্যামস্যাংয়ের সাধারণ একটি ফোন। এরপর প্রতারণায় জিতুর হাতেখড়ি হয় সিতারাম মণ্ডলের কাছে।

জামতাড়ার একাংশ সাওতাঁল পরগনা নামেও পরিচিত। এখানকার অনেকের মুখেই পরিচিত নাম সিতারাম মণ্ডল। ২১শ শতকের জামতাড়ার চেহারা যিনি বদলে দিয়েছেন তিনিই সেই ব্যক্তি।

২০১১ সালে স্কুলের পাঠ চুকিয়ে মুম্বাই যান সিতারাম। পরের পাঁচ বছর তিনি ফুটপাত কিংবা রেলস্টেশনের দোকান ঘুরে কাজ শুরু করেন মোবাইল ফোনের ব্যালেন্স রিচার্জ সেন্টারে। সেখানেই তিনি শেখেন অচেনা মানুষকে কল দিয়ে কীভাবে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খালি করা যায়। সেটি হলো খুব সুন্দর করে মিথ্যা বলতে পারা। পরে শেখেন অচেনা ব্যক্তির গোপন তথ্য বের করার কৌশল। তবে এ কাজ একা একা করা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তাই নিজ এলাকায় ফিরে গ্রামের অন্য কিশোর-তরুণদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন।

পরে সিতারামের নেতৃত্বে জামতাড়ায় ‘এটিএম চোর’ নামে পরিচিত একটি দল গড়ে ওঠে। হাতে ফোন থাকায় জিতুও এক সময় এ কাজে জড়িয়ে পড়ে।

জিতু কিংবা সিতারাম মণ্ডলের দলের সদস্যদের তাদের বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয়রা কখনো সাইবার চোর হিসেবে দেখতো না। তারা তাদের দেখত অত্যন্ত দক্ষ শ্রমিক হিসেবে। ফলে পরের কয়েক বছরে তাদের নাম থেকে ধীরে ধীরে চোর শব্দটি বাদ পড়ে যায়।

স্নিগ্ধা পুনম লিখেছেন, তাঁর সঙ্গে আলাপের সময় গ্রামের বাসিন্দারা প্রতারকদের বোঝাতে কেবল ‘সাইবার’ শব্দটি ব্যবহার করতো। এই শব্দটি অপরাধের ওপর জোর না দিয়ে বরং বিষয়টিকে বর্ণনা করার একটি গ্রহণযোগ্য উপায় হয়ে উঠেছিল।

এই শব্দ পরিবর্তনের মধ্যেই প্রতারণাকে পেশা হিসেবে গ্রহণের সামাজিক স্বীকৃতি প্রতিফলিত হয়। আরও অনেকে কম লাভজনক পেশা- যেমন কৃষিকাজ ও দিনমজুরি ছেড়ে মোবাইল ফোনভিত্তিক প্রতারণার মতো বেশি লাভজনক এবং কম শ্রমসাধ্য কাজের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। আর এভাবেই জামতাড়ায় ‘স্ক্যামিং ফার্মিং’ নতুন সামাজিক মর্যাদার জায়গা পায়।

পুলিশ জামতাড়ার প্রতারক চক্রের খোঁজ পেয়েছিল স্থানীয় সূত্রের মাধ্যমে। কিন্তু কারা তারা? ধরা পড়া ব্যক্তিদের অভিযোগ, তাদের গ্রামের উচ্চবর্ণের লোকেরাই পুলিশকে তথ্য দিয়েছিল। কারণ তারা নিম্নবর্ণের পরিবারগুলোর হঠাৎ সম্পদশালী হয়ে ওঠা সহ্য করতে পারেনি।

স্নিগ্ধা পুনম লিখেছেন, জামতাড়ার গ্রামে এক সময় প্রভাবশালী ছিল সিং পরিবার। কিন্তু সাইবার প্রতারকেরা যখন সম্পদশালী হয়ে ওঠে তখন সিং’রা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।

সিং পরিবারের সদস্য বান্টি সিং। তিনি বলেন, এক সময় যারা সিংদের জমিতে চাষের কাজ করতো, বাড়ির উঠানে তামাক শুকাতো, কিংবা বাজারে গিয়ে ফসল বিক্রি করে দিতো, রান্নার কাজে সাহায্য করতো; তাদেরই ছেলে কিংবা আত্মীয় এক সময় কোটি টাকার মালিক বনে যায়। ওদের প্রতিদিনের লেনদেনের কথা শুনে যে কারও মাথা ঘুরে যাবে।

জামতাড়া নিয়ে বান্টি সিংয়ের মতামত হলো- বড় অঙ্কের নোট কেবল দুই ধরনের মানুষের মানিব্যাগে পাওয়া যায়। একজন রাজনীতিবিদ, আরেকজন সাইবার চোর।

(‘স্ক্যামল্যান্ডস: ইনসাইড দ্য এশিয়ান এম্পায়ার অব ফ্রড দ্যাট প্রেজ অন দ্য ওয়ার্ল্ড’ বইয়ের একাংশ প্রকাশ করেছে দ্য গার্ডিয়ান। সেখান থেকে সংক্ষেপে অনুবাদ করেছেন- সাদিকুর রহমান।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here