ইতিহাস মুছে দিতে চায় কারা?

0
26

আমার রাজনৈতিক প্রবণতা বরাবরই বামঘেঁষা– উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া আনুগত্য থেকে নয়, বরং ন্যায়বিচার, বহুত্ববাদ এবং ঐতিহাসিক সততার প্রতি বিশ্বাস থেকে। আজকের বাংলাদেশে চরমপন্থার উত্থান লক্ষ্য করতে গিয়ে আমাকে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন করে মতভেদ নয়, বরং স্মৃতির ইচ্ছাকৃত সংকোচন। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বাংলাদেশকে বিচ্ছিন্ন করার ক্রমবর্ধমান চেষ্টা।

দেশে একটি বিপজ্জনক ডানপন্থি ঝোঁক স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যা শুধু মতাদর্শের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দৃশ্যমান নাটকীয়তার মাধ্যমেও কাজ করছে। ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড, উদাহরণস্বরূপ একটি পরিচিত বৈশ্বিক প্যাটার্নের প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্রের চার্লি কার্কের মতো ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, মৃত্যুর আগে হাদির নামও ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কাছে পরিচিত ছিল না। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরই তাঁর নাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। উভয় ক্ষেত্রেই মনোযোগ সরে যায় ব্যবস্থাগত অবিচার বা কাঠামোগত ব্যর্থতা থেকে নয়, বরং আবেগঘন উত্তেজনামূলক ঘটনাবলির দিকে, যা বিভাজনকে আরও কঠিন করে তোলে। এতে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এ ধরনের মুহূর্তগুলো কি নেহাতই কাকতাল, নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যবহার, এমনকি পরিকল্পিতভাবেই জনআলোচনাকে ডান দিকে ঠেলে দিতে?

একই সঙ্গে আরও গভীর ও বিপজ্জনক একটি প্রকল্প চলমান– বাংলাদেশের নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি থেকে একাত্তরকে মুছে ফেলার চেষ্টা। জুলাই গণঅভ্যুত্থান আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদ, দুর্নীতি ও বিশেষাধিকারভিত্তিক শাসনের বিরুদ্ধে একটি মুক্তি হিসেবে বাস্তব, প্রয়োজনীয় এবং ন্যায্য ছিল। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থান একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিকল্প নয়। তা হতেও পারে না। এই দুই সময়কে সমার্থক হিসেবে দেখা কিংবা আরও খারাপভাবে– জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে একাত্তরের ‘সংশোধন’ হিসেবে দাঁড় করানো ইতিহাসের প্রতি অসততা এবং সংস্কৃতির জন্য ধ্বংসাত্মক।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি ছিল না। এটি আওয়ামী লীগের ‘একচেটিয়া’ বিষয়ও ছিল না। যুদ্ধে কেবল তারাই লড়েনি, যারা পরে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে। আমার পরিবারও সেই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। তারা কোনো দলীয় পৃষ্ঠপোষকতা নেয়নি। কোনো রাষ্ট্রীয় পুরস্কার, ভাতা বা স্বীকৃতি সংগ্রহ করেনি। তারা লড়েছিল, কারণ পাকিস্তান এই ভূখণ্ডকে দমন করেছিল– এর ভাষা, এর মানুষ, এর মর্যাদা। পরবর্তীকালে কে মুক্তিযুদ্ধকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে, তা নির্বিশেষে এই সত্য অটল।

একাত্তরকে কেবল একটি দলীয় প্রতীক হিসেবে নামিয়ে আনা নিজেই একটি বিকৃতি। আর একে পুরোপুরি মুছে ফেলা আরও ভয়াবহ– এটি বাংলাদেশের অস্তিত্বের কারণকেই ছিনিয়ে নেয়। একাত্তর ছাড়া বাংলাদেশ হয়ে পড়ে আকস্মিক– এর সীমানা হয় খেয়ালি। এর পরিচয় হয় দরকষাকষির বিষয়। এর সংস্কৃতি হয় অস্বীকারযোগ্য। এই মুছে ফেলা সুবিধাজনক তাদের জন্য, যারা বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ব্যর্থ সম্প্রসারণ হিসেবে অথবা ভারতের ওপর নির্ভরশীল কৃত্রিম রাষ্ট্র হিসেবে দেখাতে চায়– একটি জাতি হিসেবে নয়, যা গণপ্রতিরোধ ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে।

হ্যাঁ, একাত্তরে ভারতের ভূমিকা ছিল। তা পাকিস্তানি নিপীড়নকে অস্বীকার করে না, কিংবা বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্যোগ ও আত্মনিয়ন্ত্রণকে বাতিল করে না। ইতিহাস কোনো শূন্যসম আনুগত্য পরীক্ষার বিষয় নয়। একটি পরিণত রাষ্ট্র ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা স্বীকার করতে পারে, নিজের বয়ান ত্যাগ না করেই। ভারত থেকে দূরে থাকার অজুহাতে একাত্তরকে মুছে ফেলা সার্বভৌমত্ব তৈরি করে না; এটি কেবল স্মৃতিভ্রংশ সৃষ্টি করে।

এর বদলে যে জাতীয়তাবাদ জন্ম নেয়, তা ফাঁপা। এটি সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে প্রত্যাখ্যান করে; ভাষাগত সংগ্রামকে অস্বীকার করে; পরিচয়কে রাজনৈতিক সুবিধামতো নতুন করে লেখার বস্তুতে পরিণত করে। এটি মুক্তি নয়। এটি স্থানচ্যুতি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল সেই শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, যারা একাত্তরের চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। কিন্তু বিকৃতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে গিয়ে উৎসকেই ধ্বংস করা জরুরি নয়। বরং একাত্তর-পরবর্তী শাসনের ব্যর্থতাগুলো আমাদের দাবি করে– মুক্তিযুদ্ধ কী প্রতিনিধিত্ব করেছিল, তার সঙ্গে আরও গভীরভাবে বোঝাপড়া; তাকে পরিত্যাগ করা নয়।

বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে ইতিহাস মুছে ফেলতে হবে না। প্রয়োজন ঐতিহাসিক স্বচ্ছতা। একাত্তর ছাড়া মুক্ত করা, সংস্কার করা বা বিতর্ক করার মতো কোনো বাংলাদেশই নেই। যে রাজনীতি আমাদের তা ভুলতে বলে, তা বৈপ্লবিক নয়– শিকড়হীন। আর শিকড়হীন কোনো দেশই টিকে থাকতে পারে না, সে যেদিকেই ঝুঁকুক না কেন।

আনুশেহ আনাদিল: সংগীতশিল্পী ও সমাজকর্মী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here