জামায়াতের ইশতেহার : লক্ষ্য শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ও বৈশ্বিক মর্যাদা

0
70

পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের হারানো মর্যাদা পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার নিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটির এই ইশতেহারে কেবল চিরাচরিত রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে আমূল পরিবর্তনের এক উচ্চাভিলাষী রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ন্যায্যতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে সামরিক খাতে শতভাগ আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে জামায়াতের এই ‘ভিশন’ রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে দলটি। ইশতেহারে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষানীতির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও ভিশন বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

পররাষ্ট্রনীতি : পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমমর্যাদা
জামায়াতে ইসলামী তাদের ইশতেহারে পারস্পরিক সম্মান, ন্যায্যতা ও সমমর্যাদামূলক পররাষ্ট্রনীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। এর মূল দিকগুলো হলো
১. বিশ্বে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশি পাসপোর্টের মর্যাদা বাড়ানো : বিশ্বে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশিদের মর্যাদা বাড়ানোর চেষ্টার পাশাপাশি বাংলাদেশি পাসপোর্টের মর্যাদা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
২. প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক : ভারত, ভুটান, নেপাল, মায়ানমার, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ ও থাইল্যান্ডসহ প্রতিবেশী এবং নিকট প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে শান্তি, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে।
৩. মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বাড়ানো হবে।
৪. উন্নত বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক : যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, কানাডাসহ উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক তৈরি করা হবে।
৫. পূর্ব ইউরোপ, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা : পূর্ব ইউরোপ, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
৬. জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় সক্রিয় সম্পৃক্ততা : শান্তি, নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের মতো বৈশ্বিক বিষয়গুলো মোকাবিলায় জাতিসংঘ এবং এর সহযোগী সংস্থাগুলোতে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ আরও জোরদার করা হবে।
৭. আঞ্চলিক সংস্থায় সক্রিয় অংশ গ্রহণ : সার্ক, আসিয়ানের মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোতে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখা হবে।
৮. রোহিঙ্গাদের জন্য শান্তি ও নিরাপত্তা উদ্যোগ : রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ, টেকসই সমাধান ও তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তায় নিশ্চিত করা হবে।
৯. জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনী : জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখা হবে।
১০. বৈধ ও স্বচ্ছ অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সমর্থন ও সহযোগিতা করবে।

প্রতিরক্ষানীতি : ভিশন ২০৪০ ও আত্মনির্ভরশীলতা
১. জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়ন : বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ও যুগের প্রতিরক্ষা বাস্তবতাকে সামনে রেখে দেশের সকল প্রতিরক্ষা অংশীজনের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি যুগোপযোগী ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি’ প্রণয়ন করা হবে।
২. নতুন মিলিটারি ডকট্রিন তৈরি : জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতিমালার আলোকে পুরনো ভিশন ২০৩০ আধুনিকায়ন ও সময়োপযোগী করে ভিশন ২০৪০ তৈরি করা হবে।
৩. সামরিক গবেষণা সংস্থা : বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার জন্য একটি ‘জাতীয় সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান’ স্থাপন করা হবে। এই সংস্থার প্রধান লক্ষ্য হবে বাংলাদেশকে অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে শক্তিশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও সরঞ্জামগুলোতে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনে সব ধরনের গবেষণা সহায়তা প্রদান ও সমন্বয় করা।
৪. সামরিক বাহিনীর বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি ও আধুনিকীকরণ : দেশের সার্বিক সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও নিজস্ব সামরিক প্রযুক্তি অর্জন, বিকাশ ও সুদূরপ্রসারী সক্ষমতা সুদৃঢ়করণের লক্ষ্যে প্রতিরক্ষা খাতে বায় পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হাব।
৫. নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা অর্জন ও প্রযুক্তির বিকাশ সুদৃঢ়করণ : শতভাগ সামরিক আত্মনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি অর্জন নিশ্চিত করে ২০৪০ সালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অস্ত্র দেশে তৈরির সক্ষমতা অর্জন করা হবে।
৬. গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আধুনিকীকরণ : রাষ্ট্রীয় ও সামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আধুনিকীকরণ, সংস্কার ও পুনর্বিন্যাস করা হবে।
৭. স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে সামরিক প্রশিক্ষণ : ১৮-২২ বছর বয়সি তরুণ-তরুণীদের জন্য ৬-১২ মাসের একটি সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা চালু করার প্রক্রিয়া অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা হবে।
৮. দেশের জনসংখ্যার অনুপাতে পর্যায়ক্রমে সেনাসদস্য সংখ্যা বাড়ানো হবে।
৯. সীমান্তে মাদক চোরাচালানসহ সকল প্রকাশ্য অবৈধ ও অপরাধমূলক কাজ প্রতিরোধে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানো হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here