স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছে বাংলাদেশ। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরদিনই আনুষ্ঠানিকভাবে এ আবেদন করা হয়েছে। সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) চেয়ারম্যানের কাছে এ সম্পর্কিত চিঠি পাঠিয়েছেন।
বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণসহ আরও কিছু বিষয় পর্যালোচনার জন্য চলতি মাসের শেষ দিকে সিডিপির একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এলডিসি থেকে উত্তরণ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায়। অতীতে কয়েকটি দেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ পেছানো বা স্থগিত হওয়ার নজির রয়েছে।
গত বুধবার সিডিপি চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পোর কাছে চিঠি পাঠান ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী। এতে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা কারণে দেশের অর্থনীতিতে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে এলডিসি থেকে উত্তরণ-প্রস্তুতির সময় ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ জানান তিনি।
এর আগে গত বুধবার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কর্মদিবসে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর সাংবাদিকদের জানান, নতুন সরকার স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়ে দিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে। ইআরডির সঙ্গে দ্রুত সমন্বয় করে উত্তরণ পেছানোর কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। ওই দিনই সিডিপি চেয়ারম্যানকে চিঠি দেন ইআরডি সচিব।
চলতি বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় নির্ধারিত রয়েছে। বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালে সিডিপির ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়। সূচকগুলো হচ্ছে মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা। ২০২১ সালে দেওয়া সিডিপির সুপারিশ অনুসারে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হওয়ার কথা। তবে অতিমারি করোনার কারণে উত্তরণ দুই বছর পেছানো হয়।
ব্যবসায়ী মহল অনেক দিন ধরেই এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা আরও অন্তত তিন বছর বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে। গত বছরের আগস্টে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ, এফবিসিসিআইসহ ১৬টি সংগঠন সংবাদ সম্মেলন করে ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০৩২ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানায়। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এলডিসির জন্য থাকা সুবিধা উঠে গেলে রপ্তানি খাত বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও ওষুধশিল্প চাপের মুখে পড়তে পারে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার জাতিসংঘের সিডিপিতে সময় বাড়ানোর কোনো আবেদন করেনি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নতুন সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়।
সিডিপি চেয়ারম্যানের কাছে ইআরডি সচিবের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতির স্বীকৃতি এবং কভিড-১৯ অতিমারির নজিরবিহীন প্রভাব থেকে পুনরুদ্ধারে সহায়তার জন্য মোট পাঁচ বছর সময় দেওয়ায় বাংলাদেশ গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। তবে এই সময়ের মধ্যে একের পর এক দেশি ও আন্তর্জাতিক সংকটে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়েছে। উত্তরণের প্রস্তুতি চলাকালে বৈশ্বিক ও জাতীয় প্রেক্ষাপট অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল।
চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশ উত্তরণের তিনটি মানদণ্ড পূরণ করেছে। কিন্তু ধারাবাহিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যায় প্রস্তুতি প্রচণ্ডভাবে ব্যাহত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে কভিড-১৯-এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও ধীরগতির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও তার প্রভাবে জ্বালানি ও খাদ্যের বিশ্ববাজারে অস্থিরতা, বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতি, মধ্যপ্রাচ্য ও লোহিত সাগর অঞ্চলে সংঘাত, বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা বাড়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, দেশের অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে বিগত সময়ে আর্থিক খাতে অনিয়ম ও গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের প্রভাব, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অনিষ্পন্ন থাকা ও এজন্য জাতীয় বাজেট থেকে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে চিঠিতে।
চিঠিতে বলা হয়, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ এসব কারণে সামষ্টিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা, জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বেসরকারি-সরকারি বিনিয়োগ ও কর-জিডিপি অনুপাতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি ও বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজারও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ইআরডি সচিব চিঠিতে বলেন, এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট ও আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতা দারিদ্র্য হ্রাসের প্রবণতাকে উল্টো দিকে ঠেলে দিয়েছে। ফলে নীতিগত মনোযোগ স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও সংকট ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীভূত করতে হয়েছে। এটি মসৃণ এলডিসি-উত্তরণ কৌশলের (এসটিএস) অগ্রাধিকারমূলক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন সীমিত করেছে। কাঠামোবদ্ধ প্রস্তুতির জন্য পাঁচ বছরের যে সময় নির্ধারিত ছিল, তা মূলত ব্যয় হয়েছে সংকট মোকাবিলা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টিকে থাকার সংগ্রামে।
চিঠিতে বলা হয়, এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্য ও বাজার-সুবিধাসংক্রান্ত অনিশ্চয়তাও বেড়েছে। তৈরি পোশাক খাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়া নিয়ে সম্ভাব্য জটিলতা, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ ইত্যাদি কারণে এ অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বর্তমান সময়সূচি অনুযায়ী এলডিসি থেকে উত্তরণ এগিয়ে নিলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য হ্রাসে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সরকার মনে করছে। এ অবস্থায় চলমান অর্থনৈতিক সমস্যা কাটিয়ে ওঠা ও সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে উল্লেখযোগ্য সময় ও প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
তাই এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির সময় ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন ইআরডি সচিব। তিনি বলেন, এতে সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল করা, সংস্কার জোরদার এবং এসটিএসের অগ্রাধিকারমূলক কাজ সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত পরিসর তৈরি হবে। সেই সঙ্গে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উত্তরণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।





