ঢাকায় আসছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত

0
29

বাণিজ্যে ভারসাম্য তৈরিতে শুল্ক নির্ধারণে সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (আর্ট) বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি সই করে বাংলাদেশ। তবে চলতি মাসে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশ্বজুড়ে পাল্টা শুল্ক আরোপের পদক্ষেপ বাতিল করে দেন। ফলে পাল্টা শুল্ক না থাকলেও সই করা এ চুক্তি বাস্তবায়নের পরামর্শ থাকবে ঢাকার জন্য। আর এ পরামর্শ নিয়ে তিন দিনের সফরে ঢাকা আসছেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি এস পল কাপুর।

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। মার্চের শুরুতে পল কাপুর বাংলাদেশ সফর করবেন বলে মন্ত্রীকে জানান রাষ্ট্রদূত।

জানা গেছে, মার্চের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা সফর করবেন পল কাপুর। আগামী মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকায় নামবেন তিনি। পরদিন ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে বৈঠক করবেন। এদিন রাতে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দেওয়া নৈশভোজে অংশ নেবেন। এ ছাড়া ৫ মার্চ একাধিক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করবেন পল কাপুর। ওই দিন সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া ইফতার ও নৈশভোজে অংশ নেবেন তিনি। ৬ মার্চ ভোরে পল কাপুরের ঢাকা ছাড়ার কথা।

তিন দিনের ঢাকা সফরে বাণিজ্য, জ্বালানি, শ্রম ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠক করবেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও তাঁর সৌজন্য সাক্ষাতের কথা রয়েছে। পল কাপুরের এবারের সফরে গুরুত্ব পাবে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক। এ বৈঠক ছাড়াও রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের নৈশভোজে ব্যবসায়ীদের বেশি সমাগম হবে।

নাম না প্রকাশের শর্তে ওয়াশিংটনের একটি সূত্র জানায়, সরকারের সঙ্গে শুল্ক ও বাণিজ্য নিয়ে কোনো প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ব্যবসায়ীদের অজুহাত দেখানো হয়। ব্যবসায়ীরা মানবে না বলে বিভিন্ন বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়। ফলে পল কাপুরের সফরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক অগ্রাধিকার পাবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য

সংযুক্ত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে আর্ট ও মার্কিন বাণিজ্য নীতি এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে। এরপর সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি।

বর্তমান সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির অন্যতম মধ্যস্থতাকারী ছিলেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। নাম না প্রকাশের শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা এ চুক্তিটি খুবই ভারসাম্যহীন। বিশেষ করে এ চুক্তির ফলে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা হয়নি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর যে পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’– সে নীতির পরিপন্থি। নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্টে (এনডিএ) সরাসরি চীনের নাম ছিল। চীনের থেকে সামরিক ক্রয়ের ক্ষেত্রে আপত্তির কথা উল্লেখ ছিল। তবে সই করা চুক্তিটি আরও বিস্তৃত। সামরিক ক্রয়ের ক্ষেত্রে এখন শুধু চীন নয়; মার্কিন অপছন্দের কারও কাছ থেকে কেনার ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হতে হবে।

কূটনীতিকরা বলছেন, চুক্তিটি সইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশ তাড়াহুড়া করেছে। নির্বাচনের তিন দিন আগে এমন একটি চুক্তি করা ঠিক হয়নি, বরং নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দেওয়া উচিত ছিল। আর চুক্তির দরকষাকষিতে বাংলাদেশ কোনো দক্ষতা দেখাতে পারেনি। কারণ চুক্তির ধারাগুলো পড়লেই দেখা যায়, ঢাকা কোনো শর্ত রাখতে পারেনি।

তারা বলছেন, চুক্তিটি যে অসম– তার অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। তার মধ্যে একটি হলো ‘ধারা ৪-এর অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা’। ৪-এর ১, ২ ও ৩ ধারায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যদি এমন কোনো দেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসা করে, যার বাজারমূল্যের থেকে কমে পণ্য বিক্রি করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা নিতে পারবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাহলে বাংলাদেশকে তা মেনে চলতে হবে এবং সে অনুযায়ী রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করতে হবে। বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি বা জ্বালানি কিনতে পারবে না, যারা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে ক্ষুণ্ন করে। পুরো চুক্তিতেই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। চুক্তিটি বাংলাদেশের অর্থনীতি বা বাণিজ্যের সক্ষমতা ও বাস্তবতা, কোনোটাই প্রাধান্য পায়নি। ওয়াশিংটন এক প্রকার ঢাকার ওপর তা চাপিয়ে দিয়েছে।

চুক্তি থেকে বের হওয়া
চুক্তি থেকে বের হওয়া ঢাকার জন্য সহজ হবে না। আদালত আরোপিত পাল্টা শুল্ক বাতিল করার জবাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নতুন করে ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ করেছেন। এর ফলে আগের ১৫ শতাংশ শুল্কের সঙ্গে বাংলাদেশকে ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্কের স্থলে পণ্য রপ্তানিতে ১০ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। আদালত এখন পর্যন্ত শুধু শুল্ক নিয়ে রায় দিয়েছেন; তার প্রভাব আর্ট চুক্তিতে পড়বে না।
যদিও গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সই করা বাণিজ্য চুক্তি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক ও বাণিজ্য চুক্তির বিষয়গুলো নিয়ে এখনই কিছু বলার সময় আসেনি। চুক্তি পর্যালোচনার পর করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এখন চাইলেও এ চুক্তি থেকে বের হওয়া সহজ হবে না। কারণ আদালতের রায়ের পর মার্কিন বাণিজ্য দপ্তর এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছে, বিচারাধীন থাকার পরও আমাদের অংশীদাররা আলোচনা অব্যাহত রেখেছে এবং চুক্তি সই করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমস্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর থাকবে বলে আমরা আত্মবিশ্বাসী।

চুক্তি নিয়ে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চুক্তির দরকষাকষিতে বড় ধরনের অদক্ষতা লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সক্ষমতার বাইরে গিয়ে চুক্তি করা হয়েছে। এর থেকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিএফসি ফান্ড নিয়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে সে বিনিয়োগের কাঁচামাল যুক্তরাষ্ট্র থেকে এনে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো যেত। চুক্তিটির মাধ্যমে বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে।

চুক্তিটি অসম হয়েছে– মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ এম মাসরুর রিয়াজ। তিনি সমকালকে বলেন, এ চুক্তি যতটা না বাণিজ্যিক, তার থেকে বেশি রাজনৈতিক। মার্কিন আদালতে শুধু পাল্টা শুল্ক আরোপ নিয়ে রায় এসেছে। ফলে বাংলাদেশের চুক্তিটি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

চুক্তি থেকে বের হতে চাইলে তার জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি আরও বলেন, মার্কিন আদালতের রায়ের পর চাইলে ঢাকা এ চুক্তি থেকে বের হতে পারে। তবে তা ইতিবাচকভাবে দেখবে না ওয়াশিংটন। আলাদা করে শুল্কা আরোপ না হলেও রাজনৈতিকভাবে ওয়াশিংটনকে মোকাবিলা করার সক্ষমতা নেই ঢাকার। ফলে এ ক্ষেত্রে চুক্তির বেশ কিছু বিতর্কিত শর্ত নিয়ে নতুন করে দরকষাকষির অনুরোধ করতে পারে বাংলাদেশ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here