বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলেছে, নতুন সরকারের ঘোষিত ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মপরিকল্পনা ইতিবাচক হলেও একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছরের দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার সমান্তরালে শুরু না করলে ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
সিপিডির মতে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক অনাগ্রহ, আইনগত জটিলতা এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার থেকে সরে যাওয়ার প্রবণতার কারণে অনেক উদ্যোগই কাঙ্ক্ষিত ফল পায় না। তাই সরকারের নীতি বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার ঘাটতি কাটিয়ে তুলে জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বিকেন্দ্রীকরণ, জ্ঞানভিত্তিক নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকতে হবে। যা হবে তথ্যসমৃদ্ধ, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আইনি প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সক্ষম।
গতকাল শনিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে আয়োজিত ‘নতুন সরকারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত : ১৮০ দিন ও তারপর’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এসব তথ্য তুলে ধরেন। গবেষণা প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তাকারী সিপিডির গবেষকরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
সিপিডির মতে, প্রথম ১৮০ দিনে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে এবং পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিক সংস্কার চালু রাখতে হবে। এ উদ্যোগ শুধু মন্ত্রণালয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা, সিটি করপোরেশনসহ সব স্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়ন করতে হবে। দ্রুত অংশগ্রহণমূলক স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আমলাতন্ত্রকে আইন-নীতি প্রণয়নকেন্দ্রিক কাঠামো থেকে বাস্তবায়নকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর জরুরি। দক্ষতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ, ডিজিটাল রূপান্তর, আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার– এসব সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।
সরকার যেন কেবল নির্বাহী শাখার ওপর নির্ভর না করে জাতীয় সংসদকেও সক্রিয়ভাবে কাজে লাগায়, সে আহ্বান জানিয়েছে সিপিডি। সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোকে শক্তিশালী করে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত এবং বাজেট আলোচনার সময় বৃদ্ধি ও খসড়া বাজেটের বিস্তারিত পর্যালোচনার সুযোগ তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।
অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে সতর্কতা
নির্বাচনী ইশতেহারে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, যমুনা সেতুসহ বড় অবকাঠামো প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বর্তমান আর্থিক বাস্তবতায় বৃহৎ বিনিয়োগে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি। অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে না আসা পর্যন্ত বড় প্রকল্পে অগ্রসর না হওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একইভাবে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার পরিবর্তে ২০৪০ সাল পর্যন্ত ৩০ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতাই যথেষ্ট হতে পারে বলে মত দিয়েছে সংস্থাটি। তবে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগের প্রশংসা করে যোগ্যতাভিত্তিক উপকারভোগী নির্ধারণে জোর দেওয়া হয়েছে।
কর ন্যায্যতা ও রাজস্ব সংস্কার
সিপিডি জানিয়েছে, বর্তমানে কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। মধ্য মেয়াদে এই অনুপাত ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে হলে কর ন্যায্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। এ বিষয়ে সিপিডির প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে– ভ্যাটের হার আট স্তর কমিয়ে তিন স্তরে এবং দীর্ঘ মেয়াদে দুই বা একক হারে আনা, অপ্রয়োজনীয় কর অবকাশ প্রত্যাহার, অনলাইন কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা, ডিজিটাল পদ্ধতিতে দ্রুত কর বিরোধ নিষ্পত্তি ইত্যাদি।
ব্যবসার পরিবেশ ও ন্যায়পাল নিয়োগ
ব্যবসার পরিবেশের সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দুর্নীতিকে চিহ্নিত করেছে সিপিডি। সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অপ্রাতিষ্ঠানিক লেনদেনের প্রয়োজনীয়তা ব্যবসায়ীদের বড় চ্যালেঞ্জে ফেলছে বলে উল্লেখ করা হয়। কর, ব্যবসা ও ব্যাংক– এই তিন খাতে ন্যায়পাল নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার জট, বিদ্যুৎ-গ্যাসের অনিশ্চয়তা, জটিল বিধিবিধান, দুর্বল ব্যাংক খাত ও উচ্চ খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে বলে জানানো হয়।
সংস্থাটি বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, রাজস্ব বোর্ড, কোম্পানি নিবন্ধক ও কাস্টমসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন; ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ অর্থায়ন এবং বাণিজ্যিক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ আদালত গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে।
বড় সমস্যা শিশুশ্রম ও শ্রম অধিকার
সিপিডির তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশে শ্রমিক অধিকার প্রশ্নে পরিস্থিতি নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ন্যূনতম মজুরি এখনও তুলনামূলকভাবে কম এবং অনেক খাতে তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় না। বহু ক্ষেত্রে শ্রমিকরা ন্যূনতম মজুরি ও ওভারটাইম সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হন। এর পাশাপাশি প্রায় ৩৫ লাখ শিশু বিভিন্ন ধরনের শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে, যা শ্রমবাজারের একটি বড় সামাজিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। এ প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যতে বিএনপি সরকার শ্রম অধিকার, ন্যায্য মজুরি, শ্রম আইন বাস্তবায়ন ও শিশুশ্রম নিরসনে কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের আহ্বান
সিপিডি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তিকে বৈষম্যমূলক আখ্যা দিয়ে বলেছে, এতে বাংলাদেশের নীতি-স্বাধীনতা সীমিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এলডিসি-উত্তর রূপান্তর কৌশল বিবেচনায় চুক্তি কার্যকারিতা শুরুর আগে পুনর্বিবেচনা বা বাতিলের আহ্বান জানানো হয়েছে। জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির ক্ষেত্রেও জ্বালানি রূপান্তর প্রক্রিয়া বিবেচনায় পুনর্মূল্যায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
গভর্নর নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগে নির্দিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া না থাকায় অস্বচ্ছতা তৈরি হয়েছে। তিনি ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে নির্বাচন কমিটি ও নির্দিষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড রয়েছে। বাংলাদেশেও আইনবদ্ধ বাছাই প্রক্রিয়া চালুর পরামর্শ দেন তিনি। সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সংস্কার উদ্যোগ অব্যাহত রাখার কথাও উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘আমি প্রত্যাশা করব, প্রধানমন্ত্রী যেন সাবেক গভর্নরকে তাঁর দপ্তরে আমন্ত্রণ জানান এবং তাঁকে যেন আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানান।’





