কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের চিলমারী ইউনিয়নের খারিজাথাক গ্রামের যুবক শাহিনুল ইসলাম দিনের শুরুতেই বেরিয়ে পড়তেন মোটরসাইকেল নিয়ে। পাঁচ বছর ধরে উপজেলার চরাঞ্চলের তপ্ত বালু আর মেঠোপথ চিরে তাঁর বাইকটি শুধু মানুষই পারাপার করত না, বয়ে চলত তাঁর চার সদস্যের সংসারের স্বপ্ন। শুকনো মৌসুমে যখন চরের দুর্গম পথ অন্য কোনো যানবাহনের জন্য অগম্য হয়ে পড়ে, তখন শাহিনুলের দুই চাকার যানটিই ছিল যাত্রীদের ভরসা। আর এটির আয়েই চলত দুই ছেলের পড়াশোনা, সংসারের খরচ। কিন্তু তীব্র জ্বালানি সংকটে শাহিনুলের সাজানো ছকে কালো ছায়া নেমে এসেছে। তেলের অভাবে এখন মোটরসাইকেলের চাকা ঘুরছে না, স্থবির হয়ে পড়ার উপক্রম সংসারের চাকাও।
শাহিনুল বললেন, তেল না পাওয়ায় বাড়িতে বাইকটি অচল পড়ে আছে, আর ঘরে চালের ড্রাম খালি হচ্ছে। মোটরসাইকেলের চাকা না ঘুরলে আমাদের জীবনও চলে না। দৌলতপুরের শাহিনুল ইসলাম একা নন, দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এখন একই চিত্র। জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে ভাড়ায়চালিত বাইকের চালকই শুধু নন, বিভিন্ন পেশাজীবী যারা কর্মসূত্রে মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীল, তারাও চরম বেকায়দায় পড়েছেন। মাঠ পর্যায়ে ঘুরে ঘুরে কাজ করা মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ, এনজিওকর্মী, কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারিম্যান ছাড়াও শিক্ষকসহ চাকরিজীবীরা সময়মতো কাজে যেতে পারছেন না। এতে অনেকেই কর্মস্থলে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হচ্ছেন। ভাড়ায় চালিত অনেক বাইকের চালক ইতোমধ্যে বেকার হয়ে গেছেন। বন্ধ হয়ে গেছে খুচরা জ্বালানি বিক্রির অসংখ্য দোকান। মোটরসাইকেল কম আসায় কাজ হারিয়েছেন অনেক গ্যারেজকর্মী। বিপাকে পড়েছেন বিভিন্ন এলাকার গণমাধ্যমকর্মীরাও। খবরের সন্ধানে বাইক নিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছুটে চলা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে তাদের। দেশের অন্তত ২০টি জেলা-উপজেলা থেকে সমকালের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে ইউএনওর কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন বিভিন্ন কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের সংগঠন এসআর সমিতির সদস্যরা।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের চরাঞ্চলে মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন চার শতাধিক মানুষ। এখানকার অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বহুলাংশে এই বাইকের ওপর নির্ভরশীল। আর উপজেলায় মোটরসাইকেলকেন্দ্রিক সরাসরি উপার্জনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিন হাজারের বেশি মানুষ। তাদের বড় একটি অংশ ভ্রাম্যমাণ হকার, যারা প্রতিদিন বাইক নিয়ে গ্রামে ঘুরে ঘুরে পণ্য বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তেলের তীব্র সংকটে এখন তাদের সপ্তাহের অধিকাংশ দিনই বাড়িতে বেকার বসে থাকতে হচ্ছে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সামান্য তেল মিললেও তার পেছনে চলে যাচ্ছে প্রায় পুরো একটি দিন। পেট্রোল পাম্পের বাইরে গোপনে দুয়েক লিটার তেল পাওয়া গেলেও লিটারে নিচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা।
রাজধানীতে মোটরসাইকেলে অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং চালুর বহু আগে থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভাড়ায় যাত্রী বহন-ব্যবস্থা চালু আছে। উপজেলা শহর থেকে গ্রাম পর্যায়ে যেতে বহু মানুষ মোটরসাইকেল বেছে নেন। দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, অন্য যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী সড়ক, দুর্গম এলাকায় সহজে পৌঁছানো– সব মিলিয়ে অনেক এলাকায় ভাড়ার মোটরসাইকেল গুরুত্বপূর্ণ বাহন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশের এসব প্রত্যন্ত অঞ্চলে জীবন-জীবিকা ও যাতায়াত ব্যবস্থায় ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।
খুলনা, যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, সাতক্ষীরা, শরীয়তপুর, রংপুর, বগুড়া, নাটোর, সিরাজগঞ্জ টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, শেরপুর, কিশোরগঞ্জ, ভৈরব ও গাইবান্ধার প্রতিটি অঞ্চলে এখন একই দৃশ্য। বগুড়া শহরের খান্দার এলাকায় পরিবার নিয়ে থাকেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা টিএমএমএসের মাঠকর্মী হাবিবুর রহমান। তার কর্মস্থল জেলার কাহালু উপজেলার জামগ্রাম এলাকায়। প্রতিদিন সকাল ৭টায় মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে এক ঘণ্টার মধ্যে কর্মস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করেন। কাজ শেষে ফেরেন রাত ৯টায়, এভাবেই চলছিল তার কর্মজীবন। প্রতিদিন যাতায়াতে ২০০ টাকার পেট্রোল লাগে, যা শহরের চারমাথা এলাকায় একটি পাম্প থেকে দুই মিনিটেই নিতে পারতেন। এখন সকালে দুই-তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তবেই তেল নিতে হচ্ছে। তাও ২০০ টাকার বেশি মিলছে না। বুধবার সকাল ৯টায় শহরতলির চারমাথায় মেহেরা ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষায় থাকা হাবিবুর রহমান বললেন, সময়মতো অফিসে যেতে না পারায় কাজে বিঘ্ন ঘটছে এবং পারফরম্যান্স সন্তোষজনক না হওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাকে ইতোমধ্যে দুই দফা সতর্ক করেছে। এভাবে দেরিতে অফিসে গেলে চাকরি থাকবে না বলে হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয়েছে। কর্মস্থলে প্রতিদিনই দেরি হওয়ায় চাপের মুখে পড়েছেন জেলার সারিয়াকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ফার্মাসিস্ট আবু তালেবও।
যশোর শহর থেকে দক্ষিণে ১৮ কিলোমিটার দূরের রাজগঞ্জ বাজার। এটি যশোর ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলার অন্যতম প্রবেশদ্বার। প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ায় এখানকার মানুষের যাতায়াতের প্রধানতম বাহন মোটরসাইকেল। বাজারটিতে ভোর থেকে গভীর রাত অবধি অবস্থান করে শতাধিক বাইক। গত বুধবার দুপুরে বাজারের মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, আট থেকে ১০টির মতো বাইক। চালকরা জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে যতটুকু তেল মিলছে, তা দিয়ে দূরের গন্তব্য যাওয়া যাচ্ছে না। নিজ উপজেলার ভেতরেই ট্রিপ দিতে হচ্ছে। অধিকাংশ চালক তেল সংকটে বাইক বেরই করেননি।
সেখানে আকবর আলী নামের এক চালক বলেন, ১৮ বছর ধরে বাইকই আমার জীবিকার একমাত্র মাধ্যম। করোনাকালে মানুষ চলাচলা কম থাকলেও আমাদের গাড়ি স্বাভাবিক ছিল। এখন মানুষ বের হলেও গাড়ি চালাতে পারছি না। আগে বিভিন্ন গ্রামের মোড়ে মোড়ে মুদি দোকানেও তেল মিলত। এখন সেখানেও পাওয়া যাচ্ছে না।
খুলনার দাকোপে জ্বালানি পাম্প নেই। তবে উপজেলাজুড়ে থাকা তিন শতাধিক পেট্রোলের খুচরা দোকান থেকে জ্বালানি নিতেন বাইকাররা। ২০ দিন ধরে এসব দোকানও বন্ধ। এ উপজেলায় ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালক সমিতি রয়েছে ৩৫টি। এসব সমিতির অধীনে বাইক সহস্রাধিক। পানখালী মোটরসাইকেল চালক সমিতির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক মোল্যা বলেন, পেট্রোল সংকটের কারণে অনেক চালক বাইক বাড়িতে ফেলে রেখে জীবিকার জন্য অন্য কাজ ধরেছেন। বাইক না পেয়ে যাত্রীরা ইজিবাইক, রিকশা, ভ্যানে চলাচল করছেন।
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরের গোবিন্দপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৫ শিক্ষকই বাইকে করে স্কুলে যেতেন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি আফাজুর রহমান খান জানান, তিনি জেলা সদরের বাসা থেকে নিজের বাইকে চড়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে কর্মস্থলে যেতেন। এক সপ্তাহ ধরে শিক্ষকরা অটোরিকশায় বিদ্যালয়ে যাচ্ছেন।
জেলার ফার্মাসিউটিক্যালস রিপ্রেজেন্টেটিভস অ্যাসোসিয়েশনের (ফারিয়া) সভাপতি সাঈদ ইসলাম ইমন জানান, জেলা শহরে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির ছয় শতাধিক প্রতিনিধি ও কর্মকর্তা মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। সারা জেলায় ব্যবহার করেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার জন। এখন অধিকাংশ মোটরসাইকেল বন্ধ। রিকশা বা অটোরিকশায় চলতে গিয়ে খরচ বেশি হচ্ছে। এখন অনেকেই উপজেলা পর্যায়ে যেতে পারছেন না। কেবল শহরে কাজ করছেন। এর ফলে ওষুধ বিপণনে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জে ভৈরব থেকে আশুগঞ্জে তিন শতাধিক মোটরসাইকেল ভাড়ায় চলে। ভৈরবে ফিলিং স্টেশন রয়েছে তিনটি। প্রতিদিনই কোনো না কোনো পাম্প বন্ধ থাকে। ফলে অনেক চালক বাইক রাস্তায় বের করতে পারছেন না।
একই অবস্থা নাটোরেও। জেলা ফারিয়ার সাধারণ সম্পাদক মিলন আলী বলেন, নাটোর শহরে বিভিন্ন কোম্পানির ৩০০ প্রতিনিধি। জেলায় আছেন আরও ৭০০ জনের মতো। জ্বালানি সংকটের এই সময়ে প্রত্যেকেই ভুগছেন। তেল ঠিকমতো না পেলে চাকরি নিয়ে অনেকে বিপাকে পড়বেন।
ময়মনসিংহে নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত বাইক দেড় লক্ষাধিক। এর মধ্যে ২০ থেকে ২৫ হাজার বাইক সরাসরি বিভিন্ন কোম্পানির পণ্য পরিবহন কিংবা ভাড়ায় চালিত হয়। এক মাস ধরে তেলের তীব্র সংকটে এই বিপুলসংখ্যক মানুষের আয় তলানিতে ঠেকেছে।
জেলা প্রশাসনের সরবরাহ ও চাহিদা-সংক্রান্ত তথ্যে দেখা যায়, মার্চ মাসের শেষ দুই সপ্তাহে ময়মনসিংহে অকটেনের চাহিদা ছিল তিন লাখ ৮০ হাজার ৯০০ লিটার, বিপরীতে মজুত মাত্র ৩৪ হাজার ১৭১ লিটার। ছয় লাখ ১২ হাজার ৮০০ লিটার পেট্রোলের চাহিদার বিপরীতে মজুত ৬৭ হাজার ৩৪৫ লিটার। ২৬ লাখ ১০ হাজার ৯০০ লিটার ডিজেলের চাহিদার বিপরীতে মজুত দুই লাখ ৮৫ হাজার ৬৬৫ লিটার। অর্থাৎ, চাহিদার তুলনায় মজুতের পরিমাণ বর্তমানে ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
রংপুরে শুধু বাইকাররা নন, শহরের সার্ভিসিং সেন্টারগুলোও বিপাকে পড়েছে। শহরের জি এল রায় রোডের বাবু মোটরসাইকেল সার্ভিসিং সেন্টারের কর্মচারী আহাদ আলী বলেন, তিন বছর ধরে এখানে কাজ করছি। প্রতিদিন পাওয়া ৩০০ টাকা হাজিরায় আমার অসুস্থ মাসহ তিন ভাইবোনের সংসার চলে। ঈদের পর থেকে মোটরসাইকেলও নেই, কাজও নেই। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে। সার্ভিসিং সেন্টারের মালিক মাহবুবার রহমান বাবু বলেন, প্রতিদিন গড়ে এখানে ১৫টি মোটরসাইকেল সার্ভিসিংয়ের কাজ হতো। এখন সারাদিনে একটি বাইকও আসছে না। কেরানিপাড়া চৌরাস্তা এলাকার একটি সার্ভিসিং সেন্টারের মালিক সাজু মুনশি বলেন, সরাদিনেও একটি মোটরসাইকেলের কাজ মেলে না। বাধ্য হয়ে কর্মচারীদের বিদায় করতে হয়েছে। রংপুর মোটরসাইকেল ওয়ার্কশপ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহুরুল ইসলাম জানান, শহরেই অন্তত চার শতাধিক সার্ভিসিং সেন্টার রয়েছে। কর্মচারী প্রায় এক হাজার ৫০০ জন। কাজ না থাকায় এখন অনেকেই চাকরি হারাচ্ছেন।





