নিষেধাজ্ঞার আগেই দেশ ছাড়েন তিন পরিচালক

0
8

আদালতের নির্র্দেশনা নিয়ে দেশ ত্যাগের নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগেই দেশ ছাড়েন ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া ‘টেক্সটাইল টাইকুন’ নোমান গ্রুপের তিন পরিচালক। ২৭ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এ প্রতিষ্ঠানের নানা ছুঁতোয় এক এক করে দেশ ছাড়েন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকগণ। যখনই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতির রেকর্ডপত্র সংগ্রহ শুরু করে-পরিস্থিতি আন্দাজ করে নানা কারণ দেখিয়ে দেশ ছাড়েন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকরা। তবে গত ২১ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে দুদক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় পালাতে পারেননি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. নূরুল ইসলাম। তিনি এখনো সস্ত্রীক দেশে রয়েছেন বলে জানা গেছে। তথ্য নির্ভরযোগ্য সূত্রের।

সূত্রটি আরো জানায়, নোমান গ্রুপের কয়েকজন পরিচালক পালিয়ে যাওয়ার পর দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা দেয় দুদক। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নোমান গ্রুপের অন্ততঃ ৭ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ অনুসন্ধান করছে সংস্থাটি। বর্তমান পর্যায়ে আদালতের নির্দেশনা নিয়ে গত ২১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. নূরুল ইসলামের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। কিন্তু এর আগেই গত ২০ অক্টোবর রাতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম রফিকুল ইসলাম নোমান কঠোর গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে দেশত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, সউদী আরব কিংবা থাইল্যান্ডের মতো যেকোনো দেশে থাকতে পারেন বলে জানাগেছে। কথিত এই ‘গ্রুপ কোম্পানি’ নামের পারিবারিক প্রতিষ্ঠানটির মালিকগণ এতোটাই ধুরন্ধর যে, দুদক এবং গোয়েন্দা নজরদারি এড়াতে পৃথক গন্তব্যে ভিন্ন ভিন্ন তারিখে দেশ ছাড়ার কৌশল নেন। এর মধ্যে সবার আগে দেশ ছাড়েন সর্বকনিষ্ঠ পরিচালক আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ হোসাইন। সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে ডেলিভারি করানোর কথা বলে গত ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি ব্যাংককের উদ্দেশে দেশ ছাড়েন। তিনি গ্রুপভুক্ত ‘সাদ টেক্সটাইল প্রসেসিং লি:’ এবং ‘নাইস ফেব্রিক প্রসেসিং লি:’ নামক দু’টি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। প্রতিষ্ঠান দু’টি জালিয়াতির মাধ্যমে ২শ’ ৬০ কোটি টাকা ঋণ নেয় ট্রাস্ট ব্যাংক থেকে। পরে সেই ঋণ জনতা ব্যাংক লি:কে দিয়ে অধিগ্রহণ করায়। সাদের আরেক প্রতিষ্ঠান ‘নোমান স্পিনিং মিলস লি:’ প্রথমে ডাচ-বাংলা ব্যাংক থেকে ১৫০ কোটি ঋণ নেয়। পরে রূপালী ব্যাংককে দিয়ে ৩০৮ কোটি টাকায় অধিগ্রহণ করায়। সাদে মা নূর-ই-ইয়াসমিন ফাতিমার নামে রয়েছে ‘নাইস ডেনিম লি:’সহ অন্ততঃ ৯টি প্রতিষ্ঠান। সবগুলোর বিপরীতেই রয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ। পুত্রবধূর সন্তান ডেলিভারির সময় ‘পাশে থাকা’র কথা বলে চলতি মাসের মাঝামাঝি থাইল্যান্ডের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন নূর-ই-ইয়াসমিন ফাতিমা। বর্তমানে নোমান গ্রুপের তিন পরিচালকই দেশের বাইরে রয়েছেন। দেশে আছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. নূরুল ইসলাম, ভাইস চেয়ারম্যান সৈয়দা সুফিয়া খাতুন, পরিচালক আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ জাবের, আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ জোবায়ের এবং আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তালহা। আব্দুল কুদ্দুস, মাসুদ, মুরাদুল ইসলাম, শহীদুল্লাহ চৌধুরী ও আব্দুল কাসেমসহ কয়েকজন বেতনভুক্ত কর্মচারীকে প্রতিষ্ঠানের ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালক’ কখনো ‘পরিচালক’ সাজিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা ঋণ নেন। কথিত এসব এমডি-পরিচালকগণ এখনো দেশত্যাগ করতে পারেননি।

সূত্রটি জানায়, জুলাই-আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমাতে তথা শেখ হাসিনা তার ফ্যাসিজম টিকিয়ে রাখতে বিপুল অর্থ ছড়ান। আর এ অর্থের যোগান দেন তার শাসনামলের অবৈধ সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী শ্রেণি। এদের অন্যতম মো: নূরুল ইসলাম। হাসিনা উৎখাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন শেখ হাসিনা নূরুল ইসলামের গুলশানস্থ বাসায় বিশেষ দূত পাঠান। নূরুল ইসলাম হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে ওই দূতের মাধ্যমে ৭০ কোটি টাকা দেন। যদিও শেষ পর্যন্ত ওই অর্থ কোনো কাজে আসেনি। ছাত্র-জনতার অভূত অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট ভারত পালিয়ে যান হাসিনা।

এ ঘটনায় অনেকের মতোই হতভম্ব হয়ে পড়ে ‘টেক্সটাইল টাইকুন’খ্যাত নোমান গ্রুপ। নূরুল ইসলাম বুঝতে পারেন, অচিরেই নাড়া পড়তে পারে তার অবিশ্বাস্য ঋণ জালিয়াতির ঘটনায়। তিনি রাতারাতি পরিবারের সদস্যদের এক এক করে পাঠিয়ে দেন দেশের বাইরে। প্রথমে সস্ত্রীক দেশ ত্যাগ করেন নূরুল ইসলামের নাতি আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ হোসাইন, পরে বড় ছেলে এসএম রফিকুল ইসলাম নোমান এবং সর্বশেষ দেশ ছাড়েন বড় মেয়ে নূর-ই-ইয়াসমিন ফাতিমা। এখন তিনি সুযোগ খুঁজছেন স্ত্রী সৈয়দা সুফিয়া খাতুনসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে দেশ ছাড়ার। কিন্তু এরই মধ্যে আদালতের নির্দেশক্রমে নূরুল ইসলামের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয় দুদক। যদিও রহস্যজনক কারণে নিষেধাজ্ঞা আওতার বাইরে রাখা হয় গ্রুপ অব কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান সৈয়দা সুফিয়া খাতুন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম রফিকুল ইসলাম নোমান, পরিচালক নূর-ই-ইয়াসমিন ফাতিমা, আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ জাবের, আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ জোবায়ের, আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তালহা এবং পরিচালক আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ হোসাইনকে। অথচ এদের প্রত্যেকের নামে প্রতিষ্ঠান খুলে নূরুল ইসলাম বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে দুদক মহাপরিচালক ও মুখপাত্র মো. আকতার হোসেন বলেছে, যারা বিগত আ’লীগ সরকার আমলে অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নেয়ার সঙ্গে জড়িত তাদের কাউকেই ছাড় দেয়ার কোনো সুযোগ আইনে নেই।

উল্লেখ্য, ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির অভিযোগটির অনুসন্ধান করছেন দুদকের সহকারী পরিচালক মো.সহিদুর রহমান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here