কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আশা ভোঁসলেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানাচ্ছে ভারত। সোমবার (১৩ এপ্রিল) মুম্বাইয়ের লোয়ার পারেলে তার নিজ বাসভবন ‘কাসা গ্র্যান্ডে’তে শিল্পীর মরদেহ রাখা হয়। সেখানে প্রিয় শিল্পীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হন তার পরিবার, সহকর্মী ও অগণিত অনুরাগী। বিকেলে মুম্বাইয়ের শিবাজী পার্কে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
সকাল থেকেই আশা ভোঁসলের বাসভবনে ভিড় করেন শোবিজ ও রাজনীতির মাঠের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীস সেখানে উপস্থিত হয়ে শিল্পীর মরদেহে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান। কিংবদন্তি এই শিল্পীকে সম্মান জানিয়ে তার মরদেহ জাতীয় পতাকায় মুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদর্শন করা হয়।
ভারতীয় সময় দুপুর ২টা পর্যন্ত মরদেহ সেখানে রাখা হবে। এ সময় বলিউডের তারকা রিতেশ দেশমুখ, টাবুসহ বিভিন্ন তারকারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সপরিবারে শ্রদ্ধা জানাতে যান ক্রিকেট কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকারও।
গত শনিবার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে আশা ভোঁসলেকে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার অসুস্থতার খবরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ সারা বিশ্বের ভক্তরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে রোববার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। হাসপাতালের চিকিৎসক ড. প্রতীত সমদানি জানান, বার্ধক্যজনিত কারণে শরীরের একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়ার (মাল্টি অর্গান ফেলিওর) ফলে তার মৃত্যু হয়েছে।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে কয়েক হাজার গানে কণ্ঠ দেওয়া এই শিল্পী ভারতীয় সংগীতের অন্যতম নক্ষত্র। ২০০৮ সালে তিনি ‘পদ্মভূষণ’ এবং সংগীতে ভারতের সর্বোচ্চ সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কারে ভূষিত হন। এছাড়া প্রথম ভারতীয় নারী শিল্পী হিসেবে ১৯৯৭ সালে তিনি বিশ্বখ্যাত ‘গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড’-এর জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। তার প্রয়াণে বিশ্ব সংগীতে একটি যুগের অবসান ঘটল।
এদিকে, সুরের জগতে যার অবদান অমূল্য, তার বাইরেও নিজের পরিশ্রমে এক বিশাল আর্থিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন সদ্যপ্রয়াত ভারতীয় কিংবদন্তি শিল্পী আশা ভোঁসলে। ৯২ বছর বয়সে এই সুরসম্রাজ্ঞীর জীবনাবসানের পর বিশ্বজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তবে ব্যক্তিগত জীবনে তিন সন্তানের মধ্যে দুই সন্তানকে আগেই হারিয়েছিলেন তিনি। ফলে তার রেখে যাওয়া কয়েকশ কোটি টাকার বিপুল সম্পদের উত্তরাধিকার কে হতে যাচ্ছেন; তা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা।
পারিবারিক ও সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, মৃত্যুকালে আশা ভোঁসলে প্রায় আনুমানিক কয়েকশ কোটি টাকার সম্পত্তি রেখে গেছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী তার সম্পদের পরিমাণ ২০০ থেকে ২৫০ কোটি রুপি (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৭০ থেকে ৩৪০ কোটি টাকা)। তবে কিছু গণমাধ্যমে তার সম্পদের পরিমাণ ৮০ থেকে ১০০ কোটি রুপি (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১১০ থেকে ১৩৫ কোটি টাকা) বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
বলা হচ্ছে, এই বিপুল সম্পদ গড়ে উঠেছে মূলত তার দীর্ঘ সংগীতজীবন, লাইভ পারফরম্যান্স, আন্তর্জাতিক শো এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগের মাধ্যমে। ২০টিরও বেশি ভাষায় ১২ হাজারেরও বেশি গান গেয়ে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নাম লেখানো এই শিল্পী আয়ের একটি বড় অংশ পেতেন গানের রয়্যালটি থেকে। এছাড়া দেশ-বিদেশের বিভিন্ন লাইভ শো ও ডিজিটাল স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম থেকেও তার নিয়মিত আয় হতো।
আশা ভোঁসলের আর্থিক সাফল্যের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগ। জানা যায়, মুম্বাই ও পুনেসহ একাধিক শহরে তার বিলাসবহুল সম্পত্তি আছে। সম্পত্তির তালিকায় ছিল অভিজাত আবাসন ও বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট। পাশাপাশি ব্যবসার ক্ষেত্রেও নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। ২০০২ সালে দুবাইয়ে শুরু হওয়া তার রেস্তোরাঁ চেইন ‘আশা’জ’ বর্তমানে কুয়েত, বাহরাইন ও যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম ও ম্যানচেস্টারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শহরে ছড়িয়ে পড়েছে।
বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত এই শিল্পী মুক্তা ও হীরা এবং নামী ব্র্যান্ডের গাড়ির শৌখিন ছিলেন। তার সংগ্রহে অডিসহ একাধিক দামি গাড়ি ছিল। তবে ব্যক্তিগত জীবনের ট্র্যাজেডি তাকে বারবার সইতে হয়েছে। ২০১২ সালে তার মেয়ে বর্ষা আত্মহত্যা করেন এবং ২০১৫ সালে বড় ছেলে হেমন্ত ক্যানসারে মারা যান। দুই সন্তান হারানোর পর তার একমাত্র জীবিত ছেলে আনন্দ ভোঁসলে এবং আশার নাতি-নাতনিরাই এখন এই বিশাল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হচ্ছেন।
দাদাসাহেব ফালকে ও পদ্মবিভূষণের মতো সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত এই শিল্পী শুধু সম্পদ নয়, রেখে গেছেন তার অমর কণ্ঠের অমূল্য উত্তরাধিকার। অর্জিত সম্পদের একটি বড় অংশ তিনি নিয়মিত সমাজসেবা ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতেন বলেও জানা গেছে।



