মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী অং সান সু চিকে কারাবন্দি থেকে গৃহবন্দির মর্যাদায় উন্নীত করা হয়েছে। বর্তমানে দেশটির সেনাবাহিনীর দ্বারা নির্ধারিত (ডেজিগনেটেড) একটি বাড়িতে গৃহবন্দি অবস্থায় আছন সু চি।
গতকাল শুক্রবার মিয়ানমারের সেনাপ্রধান ও প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লেইংয়ের দপ্তর থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে এ তথ্য। বলা হয়েছে, “সু চির সাজা কমিয়ে তাকে একটি নির্ধারিত বাড়িতে পাঠানো হয়েছে।”
মিয়ানমারের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন চ্যানেল সু চির একটি ছবিও প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, সামরিক ইউনিফরম পরা দুই ব্যক্তির সঙ্গে বসে আছেন সু চি।
এদিকে সু চির ছেলে কিম অ্যারিস বলেছেন, মিয়ানমারের সামরিক শাসকের এই ঘোষণা নিয়ে তিনি সন্দিহান; এমনকি তার মা যে বেঁচে আছেন— এমন কোনো প্রমাণ বার বার চেয়েও সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে পাননি বলে অভিযোগ করেছেন।
যে ছবিটি মিয়ানমারের রাষ্ট্রায়ত্ব টেলিভিশন চ্যানেলে প্রকাশিত হয়েছে— সেটিকেও ‘অর্থহীন’ উল্লেখ করে কিম দাবি করেছেন, ২০২২ সালে ছবিটি তোলা হয়েছিল।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কিম বলেছেন, “আমি আশা করছি যে এই খবর সত্যি। তবে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছি না, কারণ এখন পর্যন্ত তাকে স্থানান্তর করার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আমি পাইনি।”
“তাই যতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে তার সঙ্গে কথা বলা কিংবা যোগাযোগ কার অনুমতি না দেওয়া হচ্ছে, অথবা কেউ নিরপেক্ষভাবে তার অবস্থা ও বর্তমন অবস্থানের তথ্য যাচাই করতে না পারছে, আমি কিছুই বিশ্বাস করছি না।”
উল্লেখ্য, মিন অং হ্লেইংয়ের দপ্তর থেকে দেওয়া বিবৃতিতে সু চি স্থানান্তরের ব্যাপরে উল্লেখ থাকলেও তার স্বাস্থ্যগত অবস্থা সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। বিবিসিকে কিম জানিয়েছেন, গত দু বছরের ধরে তিনি তার মায়ের কোনো খোঁজ-খবর পাচ্ছেন না।
সু চিকে স্থানান্তরের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য জানতে তার আইনজীবী টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স। কিন্তু আইনজীবী দলের সদস্যর জানিয়েছেন, সু চিকে গৃহবন্দি করার ব্যাপারে তারা সরাসরি কোনো খবর পাননি।
তারা আরও জানিয়েছেন, গত প্রায় ৩ বছর ধরে সু চির সঙ্গে সাক্ষাৎও করতে পারেননি তারা। যোগাযোগ কিংবা কথাবার্তা যা হয়েছে— সবই ঘটেছে সামরিক বাহিনীর উপস্থিতিতে ভিডিও কলের মাধ্যমে।
তবে সু চির সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অস্ট্রেলীয় নাগরিক সিন টার্নেল বলেছেন, যদিও যথেষ্ট সন্দেহ আছে— তবুও তার মনে হচ্ছে এই সংবাদ সত্য।
২০২০ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সু চির নেতৃত্বাধীন সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লেইং এ অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
অভ্যুত্থানের পরপরই গ্রেপ্তার করা হয় সু চি এবং তার দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) সরকারের মন্ত্রী-এমপিসহ দলটির শীর্ষ ও মধ্যম সারির হাজার হাজার নেতাকর্মীকে। সিন টার্নেলকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে ২০২২ সালের শেষ দিকে মুক্তি পান তিনি।
গ্রেপ্তারের পর তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছিল। সেসব অভিযোগের বিচার হয়েছিল সামরিক আদালতে। সেই বিচারে সু চিকে ৩৩ বছরের সাজা দেওয়া হয়েছিল। তবে সম্প্রতি মিয়ানমারের সরকার জানিয়েছে— সু চির কারাবাসের মেয়াদ কমানো হয়েছে।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টার্নেল বলেন, “আমাকে এবং অং সান সু চিকে একই কারাগারে রাখা হয়েছিল। সেটি ছিল একটি সামরিক কারাগার এবং খুব সম্ভবত নেইপিদো (মিয়ানমারের রাজধানী)-তেই ছিল কারাগারটির অবস্থান। সেই কারাগারের অবস্থা ছিল ‘মধ্যযুগীয়’ এবং ‘সত্যিই খুব ভয়াবহ’। তিনি আরও বলেছিলেন, কারাগারের খাবার ও চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল ‘খারাপ’ এবং সেলগুলো ছিল ‘যাচ্ছেতাই’।
“সু চির বয়স বর্তমানে ৮০ বছর। কারাগারের যে পরিস্থিতি ছিল, তা ছিল এই বয়সী যে কোনো মানুষলে জন্য ভয়ঙ্কর।”
“যদিও আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে, তবু আমার মনে হচ্ছে সু চিকে কারাগার থেকে বাসগৃহে স্থানান্তরের তথ্য বিশ্বাস করা যেতে পারে। কারণ মিয়ানমারের জনগণের কাছে সু চি শুধুমাত্র একজন রাজনৈতিক নেত্রীই নন, একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিও। যদি সামরিক বাহিনীর অযত্নের কারণে সু চির কোনো গুরুতর ক্ষতি হয়— তাহলে পুরো মিয়ানমারে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। আমি আশা করছি যে শিগগিরই তিনি মুক্তি পাবেন।
সূত্র : বিবিসি।





