দেশের মাধ্যমিক স্তরের ‘ইতিহাস’ ও ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ (বিজিএস) বইয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। ২০২৭ সালের শিক্ষাবর্ষকে সামনে রেখে এই পরিমার্জন করা হচ্ছে। এতে প্রথমবারের মতো বিশদভাবে যুক্ত হচ্ছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯০-পরবর্তী রাজনৈতিক ভূমিকা। বিশেষ করে, ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে তার রাজনৈতিক অবদান এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের ইতিহাস শিক্ষার্থীরা বইয়ে পড়তে পারবে।
নতুন ধারাবাহিকতায় পাঠ্যবইয়ে স্থান পাচ্ছে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ‘বিপ্লব ও সংহতি দিবস’-এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। এছাড়া, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ, পটভূমি এবং এর প্রভাবকেও নতুন বইয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এনসিটিবি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন প্রজন্মকে দেশের প্রকৃত ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেই এই সংস্কার।
তাদের মতে, পাঠ্যসূচিতে দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত, আংশিকভাবে উপস্থাপিত কিংবা বিতর্কিত ঐতিহাসিক অধ্যায়গুলোকে নতুনভাবে মূল্যায়নের উদ্যোগ নিয়েছে এনসিটিবি। নতুন প্রজন্মকে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা সম্পর্কে আরও বস্তুনিষ্ঠ ও পূর্ণাঙ্গ ধারণা দিতেই এই পরিমার্জন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এই সংস্কারের অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সাবেক বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভূমিকা পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা। বিশেষ করে তাকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে যে রাজনৈতিক পরিচয়ে দেশে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেই অধ্যায়টি নতুন বইয়ে আলাদা অংশ হিসেবে স্থান পাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন, সংসদীয় গণতন্ত্রে উত্তরণ এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিভিন্ন পর্যায়ে তার ভূমিকা নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এ সংক্রান্ত বিষয়বস্তু প্রণয়ন ও সম্পাদনার কাজ চলমান রয়েছে।
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রচলিত ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ (বিজিএস) বইয়ে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। শিক্ষার্থীরা যেন প্রাচীন বাংলা থেকে আধুনিক বাংলাদেশ পর্যন্ত একটি নিরবচ্ছিন্ন ঐতিহাসিক ধারার সঙ্গে পরিচিত হতে পারে, সেই লক্ষ্যেই বইটিতে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বিশেষ করে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন পাঠ্যবইয়ে নতুন বিষয়বস্তু সংযোজন, ভাষা পরিমার্জন এবং অধ্যায়গুলোর পুনর্বিন্যাস করা হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে থাকছে একটি বিশেষ অধ্যায়, যেখানে ১০ থেকে ১২ জন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের জীবনী, কর্ম এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক অবদান তুলে ধরা হবে। প্রাচীন বাংলার পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট গোপাল থেকে শুরু করে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া, সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীসহ আরও কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের অবদানও নতুন বইয়ে স্থান পাবে।
এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ‘লার্নিং জয়’ বা আনন্দময় শিক্ষার ধারণাকে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সরকারের নির্দেশনায় এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা মুখস্থনির্ভর চাপের মধ্যে না থেকে আনন্দের সঙ্গে শিখতে পারবে। টিচার্স গাইড, কারিকুলাম, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং পাঠ উপস্থাপনেও সেই অনুযায়ী পরিবর্তন আনার চিন্তা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে বইয়ের ভাষা আরও প্রাঞ্জল ও বাস্তবধর্মী করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, এই সংস্কারের মাধ্যমে পাঠ্যবই থেকে অপ্রাসঙ্গিক ও অপ্রয়োজনীয় অনেক বিষয় বাদ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাসের যেসব অধ্যায় নিয়ে বিতর্ক বা বিকৃতির অভিযোগ ছিল, সেগুলোও নতুনভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ কে এম মাসুদুল হক বলেন, বর্তমানে পাঠ্যবই পরিমার্জনের কাজ পুরোদমে চলছে। মাধ্যমিক পর্যায়ের ‘ইতিহাস’ এবং ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হলো ডিসেম্বরের মধ্যেই পরিমার্জিত এই বইগুলোর কাজ সম্পন্ন করা, যাতে শিক্ষার্থীরা জানুয়ারিতেই নতুন বই হাতে পেয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় শিক্ষাকে শিক্ষার্থীদের কাছে আরও আনন্দময় ও সহজবোধ্য করতে ‘লার্নিং জয়’ বা আনন্দময় শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে কাজ চলছে। একই সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের অপ্রয়োজনীয় কাঠিন্য কমিয়ে সেগুলোকে এমনভাবে সাজানো হচ্ছে, যেন শিক্ষার্থীরা পড়ার চাপে পিষ্ট না হয়ে আনন্দের সঙ্গে শিখতে পারে।



