বীমা দাবি নিষ্পত্তি নিয়ে ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্সের টালবাহানা

0
6

বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় নেয়াসহ বহুবিধ অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধে। দাবি ব্যবস্থাপনা, কর সংরক্ষণ, সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণ, তহবিল নিরীক্ষা এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় একাধিক গুরুতর দুর্বলতা রয়েছে ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্সের বলে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য বীমা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রাপ্য ও প্রদেয় অর্থের হিসাব নিয়েও গরমিল রয়েছে।২০২৬ সালের (জানুয়ারি-মার্চ) প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানিটির কাছে গ্রাহকের মোট বীমা দাবির পরিমাণ ছিল ৭ কোটি ২৫ লাখ এবং বীমা দাবি পরিশোধ করেছে ৪ কোটি টাকা। এখনো গ্রাহকের পাওনা ৩ কোটি টাকার বেশি।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সাধারণ বীমা কোম্পানি ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড ব্যবসায় ঠিকই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখছে। তারপরও গ্রাহকের বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা বাস্তবায়নে উদাসীনতার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। খাত সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শক্তিশালী পরিচালক ও প্রভাবশালী শেয়ারহোল্ডারদের ছত্রছায়ায় প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম করেও কার্যকর জবাবদিহির বাইরে থেকে যাচ্ছে।

শুধু নিরীক্ষা প্রতিবেদন নয়, একাধিক গ্রাহকের দাবি—প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র জমা দেওয়ার পরও মাসের পর মাস তাদের ক্ষতিপূরণ আটকে রাখা হয়। কেউ কেউ বছরের পর বছর কোম্পানির কার্যালয়ে ঘুরেও অর্থ পাননি। অনেক ক্ষেত্রে নতুন নতুন কাগজপত্র চাওয়া, তদন্তের অজুহাত কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার কথা বলে দাবি নিষ্পত্তি বিলম্বিত করা হচ্ছে।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি বীমা প্রতিষ্ঠানের প্রতি গ্রাহকের আস্থার সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে দাবি পরিশোধ। অথচ ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স নতুন ব্যবসা সংগ্রহ, প্রিমিয়াম আয় এবং করপোরেট গ্রাহক ধরে রাখতে সক্ষম হলেও দাবি নিষ্পত্তিতে ধীরগতির কারণে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি গ্রাহকদের আস্থা কমছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কোম্পানির আয়কর ও স্থগিত কর সংরক্ষণ আন্তর্জাতিক হিসাবমান আইবাস-১২ অনুযায়ী হয়নি। কর সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয় যাচাইয়ে অসংগতি পাওয়া গেছে। পাশাপাশি কোম্পানির বিভিন্ন কর নির্ধারণ দীর্ঘদিন ধরে নিষ্পত্তিহীন বা আপিলাধীন থাকায় সম্ভাব্য অতিরিক্ত কর-দায়ের পরিমাণও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

প্রতিবেদনে নিরীক্ষক উল্লেখ করেছেন, আইবাস-৩৭ অনুযায়ী বিভিন্ন ব্যয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ করা হয়নি। ফলে কোম্পানির প্রকৃত দায় ও আর্থিক অবস্থার সঠিক চিত্র আর্থিক বিবরণীতে প্রতিফলিত হয়েছে কি না, সে প্রশ্নও তৈরি হয়েছে।

প্রিমিয়াম ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যবহৃত সফটওয়্যারের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণেও গুরুতর দুর্বলতা পাওয়া গেছে। নিরীক্ষক জানিয়েছেন, কোম্পানি যে সিস্টেম জেনারেটেড তথ্য সরবরাহ করেছে, সেখানে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও তথ্য প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ত্রুটি রয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, কোম্পানির প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি ফান্ড এবং শ্রমিকদের মুনাফায় অংশগ্রহণ তহবিলের (ডব্লিইউপিপিএফ) আইনানুগ নিরীক্ষা সম্পন্ন হয়নি ২০২১ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত টানা পাঁচ অর্থবছর। শ্রম আইন ও সুশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিরিক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা ইপিজেডে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আর এন এন্টারপ্রাইজ ২০১৯ সালের ৮ এপ্রিল অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অগ্নিকাণ্ডে কোম্পানির মোট ক্ষতির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৬১২ কোটি ৩২ লাখ ৮১ হাজার ৯৮৯ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ ও মজুত হিসাবে শার্প কোম্পানি ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্সের কাছে ১৩২ কোটি ৪৬ লাখ ৬ হাজার ১৩৬ টাকার বীমা সুরক্ষার আওতায় ছিল। শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ তাদের কাছে ৩০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে। ২০২৫ সাল ৩০ জুন পর্যন্ত শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ তাদের আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে গত সাত বছরে বীমার ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা পেয়েছে বলে জানিয়েছে। নানা চাতুরতার আশ্রয় নিয়ে ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স বীমা দাবি নিষ্পত্তি ঠেকিয়ে রেখেছে বলে দাবি শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের।

বীমা খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরীক্ষকের এসব পর্যবেক্ষণ শুধু হিসাবগত দুর্বলতা নয়; বরং করপোরেট সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বড় ধরনের সংকেত। দাবি নিষ্পত্তিতে দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি এবং আর্থিক প্রতিবেদনে অসংগতি—সব মিলিয়ে কোম্পানির পরিচালন ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) দীর্ঘদিন ধরে সময়মতো দাবি নিষ্পত্তি ও সুশাসন নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিলেও ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্সে তার কোনোটাই আমলে নেয়নি। কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে থাকা প্রভাবশালী পরিচালক ও বড় শেয়ারহোল্ডারদের কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকিও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

আইডিআরএর মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগ কাজ করছে। কোনো বীমা কোম্পানি গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় আইনি দিক দেখে ব্যবস্থা নেবে।’

বীমা দাবি পরিশোধে কেন এত ধীর গতি—জানতে চাইলে ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্সের কোম্পানি সচিব শাফকাত মওলা প্রতিবেদককে বলেন, সব অভিযোগ মিথ্যা। আমরা সঠিক নিয়ম মেনেই কাজ করছি। প্রতিবেদন ভূয়া।

তবে খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে আসা অনিয়ম ও গ্রাহকদের অভিযোগ বিবেচনায় নিয়ে কোম্পানিটির কার্যক্রমে আইডিআরএর আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। না হলে পুরো সাধারণ বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট দেখা দেবে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) দেওয়া তথ্যমতে, কোম্পানিটি ২০২২ সালের পর থেকে দ্বিগুণ লাভে রয়েছে। সবশেষ ২০২৪ সালে কোম্পানিটি ৯ কোটি ৩ লাখ টাকা লাভ করেছে। এর আগে ২০২৩ সালে ৮ কোটি ৭৬ লাখ টাকা এবং ২০২২ সালে কোম্পানিটি ৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা লাভ করেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here