ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জবাবদিহির দাবিতে সোমবার (২০ জুলাই) পার্লামেন্ট অভিমুখে মিছিলের ডাক দিয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। এই কর্মসূচিকে ঘিরে রাজধানী দিল্লিতে হাজারো শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সমাজকর্মী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা জড়ো হয়েছেন। খবর বিবিসির
মিছিলকে কেন্দ্র করে দিল্লির ঐতিহাসিক ‘যন্তর মন্তর’ এলাকায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেখানে কয়েকশ পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে এবং যন্তর মন্তরের আশপাশের সড়ক যান চলাচলের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে যানবাহনে তল্লাশিও চালানো হচ্ছে।
শনিবার আন্দোলনের সমর্থনে ২১ দিন ধরে অনশনরত শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে জোরপূর্বক হাসপাতালে নেওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে তিনি হাসপাতালেও অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন।
দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, পার্লামেন্ট অভিমুখে মিছিলের কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। তবে সিজেপির এক মুখপাত্র বিবিসিকে বলেছেন, অনুমতি না থাকলেও কর্মসূচি পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে নেওয়া হবে।
গত মে মাসে অভিজিৎ দীপকের উদ্যোগে অনলাইনে ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন হিসেবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র সূচনা হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁস ও বিভিন্ন পরীক্ষায় অনিয়মের প্রতিবাদ থেকেই এই প্ল্যাটফর্ম দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। আন্দোলনকারীরা শুরু থেকেই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে আসছেন।
তবে ধর্মেন্দ্র প্রধান আন্দোলনকারীদের ‘বিশৃঙ্খলাকারীদের বি-টিম’ বলে আখ্যা দিয়ে তাদের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারও এখন পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসেনি।
এদিকে সোমবার সকাল থেকেই যন্তর মন্তরে বৃষ্টির মধ্যেও আন্দোলনকারীদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। অনেকে জাতীয় পতাকা বহন করছেন, আবার কেউ শান্তির প্রতীক হিসেবে হাতে প্লাস্টিকের গোলাপ নিয়ে অংশ দিয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিচ্ছেন তারা।
এদিকে সোনম ওয়াংচুককে হাসপাতালে নেওয়ার প্রতিবাদে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকও অনশন শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন। যন্তর মন্তরের মঞ্চে তিনি এক হাতে ভারতের জাতীয় পতাকা এবং অন্য হাতে সংবিধান নিয়ে উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ করে বলেন, এটি সিজেপির ‘প্রথম বিজয়’।
তিনি দাবি জানান, ওয়াংচুককে হাসপাতাল থেকে মুক্তি দিয়ে মিছিলে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি অ্যাংমোও এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
ওয়াংচুক জানিয়েছেন, সরকার সাম্প্রতিক শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতার দায় স্বীকার করলে, অথবা তিনি ও সিজেপির নেতৃত্ব পার্লামেন্টে পৌঁছে সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে বিষয়টি উত্থাপনের আশ্বাস পেলে, কিংবা সংসদ সদস্যরা হাসপাতালে গিয়ে একই প্রতিশ্রুতি দিলে তিনি অনশন ভাঙবেন।
দিল্লির পাশাপাশি দেশের আরও কয়েকটি শহরেও বিক্ষোভ হয়েছে। রোববার মুম্বাইয়ে বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় এবং সোমবারও সেখানে কর্মসূচি রয়েছে। বেঙ্গালুরু ও হায়দরাবাদেও আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভ করেছেন।
দিল্লির তীব্র গরমের মধ্যেও ওয়াংচুকের অনশন দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। তিনি গত ২১ দিন ধরে শুধু লবণ ও পানি গ্রহণ করে অনশন চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এতে তার ওজন ৯ কেজির বেশি কমে যায়। শারীরিক দুর্বলতা সত্ত্বেও পার্লামেন্ট অভিমুখে মিছিলে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
কিন্তু শনিবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৭টার দিকে কয়েক ডজন পুলিশ সদস্য বিছানার চাদর দিয়ে তাকে আড়াল করে মঞ্চ থেকে সরিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যান। ঘটনাটি ঘিরে আন্দোলনকারীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
সিজেপির আন্দোলনের মূল ইস্যু হলো প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বাতিলের ঘটনা। গত মে মাসের শুরুতে মেডিকেল শিক্ষায় ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে প্রায় ২২ লাখ ৮০ হাজার পরীক্ষার্থীর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বাতিল করা হয়। পরে ২১ জুন পুনঃপরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন বলে তাদের পরিবারের দাবি।
শনিবারের ঘটনার পর আন্দোলন আরও জোরদার করে সিজেপি। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক বলেন, এতদিন তারা শুধু শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করছিলেন। কিন্তু ওয়াংচুককে জোর করে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনার পর তারা এখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগও দাবি করছেন।





