সদ্য সমাপ্ত ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সাতটি ম্যাচে সন্দেহজনক বেটিং কার্যক্রমের মাধ্যমে ম্যাচের ফল প্রভাবিত করার আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে একটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে। স্বাধীন সংস্থা কোপেনহেগেন গ্রুপের এই পর্যবেক্ষণ ফিফার দাবির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
সংস্থাটির দাবি, পুরো টুর্নামেন্টে ১০৪টি ম্যাচ পর্যবেক্ষণ করে তারা সাতটি ‘ইয়েলো অ্যালার্ট’ শনাক্ত করেছে, যার মধ্যে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের দুটি ম্যাচও রয়েছে।
ক্রীড়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গোল ডট কম জানায়, স্বাধীন আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক কোপেনহেগেন গ্রুপ, যারা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় কারসাজি পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধে কাজ করে, ২০২৬ বিশ্বকাপের ১০৪টি ম্যাচ পর্যবেক্ষণের পর সাতটি সন্দেহজনক ঘটনার বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে।
সংস্থাটির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে কাউন্সিল অব ইউরোপ এর সারসংক্ষেপ প্রকাশ করেছে।
সেই তথ্যের ভিত্তিতে দ্য অ্যাথলেটিক জানিয়েছে, টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি সন্দেহ তৈরি করা ঘটনাগুলোর মধ্যে ছিল-
প্রথমত, মেক্সিকোর বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম ম্যাচে ৮৪তম মিনিটে থেম্বা জোয়ানের লাল কার্ড। দ্বিতীয়ত, গ্রুপ পর্বে কেপ ভার্দের বিপক্ষে স্পেন জয় পাবে না- এমন পূর্বাভাসে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ক্রিপ্টোকারেন্সি নির্ভর প্রেডিকশন প্ল্যাটফর্ম পলিমার্কেটে ৪৮ লাখ ডলারের (প্রায় ৩৬ লাখ পাউন্ড) বাজি ধরা হয়। ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হয়েছিল। তৃতীয়ত, সৌদি আরবের বিপক্ষে স্পেনের ৪-০ গোলের জয়ের ম্যাচে ফেরান তোরেসের একটি গোল বাতিল করার আগে ভিএআর সিদ্ধান্ত নিতে সাড়ে তিন মিনিট সময় নেয়, যা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনকে ঘিরেও উল্লেখযোগ্য তথ্য উঠে এসেছে।
২ জুলাই, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে শেষ ৩২-এর ম্যাচে বালোগুন লাল কার্ড দেখার দিনই পলিমার্কেটে একটি নতুন বেটিং মার্কেট চালু হয়- বালোগুন কি বেলজিয়ামের বিপক্ষে খেলবেন?
কিন্তু ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি তার নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে খেলার সুযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করে ৫ জুলাই। কোপেনহেগেন গ্রুপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টুর্নামেন্টে লাল কার্ড পাওয়া অন্য ১৪ জন ফুটবলারের ক্ষেত্রে এমন কোনো বেটিং মার্কেট খোলা হয়নি এবং তাদের কারোরই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়নি।
কাউন্সিল অব ইউরোপের ম্যাকোলিন কনভেনশন-এর অধীনে পরিচালিত কোপেনহেগেন গ্রুপ জানিয়েছে, বালোগুনের ঘটনা নিয়ে লিখিত ব্যাখ্যা চেয়ে তারা ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠিয়েছে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে দ্য অ্যাথলেটিক ফিফা ও পলিমার্কেটের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
কোপেনহেগেন গ্রুপের পর্যবেক্ষণ অনেককেই বিস্মিত করেছে। কারণ, এর মাত্র একদিন আগে ফিফার ইন্টেগ্রিটি টাস্ক ফোর্স জানিয়েছিল, পুরো টুর্নামেন্টে কোনো ম্যাচেই সন্দেহজনক বেটিং বা ম্যাচ কারসাজির কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০১৯ সালে গঠিত ওই টাস্ক ফোর্সে কোপেনহেগেন গ্রুপ এবং কাউন্সিল অব ইউরোপ- উভয়ই স্বাধীন সদস্য হিসেবে রয়েছে।
যদিও এর বিপরীতে কোপেনহেগেন গ্রুপ বুধবার জানিয়েছে, তারা সাতটি ‘ইয়েলো অ্যালার্ট’ শনাক্ত করেছে। সংস্থাটির সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো ম্যাচে একাধিক অনিয়মের ইঙ্গিত, যেমন অস্বাভাবিকভাবে বেটিংয়ের অডস ওঠানামা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুঞ্জন দেখা দিলে ‘ইয়েলো অ্যালার্ট’ জারি করা হয়।
সংস্থাটির সতর্কতা ব্যবস্থায় চারটি স্তর রয়েছে-
সবুজ (Green): স্বাভাবিক
হলুদ (Yellow): নিম্নমাত্রার সতর্কতা
কমলা (Orange): উচ্চমাত্রার সতর্কতা
লাল (Red): সর্বোচ্চ ঝুঁকি
তবে এসব সতর্কতা মানেই যে ম্যাচ কারসাজি হয়েছে, এমন নয় বলে মন্তব্য করেছেন বেটিং শিল্প বিশেষজ্ঞ ক্রিশ্চিয়ান কাল্ব, যিনি অতীতে কোপেনহেগেন গ্রুপের সঙ্গে কাজ করেছেন।
দ্য অ্যাথলেটিককে তিনি বলেন, এ ধরনের অ্যালার্টের পেছনে অস্বাভাবিক অডস পরিবর্তন বা বাজারে তারল্য সামঞ্জস্য করার মতো কারণও থাকতে পারে। বিশ্বকাপে বেটিংয়ের পরিমাণ এত বিশাল যে শুধু এসব তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
তিনি আরও বলেন, মূল সমস্যা হলো স্বার্থের সংঘাত এবং অভ্যন্তরীণ তথ্য। যখন সবাই ফেভারিট দলের পক্ষে বাজি ধরে, তখন প্রচলিত বুকমেকাররা নিজেদের ঝুঁকি কমাতে পলিমার্কেটের মতো প্রেডিকশন মার্কেট ব্যবহার করতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোপেনহেগেন গ্রুপ টুর্নামেন্টে ১৫টি ম্যাচকে বিশেষ পর্যবেক্ষণে রেখেছিল, বিশেষ করে গ্রুপ পর্বের শেষ রাউন্ডে। পাশাপাশি তারা ১২টি বিতর্কিত ঘটনা বিশ্লেষণ করেছে।
সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপে মোট বেটিংয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৪০ বিলিয়ন ডলার, যা কাতার বিশ্বকাপ ২০২২-এর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
সূত্র: গোল ডট কম, দ্য অ্যাথলেটিক



