ডারউইনে ঐতিহাসিক জয়ের পর বাড়তি আত্মবিশ্বাস নিয়ে দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে ম্যাকাইতে নেমেছিল বাংলাদেশ। তবে সেই স্বস্তি স্থায়ী হলো না পুরো দুই দিনও। পাঁচ দিনের টেস্ট দ্বিতীয় দিনের আড়াই ঘণ্টা বাকি থাকতেই শেষ হয়েছে। অবশ্য প্রথমদিন ১৮ উইকেট পতনের পরই এমন শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এরপর থেকেই অস্ট্রেলিয়ার পিচ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ইনিংস ব্যবধানে তাদের জয়ের পরও সেটাই এখন আলোচনার কেন্দ্রে!
অতীতে মিরপুরে আড়াই দিনে ম্যাচ শেষ হতেই সমালোচনা শুরু হতো, ধানক্ষেত বলেও কটাক্ষ করতেন অনেকেই। এবার দেখার বিষয় অস্ট্রেলিয়ার ম্যাকাইয়ে হওয়া অভিষেক টেস্টের উইকেটকে আইসিসি কীভাবে দেখে। নিজের কন্ডিশনের সুবিধা নিতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়া যেন বুঝিয়ে দিলো– জয়ই শেষ কথা!
ম্যাকাইয়ের উইকেট নিয়ে বিসিবির একজন কিউরেটর ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘উইকেটটা তাদের সুবিধামতো ছিল। সবকিছু তাদের অনুকূলে রাখার জন্য প্রস্তুত ছিল ওই উইকেট। আমাদের পেসাররাও তো দেখিয়েছে ভালো কিছু, অস্ট্রেলিয়া দল নিজেরাও ভালো ব্যাট করতে পারেনি। যদি তারা আগে ব্যাট করত তাহলে ম্যাচের রেজাল্ট ভিন্ন হতো।’
মূলত ডারউইনের চেয়ে ম্যাকাই টেস্টে বেশি সুইং, সিম মুভমেন্ট এবং বাউন্স পেয়েছেন বোলাররা। যার প্রমাণ মিলেছে গতকাল এবং আজ। উভয় দল খেলা শুরুর দিনেই ১৮ উইকেট হারিয়েছে। আর আজ দ্বিতীয় দিনের মধ্যাহ্নভোজের বিরতির আগেই ৫ উইকেটের পতন হয়। পরের সেশন শেষ না হতেই বাকি ৫ উইকেট হারিয়ে বসে টাইগাররা। ফলে মাত্র ৭৫০ বলেই শেষ ম্যাকাই টেস্ট, যা অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত টেস্টগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন।
আইসিসি থেকে বড় সুখবর, টেস্টে ইতিহাসের সেরা র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ
অজিদের এমন উইকেট নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন বিসিবি পরিচালক সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর। এমনকি তিনি দাবি করেছেন আইসিসিকে এই টেস্ট ভেন্যুর উইকেট নিয়ে রিভিউ করতে। ঢাকা পোস্টকে এই পরিচালক বলেন, ‘প্রথম টেস্ট জয়ের পর আসলে অস্ট্রেলিয়ার টনক নড়ে গেছে। কীভাবে দ্বিতীয় টেস্ট জেতা যায়, কীভাবে জিততে হবে সেই বিষয় না, যেভাবেই হোক জয়টা চাই। তাদের কেবল চিন্তা ছিল ম্যাচটা জিততে হবে।’
সিরাজউদ্দিনের দাবি, ‘এই উইকেট নিয়ে অবশ্যই কথা উঠা উচিত। আমাদের বোর্ডও এটা বিবেচনা করবে আশা করি এবং আইসিসি অবশ্যই অবগত হবে। এই উইকেট নিয়ে তাদের রিভিউ করা উচিত বলে মনে করি। এখন বিসিবি তাদের অবগত করবে কি না এটা আসলে টোটাল বোর্ডের সিদ্ধান্ত, বিস্তারিত পরে জানা যাবে।’
অস্ট্রেলিয়া আগে ব্যাট করলে ফলাফল ভিন্ন হতে পারত বলে দাবি এই পরিচালকে, ‘পাঁচ দিনের একটা টেস্ট দেড় দিনে শেষ হয় কীভাবে? অবশ্যই রিভিউ করা উচিত, এমন উইকেট আসলে দুঃখজনক। ব্যাটিংয়ের জন্য এই উইকেট যথেষ্ট যোগ্য ছিল না, খেলা যতটুকু দেখেছি। অস্ট্রেলিয়া নিজেরাও তো ভালো খেলতে পারেনি, তারা প্রথমে ব্যাট করলে রেজাল্ট ভিন্ন হতে পারতো।’
ইনিংস ব্যবধানে হেরে বাংলাদেশ সিরিজ শেষ করলেও অস্ট্রেলিয়া উপযুক্ত বার্তা পেয়েছে বলে মনে করেন সিরাজউদ্দিন, ‘একটা বার্তা দিতে পেরেছি ওদের এই সিরিজে। ওদের পেস বোলিংয়ের যে শক্তি, তাদের মতো কিন্তু আমরাও ভালো করেছি। শরিফুল ৭ উইকেট তুলে নিয়েছে। দ্বিতীয় টেস্টে একটা ক্ষত হয়ে থাকল টেস্ট ক্রিকেটের জন্য। তারা জেতার জন্য এমন একটা উইকেট বানাবে, যা ক্রিকেটের জন্যই ক্ষত। আইসিসির এটা নিয়ে রিভিউ করা উচিত।’
বাংলাদেশের এমন হার স্বাভাবিকভাবে হতাশ করেছে সমর্থকদের। বিশেষত ব্যাটারদের ব্যর্থতা লক্ষণীয়। ম্যাচ শেষে বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত’র কণ্ঠেও ছিল হতাশার সুর, ‘এটা ছিল ভিন্ন কন্ডিশন। বাতাসে হালকা বাড়তি বাউন্স ও সুইং ছিল। আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল। দল হিসেবে এগিয়ে যেতে হলে এই ধরনের কন্ডিশন মোকাবিলা করতে হবে আমাদের। আমি মনে করি এই অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে। সব ব্যাটারদের জন্য এটা বেশ কঠিন ছিল। তাদের ব্যাটিংও শরিফুলের কারণে অস্বস্তিতে পড়েছিল। সত্যি কথা বলতে এই কন্ডিশনে ব্যাট করা বেশ কঠিন।’
শান্ত অবশ্য ম্যাকাইয়ের উইকেটকে দোষ দিচ্ছেন না, ‘আমরা যখন উপমহাদেশে খেলি, এক দিনে ১৮-১৯ উইকেট পড়লে সবাই অনেক কথা বলে। এই ম্যাচে প্রথম দিনে ১৮ উইকেট পড়েছিল। উইকেট চ্যালেঞ্জিং ছিল দেখেই ১৮ উইকেট পড়েছে। শুধু যদি এমন হতো আমাদের পড়েছে ওদের পড়ে নাই, এটা হলেও বুঝতাম।’
ডারউইনে বাংলাদেশ ইতিহাসগড়া জয় পেয়েছিল সাড়ে তিন দিনে। তবে কুইন্সল্যান্ডের ম্যাকাই মাঠটি বোলারদের জন্য আরও সহায়ক হয়ে ওঠে। ফলে প্রথম ইনিংসে দুই দল মিলে তোলে মাত্র ২৭৪ রান। মিচেল স্টার্কের ৬ উইকেট শিকারের সুবাদে বাংলাদেশের ইনিংস মাত্র ৬৪ রানে গুটিয়ে যায়। এরপর শরিফুল ইসলাম ৭ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ২১০ রানে অলআউট করেন।
অজিদের নেওয়া ১৪৬ রানের লিড দ্বিতীয় ইনিংসেও শোধ করতে পারেনি বাংলাদেশ। ৯৫ রানেই গুটিয়ে যায় তারা। মুশফিকুর রহিম ছাড়া ক্রিজে কোনো ব্যাটারই থিতু হতে পারেননি। দলের সবচেয়ে প্রয়োজনের মুহূর্তেও লিটন দাস হতাশা উপহার দেন, তিন ইনিংসে ব্যাট করে হ্যাটট্রিক ডাক খেয়েছেন। প্রথম কোনো দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়া অধ্যায়টাই তার জন্য দুঃসহনীয় হয়ে থাকল।
সিরিজজুড়ে বোলাররা দেখিয়েছেন কীভাবে সম্মানটা আদায় করে নিতে হয়। হাসান মাহমুদ, তাসকিন আহমেদ, মেহেদি হাসান মিরাজের পর সবশেষ শরিফুল ইসলাম। দেশের পেস বোলারদের ইতিহাসে এক ইনিংসে সেরা বোলিং ফিগার এখন এই বাঁ-হাতি পেসারের। ইনজুরি থেকে ফিরেই শরিফুলের এমন স্পেল তার জন্যও অবিস্মরণীয়। শরিফুলের ছোট বেলার কোচ আলমগীর কবিরও সেটাই জানালেন। তবে তিনি শরিফুলের পাশাপাশি কৃতিত্ব দিলেন ‘এ’ দলের পেস বোলিং কোচ নাজমুল ইসলামকে।
ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ ইনজুরি থেকে ফিরে এসে এভাবে খেলা দারুণ কিছু। অস্ট্রেলিয়ায় ৭ উইকেট বড় প্রাপ্তি। শরিফুলের সঙ্গে কথা হয়েছে আমার, ভালো আছে সে, শতভাগ ফিট। দেশ থেকে যাওয়ার সময়ও সে ফিট হয়েই গিয়েছিল। কোচ নাজমুল তার সঙ্গে কাজ করেছিল, আমি নিজেও দাঁড়িয়ে থেকে কথা বলেছি, দেখেছি কী করেছে সে সময়।’
শরিফুল ম্যাচের আগে পৌঁছে এমন নান্দনিক স্পেল করবে ভাবনায় ছিল না তার কোচেরও, ‘এখন পর্যন্ত যে ভালো বল করেছে তার জন্য আলহামদুলিল্লাহ। এতটা আশা করিনি, তবে সে দেখিয়েছে সে কেন সেরা। ইনজুরির সময় সে টেস্টের জন্য কাজ করেছিল। একটা ইয়র্কার মার্কার নিয়ে কাজ করেছিল, কীভাবে বল করানো যায় সেখানে। যাতে বলটা সুইং করে, সে বুঝতে পেরেছিল যে কীভাবে কাজ করলে অস্ট্রেলিয়ায় ভালো করা যায়। সেই ফল পেয়েছে।’



