বাকস্বাধীনতার বিশ্বসূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনক

0
105
যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা আর্টিকেল নাইনটিন বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে (ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে) উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমের বাকস্বাধীনতা নিয়ে  ‘মতপ্রকাশ’  শীর্ষক একটি  ‘প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে  বলা হয়েছে   গণমাধ্যম বা বাকস্বাধীনতার বিশ্বসূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনক।  গত পাঁচ বছরে (২০১৩ সাল থেকে)  দেশে বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে ২০১৭ সালে। এ বছর বাকস্বাধীনতায় ৩৩৫টি হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (৩ মে) নিজেদের ওয়েবসাইটে  আর্টিকেল নাইনটিন  এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
এতে  উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে ২০১৭ সালে আইনি প্রক্রিয়ায় হয়রানির শিকার হওয়ার মোট ঘটনা ঘটেছে ১৬৯টি, যা ২০১৩ সালে ছিল ৩৩টি।গতবছর আইনি প্রক্রিয়ায় শুধু সাংবাদিক হয়রানির ঘটনা ঘটেছে ৭৬টি। এর মধ্যে মানহানির অভিযোগে ৩৫টি, মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ১৯টি, রাষ্ট্র বা কোনো বিশেষ ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন হওয়ার অভিযোগে ১৪টি, উসকানির অভিযোগে তিনটি, অশ্লীলতার অভিযোগে দুইটি এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে দুইটি মামলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, আগের বছরগুলোর তুলনায় ২০১৭ সালে সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক হামলার ঘটনা কমেছে। গতবছর সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১১৩টি, যা ২০১৩ সালে ছিল ১৭৩টি।
গতবছর দৈনিক সমকালের সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার প্রতিনিধি আব্দুল হাকিম শিমুলকে হত্যা করা হয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালে একজন সাংবাদিক হত্যা, ২৮ জন মারাত্মক, ৭৫ জন সাধারণ শারীরিক আঘাত এবং ১০ জন সাংবাদিক অপহরণের শিকার হয়েছেন ব।
‘মতপ্রকাশ’ বিষয়ক বার্ষিক এ প্রতিবেদনে বলা হয়, গণমাধ্যম কর্মীদের প্রতি সংঘটিত এসব অপরাধের শতকরা ৯৩ ভাগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র জড়িত নয় (নন স্টেট) এবং শতকরা ৪৯ ভাগ ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও অন্যদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ২০১৭ সালে ৬৫টি মানহানি মামলা, আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারায় ৭৬টি, দুইটি আইন বর্হিভূত আটকাদেশ এবং বিভিন্ন রকমের হয়রানিমূলক মামলায় ২৪টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
 প্রতিবেদনে গণমাধ্যম ও মানবাধিকারকর্মী সংক্রান্ত অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াজনিত কার্যক্রম যেমন- তদন্ত, অভিযোগ গঠন ও গ্রেপ্তারে ধীরগতির কথা জানিয়ে বলা হয়, নারী সাংবাদিকরা তথ্যপ্রযুক্তি উদ্ভূত ঝুঁকির সম্মুখীন হন। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মী, আইনশৃংঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন বলেও তথ্য রয়েছে প্রতিবেদনে।
বাকস্বাধীনতার ক্ষেত্রে এ ধরনের আঘাত গণমাধ্যমকর্মীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রকে সংকুচিত করে এবং তা চূড়ান্তভাবে জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করে বলে মনে করে আর্টিকেল নাইনটিন। বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আলোকে সব অপরাধের বিচার কার্যকর করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
এদিকে ফ্রান্স ভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণ সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার (আরএসএফ)  বৃহস্পতিবার (৩ মে) বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে গতবছরের (২০১৭) তথ্যের ভিত্তিতে  প্রেস ফ্রিডম সূচক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে,  এতে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আগের বছরের মতোই ১৪৬তম থাকলেও, এবছর নেতিবাচক স্কোর বেড়েছে৷ ২০১৭ সালের নেতিবাচক স্কোর ৪৮ দশমিক ৩৬ থেকে বেড়ে এ বছর ৪৮ দশমিক ৬২ হয়েছে৷ তাদের সূচক অনুযায়ী, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ৷ এ অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থান ভুটানের– ৯৪৷ নেপালের অবস্থান ১০৬ নম্বরে, আফগানিস্তান ১১৮, শ্রীলংকা ১৩১, মিয়ানমার ১৩৭, ভারত ১৩৮, পাকিস্তান ১৩৯, থাইল্যান্ড ১৪০ এবং কম্বোডিয়ার অবস্থান ১৪২ নম্বর স্থানে৷
আরএসএফের প্রতিবেদনের বাংলাদেশ অংশে বলা হয়েছে, আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ একটি সেক্যুলার দেশ হলেও সেখানে সংবিধান ও ইসলামের সমালোচনা ভালো চোখে দেখা হয় না৷ বাংলাদেশে মহামারীর মতো করে সাংবাদিক নিপীড়নের ঘটনা এবং সেইসব ঘটনায় দায়ীদের দায়মুক্তির সংস্কৃতির কারণে সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্র ও স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে৷ প্রতিবেদনে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের সমালোচনা করে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে অন্তত ২৫ জন সাংবাদিক, ব্লগার ও ফেসবুক ব্যবহারকারী বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন৷
বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা এবং জঙ্গিদের হুমকিকে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here