বরেন্দ্র টু সারাবেলা (পাঁচ)

0
179
মাহফুজ ফারুক : বরেন্দ্র রেডিওর তৎকালীন সিইও মাহবুল হক ভাই একদিন বললেন শিশুদের নিয়ে একটা ক্লাব খোলার কথা। নাম হবে বরেন্দ্র রেডিও চাইল্ড ক্লাব। আইডিয়াটা চমৎকার। আগে থেকেই শিশুদের নিয়ে কাজ করি। কাজেই রেডিওতে শিশুদের একটি সংগঠন হবে এমন সংবাদে আমি রীতিমতো পুলকিত।
মনে হল আর যাই হোক খুব সুন্দর করে একটা শিশু সংগঠন দাঁড় করানো যাবে। মনে মনে খুঁজতে থাকলাম কাকে দেয়া যায় এ দায়িত্ব। হঠাৎই মনে হলো কাজটা তন্ময়কে দিয়ে শুরু করানো যায়। যেই ভাবা সেই কাজ। তন্ময়কে জানালাম পুরো বিষয়টা। ও তখন রেডিওতে কাজ করে। তার আগে ওকে এবং ওর বন্ধু রাসিব, বাঁধন, সুরাইয়া ওদের নিয়ে শিশু পত্রিকা ‘কাঠবিড়ালী’ সম্পাদনা করতাম। কাঠবিড়ালী ঘিরে শিশুদের নিয়ে অনেক কাজও আমরা করেছি সে সময়ে।
তন্ময়কে বাছাই করার আরো একটি কারণ হলো চাইল্ড ক্লাবের জন্য যাকে নেয়া হবে তার বয়স হতে হবে ১৮ বছরের নিচে। তন্ময় তখন স্কুল ছাত্র। ও তখন রেডিওর কাজের পাশাপাশি একুশের টিভির মুক্ত খবরে জেলা সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করছে। সব মিলিয়ে বাছাই করা হলো তন্ময়কেই। তারপর ওর সমবয়সীদের নিয়ে ২০১২ সালের এপ্রিল মাসের শেষ দিকে আমরা বসলাম বরেন্দ্র রেডিওর সভা কক্ষে। ছোট ছোট সম্ভাবনাময় কিছু মুখ নিয়ে সেদিনই গঠিত হলো- বরেন্দ্র রেডিও চাইল্ড ক্লাব।
কিন্তু রেডিওতে শিশু সংগঠনের কাজ কি? এমন প্রশ্ন শুরুর দিকে অনেকেই করেছে। আসলে গণমাধ্যমে শিশুর জন্য জায়গা এতই কম যে কল্পনাই করা যায় না। তারউপর হাতে গোনা যে কয়েকটি গণমাধ্যমে শিশুদের জন্য জায়গা রাখা হয়েছে তার সিংহভাগ দখল করে আছে বড়রা। শিশুরা যেন কিছুই পারে না। তাদের যেন কোনো কিছুতেই প্রবেশাধিকার নেই। চাইল্ড ক্লাব এ জায়গা থেকেই কাজ শুরু করলো। সিদ্ধান্ত নেয়া হলো শিশুদের একটি নিয়মিত অনুষ্ঠান নির্মাণ ও সম্প্রচার করা হবে। যার পুরোটাজুড়েই থাকবে শিশুদের রাজত্ব।
অর্থাৎ স্ক্রিপ্ট, উপস্থাপনা, পারফরমেন্স, সাউন্ড এডিটিং সব কিছুই করবে শিশুরা। এটি যে কত বড় কঠিন একটি কাজ। তা সত্যিই তখন ভাবার বিষয় ছিল। কেননা আমরা এমন শিশুদের দিয়ে কাজটি করতে যাচ্ছি যাদের প্রায় শতভাগ কখনও কোনো রেডিও স্টেশনই দেখেনি। শুধু যে দেখেনি তা নয়। অনেকে কখনও রেডিও শোনেওনি।
সুতরাং এমন একটি টিম নিয়ে মাঠে নামাটা কতটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে? তবু আমরা নাছোড় বান্দা। শিশুদের কাজ হবে শিশুদের হাতে, শিশুদের কণ্ঠে। শুরু হলো চাইল্ড ক্লাবের কাজ। সুন্দর একটি পরিকল্পনা তৈরী করে প্রথমে চলল অনুশীলন। তারপর স্টুডিওতে লাইভে বসে যাওয়া। বড় ধরণের কোনো ত্রুটি ছাড়াই প্রথম অনুষ্ঠান সমাপ্ত হলো। বেড়ে গেল মনোবল। এই যে শুরু, তারপর আর কোনো থেমে যাওয়া নেই। কমিটি যখন গঠিত হলো সবার প্রত্যক্ষ ভোটে আহ্বায়ক নির্বাচিত হলো তন্ময় (সিফাত তন্ময়) সদস্য সচিব হলো নিতু ( নিশাত নিতু)।
সাংগঠনিক একটি রূপ নিয়ে চাইল্ড ক্লাব এবার মাঠে নামল। শুধু রেডিও অনুষ্ঠান কিংবা সংবাদ তৈরীই নয়। চাইল্ড ক্লাব মাঠে নামল শিশুদের অধিকার নিয়েও। শীত ও ঈদের সময় দুস্থ শিশুদের মাঝে প্রয়োজনীয় উপকরণ বিতরণ, পথশিশুদের নিয়ে মেহেদী উৎসব, রাজনের খুনীর বিচারের দাবিতে মানব বন্ধনসহ নানা কর্মসূচী পালন করেছে এবং করে আসছে চাইল্ড ক্লাব। পরের বছর হতে চাইল্ড ক্লাব রেডিওর জন্য জাতীয় পর্যায় হতেও সুনাম বয়ে আনতে শুরু করলো। এ পর্যন্ত বরেন্দ্র রেডিও চাইল্ড ক্লাবের সদস্যরা ইউনিসেফ কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে ৬টি মীনা মিডিয়া এ্যাওয়ার্ড লাভ করেছে।
সিফাত তন্ময় পরপর টানা তিন বছর এবং একই আসরে এককভাবে ৩টি এ্যাওয়ার্ড লাভ করে মীনা মিডিয়া এ্যাওয়ার্ডে রেকর্ড তৈরী করেছে। চাইল্ড ক্লাবে এক সময় কাজ করতো এমন শিশুদের মধ্যে তন্ময় বর্তমানে একুশে টিভিতে কাজ করছে প্রযোজক হিসেবে, নিশাত নিতু পড়ালেখার পাশাপাশি সক্রিয়া আবৃত্তি শিল্পী হিসেবে কাজ করছে বৈকুণ্ঠে, রাসিব মোস্তফা রয়েছে দৈনিক আজকালের খবরে, জাওয়াদুল আলম পলিন রয়েছে ইউল্যাব ক্যাম্পাস রেডিওতে, সৌরভ কাজ করছে টিভি নাটক এবং মডেলিংয়ে আর জনপ্রিয় উপস্থাপক হিসেবে মোমিত খান কাজ করছে বরেন্দ্র রেডিওতেই।
এছাড়া আরো অনেকেই রয়েছে যাদের সবার তথ্য এই মুহুর্তে হাতের মুঠোয় নেই। চাইল্ড ক্লাবে যুক্ত হয়ে আর কিছু না হোক অন্তত মাদকের হাত থেকে মুক্ত হয়ে সৃজনশীল কাজে যুক্ত থাকতে পারছে শিশুরা। তৈরী হচ্ছে দক্ষতা এবং যোগ্যতা। যা জীবনের যে কোনো প্রান্তেই তাদের জন্য বয়ে আনবে বাড়তি কিছু।
লেখকঃ সিনিয়র স্টেশন ম্যানেজার, রেডিও সারাবেলা ৯৮.৮ এফএম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here