রাজধানীতে মানসিক হাসপাতালে কর্মচারীদের মারধরের কারণে এএসপি আনিসুল করিমের মৃত্যু কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নয় বলে উল্লেখ করেছেন তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। মঙ্গলবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে ব্রিফিংকালে তিনি এ কথা বলেন।
এ সময় তিনি বলেন, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নয়, এটি হত্যাকাণ্ড। হাসপাতালটি সিলগালা করে দেয়া হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ভিডিও ফুটেজ দেখে এখন পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের প্রত্যেককে ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, ৯ নভেম্বর, সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ৩১তম বিসিএসের পুলিশ ক্যাডারের সদস্য মাে. আনিসুল করিমকে চিকিৎসা করানাের জন্য তার পরিবাবের সদস্যরা আদাবর থানাধীন বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটির ২ নম্বর সড়কের ২৮১ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত Mind Aid Psychiatry & De Addiction Hospital ঢাকায় নিয়ে যায়। হাসপাতালে যাওয়ার পর তিনি হাসপাতালের একটি রুমে নাস্তা করেন। কিছুক্ষণ পর তিনি ওয়াশরুমে যেতে চাইলে ১১টা ৩৫ মিনিটের দিকে হাসপাতালের মার্কেটিং ম্যানেজার আরিফ মাহমুদ জয় তাকে ওয়াশরুমে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে হাসপাতালের দোতলায় নিয়ে যান। তখন তার বােন উম্মে সালমা তার সঙ্গে যেতে চাইলে আরিফ মাহমুদ জয় ও রেদোয়ান সাব্বির তাকে বাধা দেন এবং কলাপসিবল গেট আটকে দেন।’
‘আনুমানিক ১২টার দিকে আসামি আরিফ মাহমুদ জয় নিচে এসে তার বােনকে ওপরে যাওয়ার জন্য ডাক দেন। তার বােনসহ পরিবারের লােকজন ওপরে গিয়ে আনিসুল করিমকে একটি রুমের ফ্লোরে নিস্তেজ অবস্থায় শােয়া দেখতে পান। পরে পরিবারের সদস্যরা একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে দ্রুত জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা করে আনিসুল করিমকে দুপুর ১২টা ৫৮ মিনিটে মৃত ঘােষণা করেন। এই ঘটনায় আনিসুল করিমের বাবা বাদী হয়ে আদাবর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর ৯।’
ডিসি হারুন বলেন, ‘হাসপাতালের ভিডিও ফুটেজ পর্যালােচনায় দেখা যায়, বেলা আনুমানিক ১১টা ৪৫ মিনিটে আসামিরা আনিসুল করিমকে হাসপাতালের দোতলার একটি রুমে মারতে মারতে ঢুকায়। তাকে রুমের ফ্লোরে জোরপূর্বক উপুড় করে ৩-৪ জন হাঁটু দিয়ে পিঠের ওপর চেপে বসে। কয়েকজন পিঠমােড়া করে ওড়না দিয়ে তার দুই হাত বাঁধে। কয়েকজন কনুই দিয়ে ঘাড়ের পেছনে ও মাথায় আঘাত করে।’
‘একজন মাথার ওপরে চেপে বসে এবং আসামিরা সকলে মিলে পিঠ, ঘাড়সহ শরীরের বিভিন্নস্থানে উপর্যুপরি কিল-ঘুষি মারে। ফলে আনিসুল করিম নিস্তেজ হয়ে পড়েন। পরিকল্পিতভাবে মারপিট করে তাকে হত্যা করা হয়েছে।’
ঘটনা জানার পর থেকেই আদাবর থানা পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ঘটনাটি তদন্ত শুরু করে বলে জানান ডিসি হারুন। তিনি বলেন, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ঘটনায় মারধরে জড়িত ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িতরা পুলিশের কাছে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন।
পুলিশের সিনিয়র কর্মকর্তা হত্যায় যারাই জড়িত থাকুক না কেন, সবাইকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।
মারধরের ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা তথ্য তুলে ধরে ডিসি হারুন অর রশীদ বলেন, চিকিৎসার নামে ওই মানসিক হাসপাতালে এএসপি আনিসকে মারধর করা হয় এবং মারধরের সময় জড়িতরা কেউই ওই হাসপাতালের চিকিৎসক নন।
হত্যায় জড়িতদের পরিচয় তুলে ধরে তিনি বলেন, মারধরের জড়িত আরিফ মাহমুদ জয় (৩৫) হাসপাতালে মার্কেটিং ম্যানেজার, রেদোয়ান সাব্বির (২৩) কো-অর্ডিনেটর, মাে. মাসুদ (৩৭) কিচেন শেফ, জোবায়ের হােসেন (১৯) ওয়ার্ড বয়, তানভীর হাসান (১৮) ফার্মাসিস্ট, তানিফ মােল্লা (২০) ওয়ার্ড বয়, সজীব চৌধুরী (২০) ওয়ার্ড বয়, অসীম চন্দ্র পাল (২৪) ওয়ার্ড বয়, লিটন আহাম্মদ (১৮) ওয়ার্ড বয় এবং সাইফুল ইসলাম পলাশ (৩৫) ওয়ার্ড বয়।
উল্লেখ্য, ৩১তম বিসিএসের পুলিশ ক্যাডার আনিসুল করিম তার ব্যাচে প্রথম স্থান অধিকার করেন। মেধাবী এই কর্মকর্তা কর্মজীবনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ও সর্বশেষ বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশে কর্মরত ছিলেন।









