যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতকে “বন্ধু” হিসেবে দেখতে চায় কেন?

0
14
১. যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতে ইসলামিকে “বন্ধু” হিসেবে দেখতে চায়—এই খবরটি ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর একটি প্রতিবেদনে সম্প্রতি উঠে এসেছে।’ দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতে ইসলামিকে একটি “মধ্যপন্থী ইসলামী দল” হিসেবে বিবেচনা করছে।আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের সম্ভাব্য সাফল্যের কারণে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী। তবে যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক করেছে, যদি জামায়াত ক্ষমতায় গিয়ে তাদের প্রত্যাশার বিপরীতে শরিয়াভিত্তিক নীতি চাপিয়ে দেয় বা মার্কিন স্বার্থবিরোধী পদক্ষেপ নেয়, তাহলে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা বা শুল্ক আরোপের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। জামায়াতে ইসলামি বাংলাদেশে একাধিকবার নিষিদ্ধ হয়েছে, বিশেষ করে শেখ হাসিনার সরকারের সময়। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দলটি আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড়সড় কূটনৈতিক বার্তা।
২. যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতে ইসলামিকে “বন্ধু” হিসেবে দেখতে চায়—এমন খবর প্রকাশের পর অনেকে বিস্মিত হওয়ার ভান করছেন। কিন্তু ইতিহাস ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা জানলে এখানে বিস্ময়ের কিছু নাই। জামায়াতে ইসলাম সবসময়ই যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু ছিল। একাত্তর সালে পাকিস্তানের গণহত্যাকারী শাসক শ্রেণীর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন যেমন ছিল, জামায়াতে ইসলামের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিও মূলত সেই ধারাবাহিকতার মধ্যেই আছে। এই সম্পর্ক নতুন নয়, হঠাৎ তৈরি হয়নি, এবং কখনোই প্রকৃত অর্থে মার্কিন রাষ্ট্রের চোখে “খারাপ” বলে বিবেচিত হয়নি ।
একাত্তরে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানি সামরিক জান্তার গণহত্যা জেনেও নীরব ছিল—এ কথা আজ ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। সেই সময় পাকিস্তানি রাষ্ট্রের আদর্শিক ও সামাজিক সমর্থক শক্তি হিসেবে Jamaat-e-Islami সরাসরি গণহত্যার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তবু যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা কিংবা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ—এই বিষয়গুলো কখনোই মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে ছিল না। তাদের কেন্দ্রীয় বিবেচনা ছিল একটাই: উপমহাদেশে সোভিয়েত-বিরোধী এবং পরবর্তীকালে চীন-নিয়ন্ত্রণমূলক ভূরাজনৈতিক স্বার্থ। সে কারণে পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের সামাজিক-রাজনৈতিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কোনো কারণ যুক্তরাষ্ট্র দেখেনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও জামায়াতে ইসলামি তার নাম, আদর্শ বা আন্তর্জাতিক সংযোগ বদলায়নি। তারা নিজেদের কখনোই একাত্তরের দায় থেকে রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করেনি। ফলে আজ মার্কিন পরাশক্তির সঙ্গে জামায়াতের প্রীতিকে “নতুন” বা “অপ্রত্যাশিত” বলে দেখানো রাজনৈতিক ভণ্ডামি ছাড়া কিছু নয়। এটি সেই পুরনো সম্পর্কেরই নতুন পর্যায়—পরিস্থিতি বদলেছে, কিন্তু যুক্তি বদলায়নি।
৩. বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, বাংলাদেশের সম্ভাব্য অস্থিরতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ভেতরে জামায়াতের মতো সংগঠিত ইসলামপন্থী দল দরকার। কারণ তারা সামাজিকভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ, আদর্শগতভাবে রক্ষণশীল এবং প্রয়োজনে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঠেকাতে সক্ষম। বিশেষ করে উপমহাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের চীন মোকাবিলা নীতি (Indo-Pacific Strategy) বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংগঠিত ইসলামপন্থী শক্তিকে একটি কার্যকর “ম্যানেজেবল ফ্যাক্টর” হিসেবে দেখা হয়। এই প্রসঙ্গে চীনের উইঘুর মুসলমানদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ও সুবিধাবাদী প্রচারণার কথাও মনে রাখা জরুরি—যেখানে মানবাধিকার নয়, ভূরাজনৈতিক চাপই মুখ্য।
এই সম্পর্কের আরেকটি দিক হলো—জামায়াত নিজেও এই বন্ধুত্বকে স্বাগত জানাচ্ছে। কারণ এর মাধ্যমে তারা ইসরায়েলি–মার্কিন অক্ষশক্তির ছায়া-সমর্থন পাওয়ার আশা করে। এই অক্ষশক্তি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জনগণকে দমন, গণ বিরোধী শাসনকে টিকিয়ে রাখা এবং আরেকটি গণঅভ্যুত্থান ঠেকানোর কাজে ব্যবহৃত হবে—এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা জামায়াতকে ব্যবহার করবে; অন্যদিকে দিল্লি তার স্বার্থ অনুযায়ী বিএনপি বা তথাকথিত “সেকুলার” শক্তিগুলোকে সমর্থন দেবে। ফলে বর্তমান দ্বন্দ্ব আর জনগণ বনাম ফ্যাসিবাদ, ফ্যাসিস্ট শক্তি ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থার দ্বন্দ্ব নয়; এটি ক্রমশ রূপ নিচ্ছে উপমহাদেশে দিল্লির আধিপত্য বনাম মার্কিন আধিপত্যের প্রতিযোগিতায়। ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আমাদের সোচ্চার থাকার বাস্তব কারণ রয়েছে, তারা প্রতিবেশি; দিল্লীর পক্ষে বাংলাদেশকে তাদের অধীনস্থ করে রাখার চেষ্টা সহজ এবং ক্রমাগতভাবে তারা সেটা করে যাচ্ছে এবং করেও যাবে। বাংলাদেশের মানুষ তা মানবে না। বাংলাদেশ অবশ্যই দিল্লির আগ্রাসন ও আধিপত্যের শিকার, একইভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদেরও শিকার। কিন্তু আলাদাভাবে শুধু ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী রাজনীতি মূলত ইসরায়লি-মার্কিন অক্ষ শক্তির উপমহাদেশীয় রাজনীতি – এই বাস্তবতা অনস্বীকার্য।
৪. বাংলাদেশে ২০২৪এর আগস্টের ৫ তারিখে একটি গণঅভ্যুত্থান ঘটলেও ৮ তারিখে ঘটেছে একটি সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব। এই প্রতিবিপ্লবের মধ্য দিয়ে পুরনো লুটেরা ব্যবস্থা আগের মতোই বহাল রেখে পুরনা ব্যবস্থা পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এখন নির্বাচনের নামে সেই প্রতিবিপ্লবকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু নির্বাচন দিয়ে গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পুনরুদ্ধার করা যাবে না। ক্ষমতায় যে-ই আসুক, এই কাঠামোর ভেতরে থাকলে লুটপাট চলবেই—জামায়াত যত সুন্দর ভাষায় নৈতিকতা ও ন্যায়ের কথা বলুক না কেন। কারণ সমস্যাটা কোনো একক দলের নয়; সমস্যাটা নিজেই ব্যবস্থা।
এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জামায়াতের বন্ধুত্বে অবাক হওয়ার কিছু নাই। অবাক হওয়ার কথা একটাই—আমরা কি এখনও বুঝতে পারিনি যে, যতদিন গণসার্বভৌমত্ব কায়েম ও জনগণের গাঠনিক ক্ষমতা গঠিত হবে না, ততদিন বিদেশি পরাশক্তি ও তাদের পছন্দের দেশীয় সহযোগীরা আমাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দরকষাকষি করতেই থাকবে?
আমরা সেই ডামাডোলের গর্তে পড়ে রয়েছি।
লেখক: ফরহাদ মাঝহার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here