শেখ মুজিবুরের জন্য শোক প্রস্তাব

0
257

জাফর ওয়াজেদ: ১৯৭৯’র এর ফেব্রুয়ারী জাতীয় সংসদের নির্বাচন শেষে ৪ এপ্রিল অধিবেশন বসে। অধিবেশনে শোক প্রস্তাবটি স্পীকার উত্থাপন করেন। প্রস্তাবের সাথে সংযুক্ত বঙ্গবন্ধুর সাড়ে চার পৃষ্ঠা জীবন-বৃত্তান্তে জাতির পিতা’ উল্লেখ করা হয়।

শোক প্রস্তাব (৪-৪-১৯৭৯)
শেখ মুজিবুর রহমান

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ তারিখে ফরিদপুর জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪২ সালে গোপালগঞ্জ মিশস হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্র্ণ হন এবং ইসলামীয়া কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন।

১৯৪৩ সাল থেকে তিনি মুসলিম লীগের কাউন্সিলর ছিলেন। জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃেত্ব তিনি ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বিশিষ্ট ভূমিকা রাখেন। এই সময় থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ছাত্র-রাজনীতিতে এবং ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনে তিনি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। এই সময় তিনি প্রথমে পূর্ব পাকিস্তান মুসলীম ছাত্রলীগ গঠন করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি প্রথম কারাবরণ করেন। ১৯৪৯ সালের ভূখ-মিছিলে নেতৃত্বদানের জন্য তিনি আবার কারারুদ্ধ হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারীদের দাবী-দাওয়া আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্বদান করবার অভিযোগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কৃত এবং কারারুদ্ধ হন।

১৯৫২ সালে তিনি প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি গোপালগঞ্জ নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রাদেশিক আইন-পরিষদে নির্বাচিত হন।

১৯৫৪ সালে তিনি যুক্তফ্রন্ট-মন্ত্রীসভায় যোগদানকরেন। যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভা ভেঙ্গে দেোয়া হয় এবং তাঁকে আবার কারারুদ্ধ করা হয়। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তানের দ্বিতীয় গণ-পরিষদে তিনি সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৫৬ সালে জনাব আতাউর রহমান খানের মন্ত্রীসভায় শেখ মুজিবুর রহমান শিল্প বাণিজ্য ও দুর্নীতিদমন মন্ত্রী ছিলেন।

১৯৫৭ সালে ১১ জন প্রতিনিধি নিয়ে তিনি চীনে শুভেচ্ছা সফরে যান। ঐ বছর তিনি তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী জনাব হোসেন শহীদ সোহরাোয়ার্দী বিশেষ দূত হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ কয়েকটি দেশ সফর করেন।

১৯৫৮ সালে শেখ মুজিবুর রহমান আবার গ্রেপ্তার হন এবং ১৯৫৯ সালে মুক্তি পান। ১৯৬২ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি তাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। ঐ বছর মুক্তিলাভের পর তিনি গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠনে সহায়তা করেন। দাঙ্গা দমনে তাঁর অবদান এবং পূর্ব-পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ শীর্ষক প্রচারপত্র প্রকাশের জন্য তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৬৪ সালে বিভিন্ন অভিযোগে তাঁকে বেশ কয়েকবার আটক করা হয়।

কারারুদ্ধ অবস্থাতেই তাঁর বিরুদ্ধে ‌আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ খাড়া করা হয়। গণ-আন্দোলনের চাপে নতি স্বীকার করে তাঁকে ১৯৬৯ সালের ২২ শে ফেব্রুয়ারী তারিখে এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তৎকালীন পূর্ব াকিস্তান জাতীয় পরিষদে ১৯৭ টি আসনের মধ্যে ১৬৭ টি আসনে জয়ী হয়। কিন্তু পাকিস্তানী শাসকবর্গের অভিসন্ধিতে শান্তিপূর্ণ উপায়ে পুর্বাঞ্চলীয় স্বায়ত্বশাসনের পথ রুদ্ধ হলে সারা বাংলাদেশের জনগণ সংগ্রামের পথ বেছে নেয়।

১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ শুরু হয় রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। ঐ তারিখে শেখ মুজিবুর রহমাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়।

ইতিমধ্যে মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী স্থাপিত হলে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রথম রাষ্ট্রপতি পদে অভিষিক্ত করা হয়। তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হন। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর তারিখে বাংলাদেশ হানাদারমুক্ত হয় এবং বিশ্বজনমতের চাপে ১৯৭২ সালের ৩রা জানুয়ারী তারিখে শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানী কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। একই মাসের ১০ তারিখে তিনি দেশে ফিরে আসের এবং ১২ই জানুয়ারী তিনি প্রধানমন্ত্রীরূপে শপথ গ্রহণ করেন।

১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে তাঁর দল বিপুল ভোটাধিক্যে বিজয়ী হলে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারী তারিখে সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হন।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট এক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে তিনি মৃত্যুমূখে পতিত হন।

প্রস্তাব

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ অত্যন্ত দু:খ ভারাক্রান্ত গৃদয়ে প্রস্তাব করছে যে, বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুতে বাংলাদেশ রাজনীতি জগতে এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বকে হারিয়েছে।

এই সংসদ তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামরা করছে এবং তাঁর শোক-সন্তপ্ত পরিবারের নিকট গভীর সমেদনা জ্ঞাপন করছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here