আলী আকবর তাবি: গত পরশুদিন বিকেলে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টি থামার পর মিরপুর ১০ নম্বরের কাছে রাস্তা পার হচ্ছিলাম। রাস্তায় বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাশয়ের পাশে দাঁড়িয়ে ভাবছি, লাফ দিয়ে ফুটপাতে উঠতে পারবো কিনা?
এমন সময় একটি স্কুল ফেরত ১৩/১৪ বছরের কিশোর হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো, আঙ্কেল আমার হাত ধরেন। স্কুল ব্যাগ পিঠে ছিপছিপে গড়নের এই বাচ্চা ছেলেটি আমাকে টেনে ফুটপাতে তুুলতে পারবে কিনা ভাবছি। কিন্তু তাঁর অতি উৎসাহী চোখ ও আত্মবিশ্বাসী মুখ দেখে অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাত বাড়িয়ে দিলাম। কিশোরটি গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে আমার মত একজন সিনিয়র নাগরিককে টেনে ফুটপাতে তুলে ফেললো।
আমি কিছুটা আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়লাম এবং ভূপেন হাজারিকার গানটি আমার কানের কাছে যেন বেজে উঠলো-
বল কি তোমার ক্ষতি, জীবনের অথই নদী, পার হয় তোমাকে ধরে, দুর্বল মানুষ যদি…
আমার জানতে ইচ্ছে করছে হে মানবপ্রেমিক কিশোর, তুমি কি হাজার হাজার শিশু-কিশোরের সেই মিছিলে আছো, যারা নিরাপদ সড়কের দাবীতে রাজপথে মিছিল করে প্রতিদিন রক্তাক্ত হচ্ছে? যখনই পত্রিকায় মিছিলের রক্তাক্ত কিশোরের ছবি দেখি, তখনই মনে হয় সে কী এই প্রজন্মের সেই কিশোর, যে আমাকে বৈতরণী পার হতে সাহায্য করেছিল!
হে শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীরা, তোমরা জানো না কত বড় মাফিয়া চক্রের বিরুদ্ধে লড়াই করছো?
গত ৩ মে রাতে জিল্লুর রহমানের উপস্থাপনায় চ্যানেল আই তৃতীয় মাত্রায় নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন এই অন্ধকারের শক্তির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘ঢাকা শহরে বাসের বিরাট অংশের মালিক পুলিশের লোকজন, সশস্ত্র বাহিনীর লোকজন ও সরকারী আমলারা। তাদের অবৈধ টাকায় গড়ে উঠেছে বেসরকারী সড়ক পরিবহন। তিনি আরো বলেন, ‘ঢাকা পৃথিবীর একমাত্র শহর, যেখানে ট্রান্সপোর্টে মাংস নাই, চামড়া নাই, হাড্ডি নাই এবং অজস্র মানুষ, অজস্র বাস। দেখা যাচ্ছে একজন পেসেঞ্জারকে ধরার জন্য সবাই যুদ্ধ করে যাচ্ছে। এদেরকে শৃঙ্খলায় আনার জন্য মেয়র আনিসুল হক আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন এক বছর ধরে। অসংখ্য ডিনার পার্টি করেছি এই মালিকদের নিয়ে। পারি নাই। এরা এতোই শক্তিশালী যে কোন অবস্থাতেই ঢাকার ট্রান্সপোর্টকে সিস্টেমে আনতে দিচ্ছেনা।’
গত বছর ঢাকা মহানগরীতে মিনিবাসের সিটিং সার্ভিস বন্ধ করার জন্য সেতু ও পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিআরটিএর ভ্রাম্যমান আদালতকে সাথে নিয়ে নিজেই মাঠে নেমেছিলেন। কিন্তু মালিক সমিতি বাস মিনিবাস চলাচল বন্ধ করে দিলে সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়। এর আগেও সরকার ২০ বছরের অধিক পুরাতন লক্কড়ঝক্কড় বাস মিনিবাস বন্ধের উদ্যোগ নিলে বাস মালিক সমিতি যাত্রীদের জিম্মি করে বাস মিনিবাস চলাচল বন্ধ করে দিলে সরকার পরাজয় স্বীকার করে।
আইনানুযায়ী কারণ ছাড়া বাস মিনিবাস বন্ধ করলে রুট পারমিট বাতিল হওয়ার কথা। কিন্তু সরকার এই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করতে সাহস পায়নি। এই মাফিয়া চক্রের কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিআরটিসি- বাস চালানো সম্ভব হচ্ছেনা। চাঁদাবাজ, মাফিয়াদের শিরোমনি এককালের গণবাহিনীর হোতা শাহজাহান খান হয়েছেন নৌমন্ত্রী, সুরঞ্জিতের ভাষায় এ যেন- শুটকীর হাটে বিড়াল চৌকিদার!’
গণবিরোধী এই শক্তির কাছে পরাজয় বরণ করে ওবায়দুল কাদের আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘গাড়ির সঙ্গে যারা জড়িত, তারা খুব সামান্য মানুষ না, তারা অনেকেই খুব শক্তিশালী’।
ওবায়দুল কাদের বাস মালিকদের ভয় পেলেও স্বাধীন বাংলাদেশের এ প্রজন্মের শিশু-কিশোররা তাদের ভয় পায়নি।তারা শান্তিপূর্ণ এক অভূত আন্দোলনের সৃষ্টি করেছে।আজকের এই শিশু-কিশোররা আগামীদিনে আমাদের ‘জীবনের অথৈই নদী’ পার করে নিয়ে যাবে, যেভাবে একটি সাহসী কিশোর আমাকে জলাশয় পার করে দিয়েছিল।