মৃত্যু সম্পর্কিত আমার ভাবনা

0
516

পারভীন রহমান: মৃত্যু চির সত্য ও চির রহস্যময়।পৃথিবীতে বেঁচে থাকা সব জীবকেই মরতে হবে কিন্তু কেউ জানে না সে কখন ও কিভাবে মারা যাবে।কেউ জানে না মৃত্যুর পর জীবনটা কেমন। কারণ কোন মৃত ব্যক্তি পৃথিবীতে ফিরে আসে না।

মৃত্যু সম্পর্কে বিভিন্ন ধর্মালম্বী মানুষের বিশ্বাস ভিন্ন ভিন্ন।তবে একটি বিষয়ে সব ধর্মই একমত যে পৃথিবীতে যে যেমন কর্ম করবে মৃত্যুর পর সে তেমন জীবন পাবে।অর্থাৎ ভাল কর্মের জন্য বেহেশত বা স্বর্গ আর খারাপ কর্মের জন্য দোজখ বা নরক।

মৃত্যু মানেই প্রিয়জনদের ছেড়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয়া।পৃথিবীর সৌন্দর্য্, পরিবার ও প্রিয়জনদের ভালবাসা, সম্পদ, শখ, পরিচিত পরিবেশ সবকিছু ছেড়ে অপরিচিত, না ফেরার দেশে যাত্রা!যে ভ্রমণের কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, পথ দূর্গম না সহজ তাও জানা নেই। এবং পথের শেষে কি অপেক্ষা করছে তাও জানা নেই। শুধু জানা আছে তা অনন্ত ও পিছনে না ফেরার।

মৃত্যু আমাকে ভাবায়। আমি হাদিস ও কোরান পড়ে, মৃত্যু বিষয়ক বিভিন্ন প্রবন্ধ পড়ে, প্রায় মৃত্যু পথযাত্রী মানুষের অভিজ্ঞতা শুনে মৃত্যু ও পরবর্তী জীবন সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করেছি।আমাদের প্রিয় নবী হয়রত মুহাম্মদ (সঃ)কে তাঁর সাহাবারা মৃত্যুকালীন সময়ে কষ্ট সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। উত্তরে তিনি বলেছিলেন জীবন্ত মানুষের চামড়া ছাড়ালে যেমন কষ্ট হবে মৃত্যুর সময় মানুষ তেমন কষ্ট অনুভূব করবে।এই কষ্ট কেমন তা জানতে মৃত্যুকালীন সময়ে শরীরে কি কি ক্রিয়া ঘটে সে সম্পর্কে কিছু পড়াশুনা করে আমি আমার মত করে বুঝে নিয়েছি।

যে কারণেই মৃত্যু হোক না কেন মৃত্যুর ঠিক আগে হৃদপিন্ড ঠিকমত কাজ করবে না আর তাতে শরীরের কোষে রক্তসঞ্চালন কমে যাবে।কোষ অক্সিজেন পাবে না আর কোষের ভিতরে মেটাবলিক এন্ডপ্রোডাক্ট জমা হবে।অক্সিজেন না পাবার কারণে প্রচন্ড ইশ্চেমিক পেইন আর মেটাবলিক এন্ড প্রোডাক্ট জমা হবার জন্য সারা শরীরে তীব্র ব্যথা হবে।যারা হার্ট এ্যাটাক থেকে বেঁচে এসেছেন তাঁরা জানেন রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে কি ভীষণ ব্যথা হয়।আমার প্রথম সন্তান জন্মদানের কথা মনে পড়ে।লেবার পেইনও রক্তপ্রবাহ বন্ধ হবার জন্য হয়ে থাকে।যখন জরায়ু সংকুচিত হয় তখন এত তীব্র ব্যথা হয় যে মনে হয় যেন মরে যাচ্ছি। আর দুটি সংকোচনের মাঝের সময়টাতে মনে হয় কি আরাম! লেবার যখন শেষ হয় তখন আরামে ঘুম চলে আসে। কি প্রচন্ড কষ্ট থেকে মুক্তি! তখন ইপিসিওটমির ব্যথা আর ব্যথা মনে হয় না!

আমি খেয়াল করেছি কেউ কেউ বুঝতে পারেন মৃত্যু নিকটবর্তী।আমার মেয়ে যখন পড়তে নিউইয়র্কে যাচ্ছিল তখন আমার ভাসুর কাঁদছিলেন এই বলে যে আর দেখা হবে না!সত্যিই আমার মেয়ের সাথে আর ওনার দেখা হয়নি।এমদাদ ভাইও অনেক মৃত্যুর কথা বলতেন।

মুসলমান ধর্মে বলে মৃত্যু যখন উপস্থিত হয় তখন মানুষ জান কবজকারী ফেরেস্তার ভয়ংকর চেহারা দেখতে পায় এবং তার সারা জীবনের উল্লেখযোগ্য কিছু দৃশ্য সে দেখতে পায়।এর প্রমানও পাওয়া যায় মৃত্যুশয্যায় কারো পাশে কিছুক্ষণ থাকলে। দেখা যায় তাঁরা তাঁদের বহু আগে মরে যাওয়া প্রিয়জনের সাথে কথা বলছেন বা অনেক আগের কোন ঘটনা নিয়ে কিছু বলছেন। এমনটি আমি হলিউডের মুভিতেও দেখেছি।মৃত্যুদৃশ্যে নায়ক বা নায়িকার পুরানো কোন ঘটে যাওয়া ঘটনা মনে পড়ছে।মুসলমান ধর্মের সাথে খ্রিস্টান ধর্মের বেশ মিল আছে।কারণ ইঞ্জিলই পরিবর্তিত হয়ে আজকের বাইবেল।

যারা আইসিইউ থেকে ফিরে এসেছেন এমন কয়েকজনকে আমি তাদের অভিজ্ঞতার কথা জিজ্ঞাসা করেছি। কোমায় থাকা অবস্থায় তাঁদের অনুভূতি কেমন ছিল, কিছু দেখেছে কি না ইত্যাদি।অধিকাংশই বলেছে তাঁদের কিছুই মনে নেই!দু একজন বলেছে মাঝে মাঝে তারা আলো দেখেছে। কেউ কেউ বলেছে দূরে কেউ কথা বলছিল তার আওয়াজ হাল্কা সে শুনেছে।ইন্টারনেটে পড়েছি কেউ কেউ অন্ধকার টানেলের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিল এবং টানেলের শেষ প্রান্তে আলো দেখতে পেয়েছে।

আমরা জানি না মৃত্যুর পর কি অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য তাই আমরা মৃত্যুকে ভয় পাই।আমাদের ধর্মে বলে কবর দিয়ে সবাই যখন চল্লিশ কদম হেঁটে বাড়ির দিকে ফিরবে তখনই ফেরেশতা এসে মৃতকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করবে। যদি সে ভাল কাজ করে আসে পৃথিবীতে তাহলে সে প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারবে এবং তাঁর আত্মা কেয়ামত পর্য্ন্ত শান্তিতে থাকবে আর যদি খারাপ কাজ করে আসে তবে প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারবে না এবং কবরেই শাস্তি শুরু হয়ে যাবে।কি ভয়ংকর! তবে আল্লাহ বলেছেন তাঁর কাছে ক্ষমা চাইতে ও রহমত প্রত্যাশা করতে।

মানুষ মরে গেলে বিলাপ করে বা জোরে জোরে কান্না করা আমাদের ধর্মে নিষেধ করে দিয়েছে।অথচ আমরা চিৎকার করে কাঁদি!যা আমাদের পালন করার কথা ছিল তা পালন করে খ্রিষ্টান ও ইহুদিরা!মুভিতে দেখি তাঁরা মৃত পথযাত্রীর হাত ধরে বসে থাকে, তাকে ভালবাসার কথা বলে। ওদের এসব দেখে মনে হয় মৃত্যু জিনিসটা তেমন ভয়ংকর কিছু না, শুধু এক জগত থেকে অন্য জগতে চিরযাত্রা।তাঁদের ফিউনারেলও আমার খুব পছন্দ। তাঁরা কাল কাপড় পরে সারিবদ্ধ ভাবে বসে এবং মৃত ব্যক্তির সম্পর্কে ভাল ভাল স্মৃতিচারণ করে। বস্তুতপক্ষে এমন ধরণের আচার আমাদের করা উচিত ছিল। হাদিসে বলা আছে মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে ভাল ভাল কথা বলতে।অথচ আমরা ৪ দিনে কুলখানি আর চল্লিশদিনে চল্লিশা পালন করি যা আমাদের ধর্মে একদম নিষেধ।এসব অনুষ্ঠানে লোকজন সমবেত হয়ে নিজেদের নিয়ে গল্প করে এবং কোন দোকানের মিস্টি ভাল তা নিয়ে আলোচনা করে! সবচেয়ে জরুরী হলো মৃত ব্যক্তির ঋণ শোধ করা ও তার কাছে যদি কোন সম্পদ গচ্ছিত থাকে তা ফেরত দেয়া।অথচ আমাদের দেশে পরিবার ও আত্মীয়রা এসব না করে কুলখানি ও চল্লিশা করতে ব্যস্ত হয়ে যায়।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন “মরণরে তুহু মম শ্যাম সমান”। জানি না এ দিয়ে উনি কি বোঝাতে চেয়েছেন। তবে মৃত্যু ভয় তাকেও পেয়ে বসেছিল।উনি জানতেন হয়তো মুত্রনালীর সার্জারী থেকে উনি সেরে উঠবেন না। তাই বেশ ক’বার অপারেশন পিছিয়ে ছিলেন এবং পরিশেষে তাঁর আশংকাই সত্য হয়েছিল।

আমি এখন জীবনকে একটা ট্রানজিট লাউঞ্জের মত মনে করি।মৃত্যুকে জন্মের সাথে তুলনা করি।ইসলাম ধর্ম বলে সব আত্মাকে আল্লাহ একসাথে তৈরী করেছিলেন যা আল্লাহ সময়ে সময়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। আমাদের সেই স্মৃতিগুলো মনে নাই!এমনকি জন্ম এবং শৈশবের ৩/৪ বৎসর বয়স পর্য্ন্ত স্মৃতিও আমাদের মনে নেই।কম-বেশি ৯মাস ৭দিন আমরা মায়ের পেটে থেকেছি। সেটা কি কবরের মত নয়?

মৃত্যুর পর আমরা পৃথিবী মায়ের পেটে থাকবো।মায়ের পেটের থেকে যখন বের হয়ে এক জগত থেকে অন্য জগতে এসেছি তখনও রক্তনালী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তীব্র ইশ্চেমিক পেইন নিয়ে একটা সংকীর্ণ পথ দিয়ে এসেছি। নবজাত একটা শিশুকে দেখলেই বোঝা যায় কতটা স্ট্রাগল করে সে পৃথিবীতে এসেছে। সেই স্ট্রাগল করে আসবার পর সে সুন্দর একটা পৃথিবী পেয়েছে, মায়ের স্নেহ আর সবার ভালবাসা পেয়েছে।

তেমনি মৃত্যুও জন্মের মত কষ্টকর কিন্তু সুন্দর। মৃত্যু মানে শেষ হওয়া না, এক পৃথিবী থেকে অন্য পৃথিবীর দিকে যাত্রা। এক জীবন থেকে অন্য জীবনে পদার্পণ।জন্মের আগের স্মৃতি যেমন মনে নেই তেমনি পৃথিবীর স্মৃতিও তখন মনে পড়বে না।পৃথিবীর চেয়ে সুন্দর এক জগত রয়েছে সেখানে।তা দেখতে হলে ভাল মানুষ হতে হবে।সৃষ্টিকর্তার বিধান মেনে চলতে হবে।আজকাল মৃত্যুভয় আমার কেটে গেছে। বরং লালণের মত বলতে চাই,

“আমি অপার হয়ে বসে আছি ওহে দয়াময়, পারে লয়ে যাও আমায়।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here