বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বহু আন্দোলন-সংগ্রামের সাক্ষী। তবে ৫ আগস্ট ২০২৪ সাল ছিল এক অনন্য দিন। যেদিন দেশের মানুষ রক্ত ও ঘামে নির্মাণ করল এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রযন্ত্রকে কব্জা করে রাখা একটি দলীয় একনায়কতন্ত্র, যেটি প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, এমনকি সংবাদমাধ্যমকেও দলীয় নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল, সেই ক্ষমতার বলয়কে ভেঙে ফেলে জনগণ।
এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছিল দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি, ইসলামি ঘরানার জামায়াতে ইসলামি, প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ। তাঁদের দাবি ছিল একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র।
এই পরিবর্তনের পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনুস। কিন্তু শুধু সরকার পতন এবং নেতৃত্ব পরিবর্তনই গণঅভ্যুত্থানের পূর্ণ সফলতা নয়৷ এই সাফল্যকে টেকসই করতে প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম ঐকমত্য এবং একটি বিস্তৃত জাতীয় ঐক্য।
অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনীতির চারিত্র্য ও চ্যালেঞ্জ
অভ্যুত্থানের পর দেশে সৃষ্টি হয় একধরনের রাজনৈতিক শূন্যতা। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মূল স্তম্ভগুলো—সংবিধান, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও নিরাপত্তা বাহিনী। নতুন নীতির আলোকে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন। এই কাজে এককভাবে কোনো ব্যক্তি বা দল সফল হতে পারে না।
তদুপরি, দেশে বিদ্যমান মতাদর্শগত বিভাজন, দলীয় স্বার্থ ও পারস্পরিক অবিশ্বাস এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী অতীতে জোট করলেও বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধে জর্জরিত ছিল। অন্যদিকে বামপন্থী ও নাগরিক সংগঠনগুলো জামায়াতের রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে সন্দিহান। এই বিভাজন রাজনৈতিক মাঠে স্পষ্ট হলে অভ্যুত্থানের অর্জন নষ্ট হয়ে যাবে।
কেন জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন?
১. গণতন্ত্রের ভিত্তি পুনর্নির্মাণে সমন্বয় জরুরি
বাংলাদেশে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি দল রাষ্ট্রযন্ত্রকে এমনভাবে ব্যবহার করেছে, যা একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। নতুনভাবে এই ব্যবস্থাকে গড়ে তুলতে হলে সব রাজনৈতিক শক্তিকে একত্রে কাজ করতে হবে। অন্যথায় পুনরায় একটি দল বা গোষ্ঠী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
২. জনগণের প্রত্যাশা পূরণ
যে জনগণ প্রাণপণ লড়াই করে সরকার পতনের পথ সুগম করেছে, তারা কেবল নতুন মুখ নয়, নতুন পদ্ধতি, ন্যায্যতা ও নৈতিকতার চর্চা দেখতে চায়। যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে, তবে জনগণের সেই প্রত্যাশা ধূলিসাৎ হবে এবং হতাশা থেকে উগ্রবাদ বা অরাজকতার জন্ম হতে পারে।
৩. আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও কূটনৈতিক চাপ মোকাবিলা
যেকোনো অভ্যুত্থানকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সন্দেহের চোখে দেখে। বাংলাদেশে পরিবর্তন টেকসই করতে হলে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে এটিকে “জনগণের বিপ্লব” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ বার্তা সেই স্বীকৃতি পেতে সহায়ক হবে।
৪. বিচার ও দায়মুক্তি প্রশ্নে সমঝোতা প্রয়োজন
গণ অভ্যুত্থানে জড়িত অনেক ব্যক্তি ও সংগঠন ভবিষ্যতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের মুখে পড়তে পারে। এই প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হলে শক্তিশালী ঐক্য দরকার, যাতে অভ্যুত্থানকে যৌক্তিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়।
জাতীয় ঐক্য গঠনের প্রক্রিয়া ও পথনির্দেশ
১. একটি ন্যূনতম রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র (কমন মিনিমাম প্রোগ্রাম)
সমস্ত অংশীদার রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মসমূহ মিলে একটি লিখিত ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করতে পারে, যেখানে থাকবে নির্বাচনের রূপরেখা, বিচার ব্যবস্থা পুনর্গঠনের মডেল, ধর্ম, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ে নীতিগত অবস্থান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি।
২. জাতীয় ঐক্য ফোরাম গঠন
একটি স্থায়ী ফোরাম প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, যেখানে অন্তর্বর্তী সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো নিয়মিত সংলাপে বসবে। সেখানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বুদ্ধিজীবী, বিচারপতি, সাবেক কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও থাকবেন।
৩. ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রাথমিক সমঝোতা নয়, বরং ভবিষ্যৎ কাঠামোর রূপরেখা
ঐক্যের নামে ক্ষমতার ভাগাভাগি না করে, বরং পরবর্তী নির্বাচনে কোন নিয়মে সব দল অংশ নেবে, নির্বাচন কমিশনের কাঠামো কী হবে সে বিষয়ে ঐক্যমত হওয়া দরকার।
৪. মতাদর্শগত সহনশীলতা চর্চা
বিএনপি, জামায়াত, বামপন্থী ও নাগরিক সমাজের মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্য থাকলেও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সবাইকে সহনশীল হতে হবে। অতীত ইতিহাস মনে রাখা দরকার, কিন্তু ভবিষ্যতের দায়িত্বের ভার তার চেয়েও বড়।
ঐক্য না হলে সম্ভাব্য বিপর্যয়
১. পুনরায় একনায়কতন্ত্রের উদ্ভব:
যদি দলগুলো বিভক্ত থাকে, তবে নতুন একটি গোষ্ঠী জনগণের বিভ্রান্তি কাজে লাগিয়ে একক ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে পারে।
২. গণআন্দোলনের শক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হবে:
যে যুবক রাস্তায় নামলো, যে নারী স্লোগান দিল, যে শিক্ষক প্রতিবাদ করলো তারা হতোদ্যম হয়ে পড়বে এবং ভবিষ্যতে আর এগিয়ে আসবে না।
৩. নেতাদের ওপর অপরাধমূলক চাপ আসবে:
জাতীয় ঐক্য না থাকলে অভ্যুত্থানের নেতাদের সহজেই বিচ্ছিন্ন করে দায়ী করা সম্ভব হবে।
৪. আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন হারাবে বাংলাদেশ:
বিভক্ত রাজনীতির চিত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশকে অবিশ্বস্ত ও অনিশ্চিত হিসেবে উপস্থাপন করবে।
৫ আগস্ট ২০২৪-এর গণ অভ্যুত্থান কোনো রাজনৈতিক দলের একার অর্জন নয়। এটি গোটা জাতির প্রাণের উত্থান। এই অর্জনকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন সকল অংশীজনের ঐক্য, সহনশীলতা এবং আত্মত্যাগ। বিভাজন নয় এখন সময় জাতির স্বার্থে এক হওয়ার। ঐক্য ছাড়া মুক্তি নেই, ঐক্য ছাড়া পরিবর্তন টেকসই নয়। ইতিহাসের দায় আজকের নেতৃত্বের কাঁধে। যারা এই ঐক্য গড়বে, তারাই ইতিহাসে নায়ক হয়ে থাকবে। আর যারা ব্যর্থ হবে, ইতিহাসের কাঠগড়ায় তারা অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হবে।
লেখক: মোঃ হাবিবুর রহমান
সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।





