৩২ নম্বরের ইতিহাস

0
76
যেহেতু বঙ্গবন্ধু ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর বাড়ীর মালিক কিভাবে হলেন প্রশ্ন তোলা হয়েছে সেহেতু বাংলার সাধারন মানুষদের বাড়ীটির সঠিক মালিকানা ইতিহাস জানা উচিত । বিভিন্ন সংবাদপত্রের তথ্য থেকে এই বাড়িটির জন্ম ও সৃষ্টি সম্পর্কে যতটুকু গেছে তা পাঠকদের জন্য এখানে তুলে ধরা হলো ।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনীতি নিয়ে এতটাই মগ্ন ছিলেন যে , বাড়ি – ঘর সংসারের কোন খবরা খবরই তিনি তেমন রাখতেন না । এ দিকটি সামলাতেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবই । ঢাকায় বঙ্গবন্ধু পরিবারের মাথাগোজার কোন ঠাঁই ছিল না । কয়েক দফায় সরকারের মন্ত্রী থাকা অবস্থায় সরকারী বাসভবনেই তিনি থাকতেন ।
১৯৫৪ সাল বঙ্গবন্ধু প্রথমবারের মতো যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভার মন্ত্রী হন । কিন্তু সে সরকার বেশিদিন স্থায়ী হয়নি । ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগ কংগ্রেস , তফসিলি ফেডারেশন ও গণতন্ত্রী পার্টি সরকার গঠন করলে সে সরকারের চীপ মিনিস্টার নির্বাচিত হন আতাউর রহমান খান , আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সেই মন্ত্রী সভার বাণিজ্য, শ্রম, শিল্প ও দুনীর্তিদমন মন্ত্রী ।
তখন বঙ্গবন্ধুর ‘পিএস’ ছিলেন নুরুজ্জামান । সেই সময় তিনি মন্ত্রী হিসাবে সপরিবারে থাকতেন আব্দুল গণি রোডের ১৫ নম্বর বাড়িতে । তখনই ‘পিডব্লিউডি’ থেকে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার ব্যক্তিদের ‘প্লট বরাদ্ধ’ দেয়া হচ্ছিল । একদিন বঙ্গবন্ধুর সে পিএস পিডব্লিওডি থেকে একটি ‘আবেদন ফরম’ সংগ্রহ করে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের হাতে এনে তুলে দেন । ফরমটি যথাযথভাবে পূরণের পর দাখিল করেন ।
আবেদনের পর ১৯৫৭ সালের শুরুতে বেগম মুজিবের নামে ‘১ বিঘার একটি প্লট’ বরাদ্ধ দেয়া হয় । যার মূল্যধরা হয় ৬ হাজার টাকা । নিয়ম মোতাবেক ২ হাজার টাকা পরিশোধ করার পর বাকি থাকে ৪ হাজার টাকা । বাকি ৪ হাজার টাকা কিস্তিতে পরিশোধ করা হয়েছিল । ১৯৫৭ সালে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং মন্ত্রীত্ব ছেড়ে দেন ।
১৯৫৮ সালে বঙ্গবন্ধু টিবোর্ডের চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় সেগুন বাগিচায় একটি বাসা তাঁর নামে বরাদ্ধ দেয়া হয় । কিন্তু ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল জারির করে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে । বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের পর ১২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে সেগুন বাগিচার বাড়িটি তিন দিনের মধ্যে ছেড়ে দিতে বলা হয় । ১৯৫৮ সালের ১৫ অক্টোবর বাড়িটি ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হয় । টি বোর্ড থেকে প্রাপ্ত বঙ্গবন্ধুর জীপটি এবং বাড়ির কিস্তি পরিশোধের জন্য রাখা ২ হাজার টাকা ও বেশকিছু মালামাল রেখে দেয়া হয় ।
এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর বেগম মুজিব তাঁর সন্তানদের নিয়ে এক অনিশ্চিত ও সমস্যাসঙ্কুল অবস্থার মধ্যে পড়েন । কেননা , তাদেরকে আর তখন কেউ বাড়ি ভাড়া দিতে রাজি হচ্ছিল না । শেষ পর্যন্ত চেষ্টা তদবীরের পর সিদ্ধেশ্বরী বয়েজ স্কুলের মাঠের পাশে মাসিক ২ শত টাকায় ভাড়ায় একটি বাড়িতে ওঠেন । কিছুদিনের মধ্যেই শেখ মুজিবের পরিবার যে এ বাড়িতে থাকে তা জানাজানি হয়ে গেল । বাড়ির মালিক বেগম মুজিবকে বাড়ি ছেড়ে দেয়ার জন্য বললেন । এ বাড়ি ছেড়ে বাধ্য হয়ে তিনি সন্তান সন্ততিদের নিয়ে আবার এসে ওঠেন সেগুনবাগিচার একটি বাসার দোতলায় ।
১৯৬০ সালের ১ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু জেল থেকে মুক্ত হয়ে আলফা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীতে ‘কন্ট্রোলার অব এজন্সিস’ পদে চাকুরী নেন । তখনই বেগম মুজিব বুঝেছিলেন , যে কোনভাবেই হোক তাঁকে একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই করতে হবে । বঙ্গবন্ধু মুক্তি পাওয়ার পরই বেগম মুজিবের নামে বরাদ্ধ পাওয়া জায়গাটিতে বাড়ি নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় । ১৯৬০ – ৬১ সাল থেকেই ধার-কর্জ ও বন্ধু – বান্ধবের সহযোগিতা এবং ‘হাউস বিল্ডিং ফাইনান্স কর্পোরেশন’ থেকে ঋণ নিয়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের এই বাড়িটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় ।
বঙ্গবন্ধুর এ বাড়িটির নির্মাণকাজ তদারকী করেছিলেন ততকালীন পিডবি¬উডির নির্বাহী প্রকৌশলী ও পরবর্তীকালে পূর্ত সচিব মাইনূল ইসলাম । এ বাড়ি নির্মাণের কাজে আর্থিক ভাবে ও নানাভাবে সহযোগিতা করেছিল বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ও দাপ্তরিক সহকর্মীরা । সব’চে বেশী সহযোগিতা করেছেন বর্তমানে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের নির্বাহী কমিটির সদস্য, বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ সহকর্মী চাঁদপুরের হাজিগঞ্জের নূরুল ইসলাম ।
এই নূরুল ইসলাম ‘ক্রস ওয়ার্ড’ লটারী খেলতেন । আলফা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীর একজন কর্মকর্তা হিসাবে বঙ্গবন্ধুর সাথে ছিল তার আত্মীক পারিবারিক সম্পর্ক । সে অফিসে ক্রস ওয়ার্ড লটারী খেলা সবার জন্য ছিল বাধ্যতামূলক । একদিন লটারীতে ব্যবহার করেছিলেন ‘শেখ রেহানার’ নাম । সেইদিনই তিনি পেয়ে যান ‘ ছয় হাজার ‘ টাকা । এই টাকা তিনি গচ্ছিত রাখেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের কাছে ।
বাড়ির নির্মাণ কাজে টাকার সংকট দেখা দিলে নূরুল ইসলাম এই গচ্ছিত টাকা কাজে লাগানো জন্য অনুরোধ করেন । তাঁর অনুরোধের প্রেক্ষিতে এ টাকা ঋণ হিসাবে গ্রহণ করা হয় এবং পরবর্তীতে তা যথাযথ পরিশোধ ও করা হয় । নূরুল ইসলাম যেহেতু এখনো জীবিত আছেন , তিনিই এ ইতিহাসের বাড়ি নির্মাণের সাক্ষী।
বাড়ি নির্মাণকালীন কেয়ার টেকার ছিলেন টুঙ্গিপাড়ার আরজ আলী । বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনের ঝাউগাছটি এনে দিয়েছিলেন , বদরুন্নেছা আহমেদের স্বামী নুরুদ্দিন আহমেদ । বাড়ির জানালার গ্রীল সরবরাহ করেছিলেন ততকালীন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা রংপুরের মতিউর রহমান । কোনমতে বাড়িটি নির্মাণ কাজ শেষ করে পরিবার পরিজন নিয়ে বঙ্গবন্ধু এ বাড়িতে ওঠেন ১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর ।
একতলা এ বাড়িটিতে তখন ছিল দুইটি বেডরুম । এক রুমে থাকতেন বঙ্গবন্ধু ও বেগম মুজিব । অন্য রুমে থাকতেন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা । তার পাশে ছিল আর একটি কক্ষ । সে কক্ষটি রান্নাঘর হিসাবে ব্যবহার করা হতো । এই রান্নাঘরেরই এক পাশে থাকতেন শেখ কামাল ও শেখ জামাল । বাড়িতে ঢুকতেই ছিল একটি ছোট রুম এ রুমটিকে ড্রয়িং রুম হিসাবে ব্যবহার করা হতো । এইরুমের আসবাব বলতে ছিল একসেট বেতের সোফা মাত্র ।
বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যে টেলিফোনটি প্রথম সংযোগ দেয়া হয় সেটির নম্বর ছিল ‘ ২৫৬১ ‘ । টেলিফোনটি নিয়ে বেশ মজার গল্প আছে । আইয়ুবের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা প্রায়ই এ টেলিফোনটিতে আড়ি পাততো । তাই , শেখ ফজলুল হক মনি বঙ্গবন্ধুর সাথে কথা বলতে চাইলে নিজের নাম গোপন করে ‘বালিওয়ালা’ বলে নিজের পরিচয় দিত । আর সিরাজুল আলম খান নিজের পরিচয় দিত ‘ইটাওয়ালা’ বলে । যেহেতু বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়িটি তখন তৈরী হচ্ছিল সেহেতু পাকি সামরিক জান্তাকেও এ পরিচয়টি বিশ্বাস করতে হয়েছিল । কেননা বাড়িটি যেহেতু তৈরী হচ্ছে ‘বালিওয়ালা’ বা ‘ইটাওয়ালা’তো পাওনা টাকার জন্য তাগাদা দিতে ফোন করতেই পারে । তাই তারা এই নামে ফোন এলে তেমন আমলে নিত না।
একজন স্বল্প আয়ের মানুষ যে ভাবে তিলে তিলে নিজের জন্য একটি মাথা গাজার ঠাঁই তৈরী করে থাকে ; তেমনি ভাবে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ৩২ নম্বরের এ বাড়িটিকে তিলে তিলে গড়ে তোলেছিলেন । বঙ্গবন্ধুর এ বাড়িটি একটা সময়ে এসে হয়ে যায় বাঙালিদের আশা – আকাঙ্খা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখার বাড়ি । ১৯৭১ একাত্তর সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে হয়ে দাঁড়ায় ইতিহাসের বাড়ি । এই বাড়ি থেকেই বঙ্গবন্ধু বাঙালির স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের বীজ রোপন করে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির প্রাণে প্রাণে ।
কিন্তু ১৯৭৫ সালে জিয়া ও খুনি ফারুক রশিদদের ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তে বঙ্গবন্ধু নিহত হলে এ বাড়িটি আবার চলে যায় জিয়া সরকারের নিয়ন্ত্রণে । ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হয়ে নির্বাসন থেকে ফিরে এলে এই বাড়িটি তিনি ফিরে পান ।
কিন্তু বছর খানেকের মধ্যে শেখ হাসিনা সংবাদপত্রে একটি নিলাম বিজ্ঞপ্তি দেখতে পান । হাউস বিল্ডিং ফাইনান্স কর্পোরেশনের সে নিলাম বিজ্ঞপ্তির তালিকায় বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়িটিও ছিল । শেখ হাসিনা কাল বিলম্ব না করে ছুটে যান হাউস বিল্ডিং ফাইনান্স কর্পোরেশনের অফিসে । ১২ হাজার টাকা বকেয়া পরিশোধের পর বাড়িটির দখল শেখ হাসিনাকে বুঝিয়ে দেয়া হয় । (সংক্ষেপিত)”
লেখক: লায়ন নবাব হোসেন মুন্না, বিশিষ্ট কলামিস্ট ও রাজনীতিবিদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here