বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু দিন আছে, যা শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়; বরং একটি জাতির সংগ্রাম, স্বপ্ন ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক। ২৩ জুন তেমনই একটি দিন। ১৯৪৯ সালের এই দিনে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ—একটি রাজনৈতিক দল, যা পরবর্তীতে বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রাম, স্বাধিকার আন্দোলন এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নেতৃত্ব দেয়।
আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছিল বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার ক্রমাগত উপেক্ষিত হতে থাকে। সেই বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবেই আওয়ামী লীগের আবির্ভাব। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দলটি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি ঐতিহাসিক বাঁকে আওয়ামী লীগ ছিল জনগণের পাশে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ শুধু একটি রাজনৈতিক দল ছিল না; এটি ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রধান চালিকাশক্তি।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এর পেছনে ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, ত্যাগ ও আত্মত্যাগের ইতিহাস। সেই ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালিকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করেছিল, আর তাঁর নেতৃত্বেই বাঙালি জাতি চূড়ান্ত বিজয়ের পথে এগিয়ে যায়।
স্বাধীনতার পরও আওয়ামী লীগের পথচলা সহজ ছিল না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়ে ঠেলে দেওয়া হয়। কিন্তু ইতিহাসের নির্মমতা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ আবার ঘুরে দাঁড়ায়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় দলটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
আজকের বাংলাদেশে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, নীতিগত বিতর্ক থাকতে পারে। গণতান্ত্রিক সমাজে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একটি বিষয় অনস্বীকার্য—বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম, বাঙালির জাতীয় জাগরণ এবং স্বাধীনতার ইতিহাস থেকে আওয়ামী লীগকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
২৩ জুন তাই শুধু একটি দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়; এটি বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামের প্রতীক। এই দিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা এবং সেইসব ত্যাগী নেতাকর্মীদের, যাদের আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আজকের বাংলাদেশ।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক—মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের আদর্শকে আরও শক্তিশালী করা। ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে ভবিষ্যতের সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পথে। জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।
লেখক: গোলাম রব্বানী হিরু





