হ্যাকারদের রাজত্ব

0
203

জিয়াউদ্দীন আহমেদ: ২০১৬ সালে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ১০১ মিলিয়ন ডলার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে লোপাট হয়ে যায়।

এর মধ্যে ৮১ মিলিয়ন ডলার পাঠানো হয় ফিলিপিন্সের রিজাল কমার্শিয়াল করপোরেশনে (আরসিবিসি) এবং ২০ মিলিয়ন ডলার যায় শ্রীলঙ্কায়। শ্রীলঙ্কায় পাঠানো ২০ মিলিয়ন ডলার উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু ফিলিপিন্সে পাঠানো অর্থের সামান্য অংশ উদ্ধার করা গেলেও বাকি অংশ আদৌ উদ্ধার হবে কী না সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না;

যদিও বাংলাদেশে কর্মরত ফিলিপিন্সের রাষ্ট্রদূত একটি ইংরেজি পত্রিকাকে দেয়া তার সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, অর্থ উদ্ধারে তাদের সরকার গভীরভাবে কাজ করছে এবং পুরো অর্থ ফেরত পাওয়ার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।

উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঠানো ‘স্টপ পেমেন্ট’ নির্দেশনা উপেক্ষা করে ফিলিপিন্সের আরবিসিসি ব্যাংক জুয়াড়িদের হাতে এই অর্থ তুলে দেয়ার কারণে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

দুয়েকজন ব্যতীত বাংলাদেশ ব্যাংকের অধিকাংশ গভর্নর ছিলেন সরকারের আমলা। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাতন্ত্র্যে বিঘ্ন ঘটলেও একজন সিনিয়র আমলা গভর্নর হলে মন্ত্রণায়গুলোর সঙ্গে সুষ্ঠুভাবে কাজ সম্পাদনে তার প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই থাকে।

আমলা বহির্ভূত শিক্ষক ড. আতিউর রহমানকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতর, ব্যাংকিং সেক্টর ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে একজন ডায়নামিক ও সৃজনশীল গভর্নর হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে সমর্থ হন এবং এতে দেশের ভেতরে ও বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ ব্যাংকের মর্যাদা বেড়ে যায়।

২০০৯ সনে ড. আতিউর রহমানের গভর্নর হয়ে আসার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বহির্বিশ্বের যোগাযোগের ক্ষেত্রে মান্ধাতার আমলের ধীরগতির টেলিপ্রিন্টার, ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল টাইপরাইটার ইত্যাদির স্থলে যোগ হয় সুইফটের আধুনিক সংস্করণ।

সুইফট বা সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিনান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশনস হচ্ছে ব্যাংকিং লেনদেনের একটি নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ মাধ্যম। ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মাধ্যমটির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বিধানে কয়েক স্তরের সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। দ্রুতগতি এবং সুরক্ষিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য পৃথিবীর ২০০ দেশের প্রায় ১১০০০ আর্থিক প্রতিষ্ঠান আর্থিক লেনদেনে বর্তমানে সুইফট ব্যবহার করছে।

এই সুরক্ষিত সুইফটের ভেতর ম্যালওয়্যার ঢুকিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা হাতিয়ে নিলো একটি আন্তর্জাতিক হ্যাকার্স গ্রুপ।

আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি চলতি অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে থাকে। দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের হয়ে বৈদেশিক দেনা-পাওনা মেটানোসহ ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ওই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে থাকে।

নিউইয়র্ক টাইমস ও আলজাজিরার মতো বিশ্ববিখ্যাত গণমাধ্যম বলছে, হ্যাকারেরা দুইটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যোগাযোগ ও লেনদেনের ডিজিটাল সিস্টেমের ভেতরে ঢুকে দীর্ঘদিন ধরে বিচার বিশ্লেষণপূর্বক সময় সুযোগ মতো অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করে।

তারা সময়টি বেছে নেয় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা; বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে বাংলাদেশে সাপ্তাহিক ছুটির শুরু, অন্যদিকে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার আমেরিকায় অফিস খোলা; ফলে আমাদের বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পাঠানো অর্থ পরিশোধের নির্দেশনা আমেরিকার বৃহস্পতিবার সকালে পৌঁছার পর নির্দেশনার উপর ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের কার্যক্রম গ্রহণে কোন সমস্যা হয়নি।

শুক্রবারে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট ডেডিকেটেড কম্পিউটারে গিয়ে দেখে যে, কোন ম্যাসেজ নেই। শনিবারে এসেও কোন ম্যাসেজ না পেয়ে ডিলিং অফিসের কর্মকর্তাদের সন্দেহ জাগে। তারা বহু চেষ্টা করে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে আসা তিনটি ম্যাসেজ শনিবার বিকালে কম্পিউটার থেকে বের করতে সক্ষম হয়।

ওই ম্যাসেজগুলোতে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক তাদের কাছে পাঠানো ৪৬টি অর্থ পরিশোধের ম্যাসেজের ব্যাপারে ব্যাখ্যা চায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারাও এত বিপুল পরিমাণ এডভাইস প্রেরণের সংবাদ পেয়ে স্তম্ভিত হয়ে যায়; কারণ বৃহস্পতিবারে সচরাচর অর্থ পরিশোধের কোন এডভাইস পাঠানো হয় না; অন্যান্য দিনেও দুই/তিনটির বেশি পাঠানোর কোন নজির নেই।

এই সকল অর্থের গন্তব্যস্থল জানার চেষ্টা করেও হ্যাকিং সমস্যার কারণে ডেডিকেটেড কম্পিউটার, প্রিন্টার বিকল থাকায় জানা সম্ভব হয়নি। শনিবার ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক বন্ধ ছিল বলে ফোন করেও যোগাযোগ করা যায়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে প্রাগ্রসর ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক তখন অবধি এমনতর জরুরি অবস্থায় যোগাযোগের জন্য হটলাইন চালু করেনি।

নিউইয়র্ক টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ড. আতিউর রহমান এই সীমাবদ্ধতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তাদের হুঁশ হয় এবং এরি প্রেক্ষিতে সম্প্রতি হটলাইন স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিকূল পরিস্থিতি বিরাজ করা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে উল্লিখিত ৪৬টি এডভাইসসহ সকল অর্থ পরিশোধ বন্ধ রাখার অনুরোধ করে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে ম্যাসেজ পাঠানো হয়।

কিন্তু ম্যাসেজ তারা পায় সোমবার সকালে, আমাদের দেশে তখন মঙ্গলবার। এমনতর অফিস বন্ধের সুযোগে ফিলিপিন্স ও শ্রীলঙ্কায় পূর্বোক্ত অর্থ ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সঙ্গে পরিচালিত বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ইত্যবসরে বেরিয়ে যায়।

সাপ্তাহিক ও চাইনিজ নিউ ইয়ার উপলক্ষে ফিলিপিন্সও শনি, রবি ও সোমবার বন্ধ ছিল। ফিলিপিন্সের ব্যাংক ৮১ মিলিয়ন ডলার পরিশোধের নির্দেশনা পায় শুক্রবার; সাপ্তাহিক ও চাইনিজ নিউ ইয়ারের জন্য পরের তিন দিন শনি, রবি ও সোমবার বন্ধ।

অর্থ পরিশোধ বন্ধ রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জরুরি মার্ক করে নির্দেশনা পাঠানো হলেও ফিলিপিন্সের ব্যাংক তা উপেক্ষা করে মঙ্গলবার সকাল ১১টায় ৮১ মিলিয়ন ডলার প্রাপককে তার ভুয়া হিসাবে পরিশোধ করে দেয়।

তিনদিন বন্ধ থাকায় পুঞ্জীভূত ৮০০ ম্যাসেজের মধ্যে অর্থ পরিশোধ না করার ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের ম্যাসেজটি তারা গুরুত্ব সহকারে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাছাই করে দেখার প্রয়োজন বোধ করেনি।

মঙ্গলবারে গভর্নর আতিউর রহমানও সরাসরি ফিলিপিন্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সাথে ফোনে কথা বলে প্রাপককে অর্থ পরিশোধ বন্ধ করার ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেন; ফিলিপিন্সের গভর্নর লিখিতভাবে অভিযোগ করতে বলেন এবং বিষয়টি সত্যাসত্য উদঘাটনের পূর্ব পর্যন্ত গোপন রাখতে ড. আতিউরকে অনুরোধ করেন।

হ্যাকারেরা যাতে অধিক সতর্ক হয়ে উঠতে না পারে সেজন্য দুটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বতন্ত্র গভর্নরের গোপন রাখার এমন যৌথ সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মানদন্ডে সঠিক ছিল বলে বিবেচনা করা যায়।

ফিলিপিন্স এমন একটি দেশ যেখানে ক্যাসিনো বা জুয়াখেলায় কালোমানি সাদা করা সম্ভব। মানি লন্ডারিং-এর বিরুদ্ধে ওই দেশে আইন থাকলেও কিছুদিন আগ পর্যন্ত সে আইন ক্যাসিনো বা জুয়াখেলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল না। ক্যাসিনোতে কোত্থেকে টাকা আসছে, ক্যাসিনো থেকে কোথায় কার মারফত টাকা হস্তান্তর হচ্ছে তা আইন মেনেই গোপন রাখা হতো।

আগেই উল্লেখ করেছি যে, ফিলিপিন্সের রিজাল ব্যাংকের যে অ্যাকাউন্টে এই অর্থ জমা হয়েছিল সেই নামটি ছিল ভুয়া। প্রয়োজনীয় কেওয়াইসি ছাড়াই হিসাব খোলার পর ওই হিসাবে দীর্ঘদিন কোন লেনদেনও হয়নি।

ভুয়া হিসাব খোলা, দীর্ঘদিন হিসাবে কোন লেনদেন না হওয়া, যেদিন অর্থ হিসাবে স্থানান্তর হয়েছে সেদিন হিসাবটিকে সক্রিয় করে দ্রুততার সঙ্গে অর্থ পরিশোধ করা ইত্যাদি পর্বেক্ষণ করলে হ্যাকারদের সঙ্গে ফিলিপিন্সের রিজাল ব্যাংকের সংশ্লিষ্টতা স্পষ্ট হয়; আন্তর্জাতিক বিচারে এটা ছিল মানি লন্ডারিং অপরাধ।

মানুষ প্রতিনিয়ত ঠকছে, ঠকাচ্ছে, হারছে, হারাচ্ছে; আবার প্রবঞ্চনা থেকে রক্ষা পেতে প্রতিরোধের দেয়ালও গড়ে তুলছে। ডিজিটাল যুগে পৃথিবীর গতি বেড়ে গেছে অকল্পনীয়ভাবে। ডিজাটল পদ্ধতি যেমন উপযোগী তেমনি ঝুঁকিপূর্ণও।

নিরাপত্তা দেয়াল যে যতবেশি শক্ত করে গড়ে তুলতে পারে তার ঝুঁঁকি তত কম। আবার শক্ত দেয়াল ভাঙার জন্য হ্যাকারেরা অবিরত অনুশীলন করে যাচ্ছে। এমন কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেন্টাগণ, মার্কিন নির্বাচন কর্তৃপক্ষ, রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ইয়াহু, গুগল-কেউই হ্যাকারদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়নি।

ডিজিটাল জীবনের পুরোটাই ‘চোর-পুলিশ’ খেলা। ডিজিটাল যুগে বিশ্বের বাণিজ্যিক লেনদেন যে গতিতে বাড়ছে তার চেয়ে বেশি গতিতে বাড়ছে হ্যাকারদের অবৈধ কার্যক্রমের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের মাত্রা।

যারা ডিজিটাল পদ্ধতির আবিষ্কারক তাদের মতোই কিছু ডিজিটাল বিশেষজ্ঞ হ্যাকার এই পদ্ধতির ছিদ্রান্বেষণ করে অবৈধভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করে থাকে। ডিজিটালের অভূতপূর্ব অগ্রগতির কারণে সর্বশেষ প্রযুক্তির নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যের সংযোজন করেও পৃথিবীর কোন দেশ তাদের নোটের নকল রোধ করতে পারছে না।

ডেবিটকার্ড, ক্রেডিটকার্ডের পাসওয়ার্ড ভেঙে হ্যাকারেরা প্রতিনিয়ত অর্থ তছরুপ করছে। বাংলাদেশের এটিএম থেকেও একাধিকবার লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে হ্যাকারেরা।

উত্তর কোরিয়া এবং চীনের হ্যাকারেরা আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে খুবই সক্রিয়। নিউইয়র্ক টাইমস এবং আলজাজিরার ভাষ্যমতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচ্য হ্যাকিং তারাই করেছে। আমেরিকার অবরোধ আরোপের কারণে দেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য উত্তর কোরিয়া নাকি পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে অর্থ ছিনিয়ে আনতে হ্যাকারদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে।

হ্যাকারেরা ইকুয়েডর, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, পোলান্ড, ভারত ও রাশিয়ার বিভিন্ন ব্যাংকের কম্পিউটার নেটওয়ার্কে ঢুকে সুইফটের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের নির্দেশনা পাঠিয়েছে। এই হ্যাকারেরা অর্থ পরিশোধের নির্দেশনা দিয়ে অর্থ পরিশোধের পর তা সুনিপুণভাবে মুছে দিতেও সমর্থ হয়েছে; এমন কি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রক্ষিত হিসাবে যে অর্থ বিকলন হয়েছে তাও মুছে দিতে সমর্থ হয়েছে; যার ফলে অর্থ পরিশোধের পরও পরিলক্ষিত হয়েছে যে, একাউন্ট থেকে অর্থ পরিশোধ হয়েছে এমন কোন চিহ্ন নেই। এগুলো আন্তর্জাতিক হ্যাকারদের অপকর্ম।

পৃথিবীর বিভিন্ন ব্যাংকে সাইবার অ্যাটাক্ট অনেক হয়েছে। ২০১৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার কয়েকটি ব্যাংকের কম্পিউটার সিস্টেম ও সার্ভার আক্রমণ করে অচল করে দেয়া হয়, ২০১৭ সালে পৃথিবীব্যাপী দুই লাখ কম্পিউটার অচল করে দিয়ে পুনরায় সচল করার বিনিময়ে বিটকয়েন দাবী করা হয়।

৯ সেপ্টেম্বরের সংবাদ পত্রিকার খবর হচ্ছে, মায়ানমারের সরকারি ওয়েবসাইটে ‘তুর্কি হ্যাকারদের’ হানা। মায়ানমারের তথ্য প্রযুক্তি সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক উ ইয়ে নাইং মোয়ের জানান, আরাকানে রোহিঙ্গার ওপর হামলার প্রতিবাদে এই সাইবার হামলা হয়েছে।

কিছুদিন আগে ভারতের একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে কয়েক মিলিয়ন ডলার হ্যাকড্ হয়েছে। ১১ অক্টোবরের একটি দৈনিক পত্রিকায় দেখলাম, উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারেরা দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর ২৩৫ গিগাবাইট সামরিক নথি চুরি করেছে। এই নথিগুলোর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সর্বশেষ যুদ্ধ পরিকল্পনা ও উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্বের হত্যা করার নক্সা রয়েছে।

দুই বছর আগে রুশ হ্যাকাররা ক্যাসপারস্কি সাইবার সিকিউরিটি সফটওয়্যারের গোপনীয়তা ভেদ করেছিল এবং এর মাধ্যমে রুশ হ্যাকারেরা মার্কিন গোয়েন্দাদের বিভিন্ন কর্মসূচি সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করতে চেয়েছিল। ইসরাইলি গোয়েন্দরাও একই সময় এই সফটওয়্যারের গোপনীয়তা ভেদ করতে গিয়ে রাশিয়ানদের এই তৎপরতার কথা জানে, কিন্তু ইসরাইল উচ্চবাচ্য না করে চুপ করে ছিল।

১৩ অক্টোবরের ‘সংবাদ’ পত্রিকার আরেকটি খবর, বড় ধরনের হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষা কর্মসূচির স্পর্শকাতর তথ্য চুরি করা হয়েছে। কম্পিউটার হ্যাকিং করে ২০১০ সনে কয়েক লাখ মার্কিন গোপন নথি ফাঁস করে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের প্রতিষ্ঠিত উইকিলিকস বিশ্বজুড়ে হইচই ফেলে দেয়।

বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে রাশিয়ায় খেলা দেখতে যাওয়া ভক্তদের মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার হ্যাক হয়ে যেতে পারে মর্মে মার্কিন ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন। ‘দ্য ইন্টারভিউ’ চলচ্চিত্রে উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উনকে হেয় করার প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের চলচ্চিত্র নির্মাতা সনি পিকচার্সে হ্যাকারদের আক্রমন হয়েছে; সনি পিকচার্সে এই হ্যাকিংয়ের ঘটনাটিকে মনে করা হচ্ছে সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে ভয়াবহ হ্যাকিংয়ের ঘটনা।

হ্যাকারেরা সনি পিকচার্স থেকে বিপুল পরিমাণ তথ্য হাতিয়ে নেয়া ছাড়াও তাদের হার্ডড্রাইভের অনেক তথ্য মুছেও দিয়েছে। ভারতের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা ম্যাথু স্যামুয়েলের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণের সময় তোলা একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়;

ম্যাথুর অ্যাপল মোবাইলের তোলা ভিডিওর সত্যাসত্য যাচাইয়ে অ্যাপল কোম্পানি ম্যাথুর মোবাইল সেটের পাসওয়ার্ড সরবরাহে অস্বীকৃতি জানালে আদালতের অনুমতিক্রমে ভাড়া করা হ্যাকার দিয়ে অ্যাপেলের ওই মোবাইলের নিরাপত্তা দেয়াল ভাঙার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে হ্যাকারদের ভূমিকা এটমবোমার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে হচ্ছে। যে সফটওয়্যারে যুদ্ধ পরিচালিত হবে, যে প্রোগ্রামের নির্দেশনায় এটমবোমা ছুটে যাবে সেই সফটওয়্যার বা প্রোগ্রাম সক্রিয় না হলে অথবা উল্টাপাল্টা কার্যক্রম প্রদর্শন করলে যুদ্ধে জয়ের আর কোন সম্ভাবনাই থাকবে না।

এখনো একদেশ আরেক দেশকে ইন্টারনেট অচল করে দেয়ার জন্য অভিযোগ করে যাচ্ছে। ফেসবুকসহ সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬ লাখ অ্যাকাউন্ট হ্যাক হচ্ছে। অ্যাপলের প্রোগ্রামিং দুর্ভেদ্য বলে মনে করা হয়; কিন্তু তাদের সফটওয়্যারের নিরাপত্তা দেয়ালের দুর্বলতা চিহ্নিত করে অনেকে অ্যাপল কোম্পানি থেকে পুরস্কৃত হয়েছে। তাই সুইফটের নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করা হলেও যারা হ্যাকার তারাও নিরাপত্তা ভেঙে তার মধ্যে প্রবেশ করার সর্বোচ্চ মেধা প্রয়োগ করে থাকে।

যারা প্রোগ্রাম তৈরি করে তাদের চেয়ে হ্যাকারদের আইকিউ কম নয়। বিশ্বব্যাপী হ্যাকারদের দৌরাত্ম্যের ব্যাপকতা পৃথিবীকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। তাই শক্ত দেয়াল দিয়েও ডিজিটাল পদ্ধতিকে ঝুঁকিমুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। হ্যাকিং-এর এমন অপ্রতিরোধ্য তৎপরতা সম্পর্কে সারা বিশ্ব অবহিত রয়েছে বলেই হ্যাংকড্ হওয়া প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের আমাদের দেশের মতো ঢালাওভাবে দোষারোপ করা হয় না।

আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সংঘটিত হ্যাকারদের তৎপরতা বিচার-বিশ্লেষণ না করে বাংলাদেশ ব্যাংককে দায়ী করার ক্ষেত্রে অনেক অভিজ্ঞ ব্যাংকারকেও বেশি উৎসাহী মনে হয়েছে। ড. আতিউর রহমান অভিমান করে সরে না গেলে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে তার অধিকতর গ্রহণযোগ্যতার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা উদ্ধার আরও সহজতর হতো বলে আমার মনে হয়।

[লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

zeauddinahmed@gmail.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here