ব্যাটিং বিপর্যয়ের কারণে হেরে গেলো বাংলাদেশ,

0
244

সিলেটের আবহাওয়া আজ মেঘলা। মাঝেমধ্যে অবশ্য রোদ উঠছে। আবার সেটি হারিয়ে যাচ্ছে মেঘের আড়ালে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের শিবিরেও শঙ্কার কালো মেঘ। হারটা বোধহয় চোখের সামনেই দেখছে বাংলাদেশ। সেই হারও একেবারে অসহায় আত্মসমর্পণ!

অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহও দাঁড়াতে পারলেন না। টেস্টে সর্বশেষ ১৪ ইনিংসে কোনো সেঞ্চুরি নেই তাঁর। ফিফটি মাত্র দুটি। এরপর বলার মতো ইনিংসটি ৪৩ রানের। সিলেট টেস্ট শুরুর আগে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক বলেছিলেন, অধিনায়কত্বের দায়িত্বই নাকি তাঁকে ভালো খেলতে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু যে সময় তাঁর সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ হওয়া উচিত ছিল, সে সময়টাতেই ব্যর্থ মাহমুদউল্লাহ। সিকান্দার রাজার বলে শর্ট লেগে ক্রেইগ অরভিনের (বদলি ফিল্ডার) ক্যাচ হয়েছেন তিনি। খুব ভালো বলে কি তিনি আউট হয়েছেন? মাহমুদউল্লাহর আউটটি যাঁরা দেখবেন, তাঁরা সেটি বলতেই চাইবেন না! বাজে শট খেলে মধ্যাহ্ন বিরতির ঠিক আগে আউট হয়েছেন নাজমুল হোসেনও। মাভুতার গুগলি কভারের ওপর দিয়ে মারতে গিয়ে সিকান্দার রাজার ক্যাচ এই তরুণ।

জার্ভিসের অফ স্টাম্পের বাইরের বলে ভেতরে টেনে নিয়ে এসে বোল্ড হলেন মুমিনুল হক। হকরাজা এই মুহূর্তে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম। ১৭ ওভার বোলিং করে ৪৩ রানে ৩ উইকেট নিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের ওপেনিং জুটি ৫৬ রানের হলেও মধ্যাহ্ন বিরতিতে যাওয়ার আগেই ৫ উইকেট হারিয়ে রীতিমতো কাঁপছে ৩২১ রানের লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশ। আউট হয়ে প্রথমে ফেরেন লিটন দাস, এরপর একে একে মুমিনুল হক, ইমরুল কায়েস ও মাহমুদউল্লাহ। মধ্যাহ্ন বিরতির সময় বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ৫ উইকেটে ১১১। এক সেশনেই ৫ উইকেট হারিয়ে বসা! ভাবা যায়! উইকেটে আছেন মুশফিকুর রহিম।

বাংলাদেশের পাঁচটি উইকেটই রীতিমতো উপহার দেওয়া। প্রথমে রাজার বলে অহেতুক পুল করতে গিয়ে বলের লাইন মিস করে এলবিডব্লু  লিটন। মুমিনুল জার্ভিসের অফ স্টাম্পের অনেক বাইরের একটি বলে ভেতরে টেনে এনে ‘প্লেইড অন’। ইমরুল রাজার বলে সুইপ করতে গিয়ে স্টাম্প অরক্ষিত রেখে বোল্ড। আর মাহমুদউল্লাহ সুইপ করতে গিয়ে কী যেন করলেন! নাজমুলও যে শট খেলেছেন, সেটি পরিস্থিতির দাবি মিটিয়ে নয়।

হকরাজার বলটিতে কি খুব বেশি টার্ন ছিল? যেটিতে ইমরুল ফিরলেন! খুব বেশি টার্ন না থাকলেও বলটা ছিল ভালো। আর সেই ভালো বলটি ঠিকমতো খেলতে পারলেন না ১০৩ বল খেলা ইমরুল কায়েস। বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসে যাঁর ব্যাট সবচেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছিল, সেই ইমরুল যে এভাবে আউট হবেন, সেটা কে ভেবেছিল।

ইমরুল আগেও একবার বেঁচে গিয়েছিলেন। কাইল জার্ভিসের বলে ইমরুলের শটটি প্রথম ও দ্বিতীয় স্লিপে দাঁড়ানো হ্যামিল্টন মাসাকাদজা ও ব্রেন্ডন টেলরের মাঝখান দিয়ে বল চলে যায় সীমানার বাইরে। চারটি রান পেলেও সেই শটটিতে দায়িত্বের কিছু ছিল না। তবে ইমরুল এরপর ওই ধরনের শট না খেললেও দায়িত্বজ্ঞানহীন শটের বলি অপর ওপেনার লিটন দাস ও ওয়ান ডাউনে নামা মুমিনুল হক।

যদি বাংলাদেশের জয় হয় তাহলে দেড় শ বছরের ইতিহাসে ২১তম ঘটনা হবে

বাংলাদেশে সর্বোচ্চ (৩১৭) রান তাড়াকরে জয় পেয়েছিলনিউজিল্যান্ড। তবে ঘরের মাঠে বাংলাদেশ ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজেরবিপক্ষে ২১৫ রান তাড়াকরে জয় পেয়েছিল। দেশের মাঠে রান তাড়া করে সেটাই ছিলটাইগারদের সেরা জয়। সেই দিক থেকে বললেচলতি টেস্টে জিততে হলে মাহমুদউল্লাহদের রেকর্ড গড়তে হবে।

সিলেটের ঐতিহাসিক অভিষেক টেস্টে বাংলাদেশের জয়ে প্রয়োজন৩২১ রান। তৃতীয় দিনের শেষ বিকালে কোনো উইকেট না হারিয়ে ২৬ রান সংগ্রহ করেছে স্বাগতিকরা। হাতে আছে ১০ উইকেট এবং দু’দিন। এই সময়ে বাংলাদেশকে আরও ২৯৫ রান করতে হবে। আর এটা করতে পারলে নতুন ইতিহাস হবে।তার কারণ বাংলাদেশের মাঠে এত বড় স্কোর তাড়া করে জেতেনি কোনোদল।

চতুর্থ ইনিংসেএই রান তাড়া করা সত্যিই কঠিন। তাছাড়া প্রথম ইনিংসে যারা ১৪৩ রানে অলআউট হয়েছে, তাদের জন্য ৩২১ রান তাড়া করে জেতাবড় চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জ নিতে টাইগাররা কতোটা প্রস্তুত তা সময়ইবলে দেবে।

দেড়শ রানের মধ্যে জিম্বাবুয়েকে আটকানোর লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের। দলীয় ১৩০ রানে সবশেষ স্বীকৃত ব্যাটসম্যান সিকান্দার রাজাকে তাইজুল ইসলাম ফেরালে সেই টার্গেট পূরণ হবে বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু হলো না! সপ্তম উইকেটে রেজিস চাকাভা ও ওয়েলিংটন মাসাকাদজার দৃঢ়তায় অনায়াসে দেড়শ অতিক্রম করল সফরকারীরা।

তবে তাদের গুটিয়ে দিতে খুব একটা সময় লাগেনি টাইগারদের। শেষ পর্যন্ত ১৮১ রানে অলআউট হয়েছে লালচাঁদ রাজপুতের দল। এতে রোডেশিয়ানদের লিড দাঁড়িয়েছে ৩২০ রান। অর্থাৎ জয়ের জন্য বাংলাদেশের ৩২১। হাতে আছে দুই দিন।

দ্বিতীয় দিনের ১ রান নিয়ে সোমবারতৃতীয় দিনে ব্যাট করতে নামে জিম্বাবুয়ে। হ্যামিল্টন মাসাকাদজা ১ এবং ব্রায়ান চারি শূন্য রান নিয়ে খেলা শুরু করেন। সঙ্গে থাকে ১৪০ রানের লিডের আত্মবিশ্বাস। যত দ্রুত সম্ভব জিম্বাবুয়েকে অলআউট করার প্রত্যয় নিয়ে মাঠে নামে বাংলাদেশ। প্রাথমিক লক্ষ্য দেড়শ’র মধ্যে আটকানো। স্বাভাবিকভাবেই ওপেনিং জুটি ভাঙতে আপ্রাণ চেষ্টা চালান বোলাররা। একটু বিলম্বে হলেও সাফল্য পান তারা। ব্রায়ান চারিকে সরাসরি বোল্ড করে সাজঘরে ফেরত পাঠান মেহেদী হাসান মিরাজ।

দলীয় ১৯ রানেই প্রথম উইকেট হারায় জিম্বাবুয়ে। কিন্তু তা আমলে না নিয়ে নেমেই স্ট্রোকের ফুলঝুরি ছোটাতে থাকেন ব্রেন্ডন টেইলর (২৪)। অতি রোমাঞ্চপ্রিয়তার খেসারতও দিতে হয় তাকে। মায়াবি ঘাতক তাইজুল ইসলামের শিকারে পরিণত হন তিনি। তবে এতে বোলারের যতটা না কৃতিত্ব তার চেয়েও বেশি ফিল্ডারের। দুর্দান্ত ক্যাচে অভিজ্ঞ উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যানকে ফেরান ইমরুল কায়েস। মিড অফ থেকে অনেকটা দৌড়ে, পুরোটা সময় বলের দিকে চোখ রেখে দুহাতে দারুণ ক্যাচ নেন তিনি।

এতে দেড়শ রানের মধ্যে জিম্বাবুয়েকে আটকানোর স্বপ্ন দেখতে শুরু করে বাংলাদেশ। কিন্তু বিধিবাম! সেই পথে বাধা হয়ে দাঁড়ান মাসাকাদজা ও শন উইলিয়ামস। শক্ত হাতে দলের হাল ধরেন তারা। ফলে টাইগারদের আশাও ফিকে হয়ে যায়।

তবে লাঞ্চ বিরতির পর পরই সাফল্য পান স্বাগতিকরা। দুর্দান্ত ডেলিভেরিতে শিকড় গেড়ে বসা মাসাকাদজাকে (৪৮) এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলে ফেরান মিরাজ। এতে উইলিয়ামসের সঙ্গে ভাঙে অধিনায়কের ৫৪ রানের বিপজ্জনক জুটি। ফলে ফের দেড়শ’র মধ্যে সফরকারীদের প্যাকেট করার স্বপ্ন বুনে বাংলাদেশ।

খানিক পর প্রতিপক্ষ শিবিরে তাইজুল ইসলাম জোড়া আঘাত হানলে সেই পথে অনেকটা এগিয়ে যান টাইগাররা। এ পরীক্ষিত সৈনিক ৪২ ওভারের পঞ্চম, ষষ্ঠ বলে বোল্ড ও ক্যাচ বানিয়ে যথাক্রমে ফিরিয়ে দেন ইনফর্ম উইলিয়ামস (২০) ও পিটার মুরকে (০)। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সিকান্দার রাজাকে (২৫) সরাসরি বোল্ড করে এ বাঁহাতি স্পিনার ফেরালে সেই আশা পূরণ হবে বলেই মনে হচ্ছিল।

আবারো বাংলাদেশের হয়ে বোলিং আক্রমণে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাইজুল। ফের তার স্পিন বিষে নীল হয়েছে জিম্বাবুয়ে। প্রথম ইনিংসের (৬ উইকেট) মতো দ্বিতীয় ইনিংসেও ৫ উইকেট শিকার করেছেন তিনি। এতে টেস্ট ক্যারিয়ারে এ স্পিন জাদুকরের সাফল্যে যোগ হয়েছে আরেকটি পালক। এ নিয়ে পঞ্চমবারের মতো ৫ উইকেট শিকার করলেন তিনি। এদিন তাকে যোগ্য সমর্থন দিয়েছেন অপর দুই স্পিনার মিরাজ ও অপু। তাদের শিকার যথাক্রমে ৩ ও ২ উইকেট।

কিন্তু হয়নি! সপ্তম উইকেট জুটিতে বাংলাদেশকে বিরক্ত করেন রেজিস চাকাভা ও ওয়েলিংটন মাসাকাদজা। দুজনে গড়েন ৩৫ রানের জুটি। তবে দলীয় ১৬৫ রানে মাসাকাদজাকে এলবিডব্লিউ করে মিরাজ ফেরালে তালগোল পাকিয়ে ফেলে জিম্বাবুয়ে। পরক্ষণেই নাজমুল ইসলাম অপুর শিকার হয়েফেরেন চাকাভা ও ব্রেন্ডন মাভুতা। আর টেন্ডাই চাতারাকে এলবিডব্লিউ করে প্রতিপক্ষ শিবিরে শেষ পেরেকটি ঠুকেন গোটা দিন দুর্দান্ত বল করা তাইজুল। অবশেষে ১৮১ রানে গুটিয়ে যায় জিম্বাবুয়ে।

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ঘরের মাঠ সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রথম টেস্টে মহাবিপাকে পড়েছে বাংলাদেশ। আজ সবেমাত্র ম্যাচের তৃতীয় দিন।

কিন্তু এখনই জয়-পরাজয়ের হিসাব শুরু হয়ে গেছে। কারণ জিততে হলে বাংলাদেশকে করতে হবে ৩২১ রান। যা ১৪১ বছরের টেস্ট ইতিহাসে ঘটেছে মাত্র ২০ বার! আর ড্র করতে হলে খেলতে হবে আরও দুই দিন। কোনটা বেছে নেবে টাইগাররা?

যে কোনো দলের জন্যই চতুর্থ ইনিংসে ব্যাট করা ভীষণ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। শরীর আর উইকেট দুটোই ব্যাটসম্যানদের চরম পরীক্ষা নেয়। ক্লান্তি চেপে বসে শরীরে। সেই সঙ্গে আছে জয়ের জন্য টার্গেট চেজ করার মানসিক চাপ। প্রতিপক্ষ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জয় এবং ড্র দুটির সম্ভাবনা রেখেই নিজেদের ইনিংস শেষ করে।  টেস্ট ক্রিকেটের ২ হাজার ৩২৩ তম ম্যাচে জিম্বাবুয়ে বাংলাদেশকে দিয়েছে ৩২১ রানের লক্ষ্য।

দেড়শ বছরে ৩২১ কিংবা এর বেশি রান তাড়া করে জেতার নজির আছে ২০টি। উপমহাদেশে এর সংখ্যা মাত্র ৫টি!

চতুর্থ ইনিংসে বাংলাদেশ তিন শ পেরিয়েছেই মাত্র তিনবার। তিনবারই বাংলাদেশ হেরেছে। এর মধ্যে ২০০৮ সালে মিরপুরে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে চতুর্থ ইনিংসে ৪১৩ রান করেছিল বাংলাদেশ। এটাই চতুর্থ ইনিংসে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ। টেস্টে চতুর্থ ইনিংসে চার শ কিংবা এর বেশি রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড আছে মাত্র চারটি। সর্বোচ্চ রেকর্ডটি ওয়েস্ট ইন্ডিজের। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪১৭ রান তাড়া করে জিতেছিল এক সময়ের প্রবল পরাক্রমশালী দলটি।

আর টেস্ট ইতিহাসে ৩শর বেশি রান চেজ করে জয়ের রেকর্ড আছে মাত্র ৩০ টি। তাছাড়া বাংলাদেশ চতুর্থ ইনিংসে রান তাড়া করে জিতেছে মাত্র তিনবার। ২০১৭ সালে নিজেদের শততম টেস্টে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১৯১ রান, ২০১৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে  ১০১ রান তাড়া করে জিতেছিল। এছাড়া নিজেদের সর্বোচ্চ ২১৫ রান তাড়া করে ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে জিতেছিল বাংলাদেশ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here