ওদের কথাও শুনুন!

0
487

রাশেদ আলম: একটি সহজ হিসাব দেই – যারা এই সড়ক সার্কাসকে সমর্থন করছে তাদের জন্য।

একটি লেগুনা – দৈনিক হিসাব

জিগাতলা বাস স্টান্ডে – ১৬০/- টাকা
স্টারাকাবাব মোড়ে- ৮০/- টাকা
মোহাম্মদপুর বাস স্টান্ডে – ১৮০/- টাকা
শিয়া মর্সজিদ মোড় – ১৬০/- টাকা
শ্যামলী মোড়ে – ২৪০/- টাকা
কল্যানপুর – ১৬০/- টাকা
টেকনিকেল মোড় – ১০০/- টাকা
মিরপুর ১ নাম্বার – ৩২০/- টাকা
টিআই অফিসের টোকেন – ৩০০/- টাকা
গাড়ী জমা – ১৫০০/- টাকা।
গ্যাস ও তাদের পেট খরচ ভেরিয়েবল।

মাসে মাত্র পনের দিন কাজ করতে পারবে, মানে একদিন পর একদিন৷

সিটের ভাড়া আদায় একটিপে ( আপডাউন – একটিপ) গড়ে সারে তিনশত টাকা।

সকাল পাচটা থেকে রাত একটায় পর্যন্ত তাদের কার্যদিবস হয়৷ এই অমানুষিক পরিশ্রমের বিনিময়ে একজন ড্রাইভার গড়ে সাত থেকে আটশত টাকা ও হেল্পার তিন শতটাকা ঘরে নিতে পারে। তাদের আয়ের ৭০% দিয়ে দিতে হয় প্রশাসন ও সরকারি দলের কাছে৷ বাসের হিসাবটাও একি রকম৷ আর এটা শুধু বর্তমান আওয়ামী সরকার নয়, বিএনপি- জামাত এমনকি আপনাদের অতি ভালোবাসার সামরিকার্টুন তত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও ছিলো৷ শুধু বার্ষিক বাজেটের মত চাঁদা ও ঘুসের রেট বাড়ছে এই যা।

গণপরিবহন বাসের ক্ষেত্রেও এই হার সমানুপাতিক হারে বেশী দিতে হয়৷ আমার এই হিসেব শতকরা ১০% হেরফের হতে পারে খুব বেশী হলে। গণপরিবহনে রোড পারমিট, লাইসেন্স, ফিটনেস এসব দেখার টাইম নেই সেই ত্রিশ চল্লিশ বছর থেকেই বাংলাদেশে৷ আজকে যারা এসব অশিক্ষিত, অসহায় ড্রাইভারদের বেপরোয়া বলে স্কুলের বাচ্চাদের লেলিয়ে দিচ্ছেন তাদের স্রেফ ছাগলের বাচ্চা ছাড়া আমার এই মুহুর্তে কিছুই আসছে না মুখে৷ লাইসেন্স আর ফিটনেস রাখবে ড্রাইভারেরা, তা দিয়ে কি হবে? তা কে চেক করে? চেক করা হয় শুধুই টোকেন৷ যখন শুধু মাত্র এক্সিডেন্ট হয় তখন এসব দিয়ে মামলা করার জন্য প্রয়োজন হয়।

আমি ২০০৪ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত চাকুরীর কারনে দেশের ৬৪ জেলায় যেতাম, মাসের বিশ দিন রাতেই গাড়ীতে থাকতে হত। তখন নিজ চোখে অনেক কিছুই দেখেছি। এই যে বেপরোয়া ড্রাইভারদের গালি দিচ্ছেন, বাচ্চাদের লেলিয়ে দিচ্ছেন তাদের মারতে অথচ আমি দেখেছি এই ড্রাইভারেরা রাস্তায় কত অসহায় মানুষকে সাহায্য করতে, বিনা পয়সায় নিয়ে যেতে৷ হ্যা তারা অশিক্ষিত তাই তাদের ভাষা হয়ত খারাপ। তারা অনেক সময় এক্সিডেন্ট করে আহতকে সাহায্য করতে পারে না কেন জানেন, কারন রাস্তায় হুজুগেদের অভাব নেই, কার কি দোষ না দেখেই ড্রাইভারদের পশুর মত মারা শুরু করে। তারা নিজের জীবন বাঁচাতেই তখন পালিয়ে যায়।

হাইওয়েতে বা শহরে এক্সিডেন্ট এর জন্য সব থেকে বড় কারন প্রাইভেট কার-মাইক্রো। এটা শুনে অবাক না হয়ে একদিন ঢাকা চট্রগ্রাম হাইওয়ে তে সামনে বসে খেয়াল করলেই বুঝবেন৷ একটি লোড ট্রাক বা বাস চাইলেই ব্রেক করতে পারে না, যারা ড্রাইভিং জানেন তারা স্বীকার করতে বাধ্য হবেন। অথচ প্রায় সময় দেখবেন কার – মাইক্রো কি রাফভাবে তাদের ওভারটেক করছে, এক পাশে চাপ দিচ্ছে। আবার বাসের ড্রাইভারকে গতি ধরেই চালাতে হবে, না হলে বাসে বসা আপনাদের মত সুশিলরা ড্রাইভারের বাপ মা কে গালি দিয়ে ভাসায় দিবেন, দেরীতে পৌঁছানোর জন্য। আপনার মত আতেল বাসে বসে আরকেটি বাস যদি ওভারটেক করে তখনো আপনি গালি দিবেন সেই ড্রাইভারকে।

আর পথচারী তো তাদের বাপের কেনা রাস্তাভাবে সবসময়৷ আপনি বুকে হাত দিয়ে বলুনতো কতদিন আপনি ফুট ওভারব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার হয়েছেন? কত দিন সিগন্যাল পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন? যখন স্টিয়ারিং সিটে বসবেন তখন বুঝবেন, সিগনালে কেন গাড়ির গতি বাড়িয়ে পার হতে হয়, এটা নিজে না করলে বুঝানো যাবে না। রাস্তায় মাঝে দাঁড়ায় লাফায় লাফায় গাড়িতে উঠবেন , আর পিছন থেকে অন্য গাড়ি এসে ধাক্কা দিলে বলবেন ড্রাইভার কেন এত জোরে গাড়ি চালাইছে।

এসব কাগজ চেক করে কি হবে? ড্রাইভারেরা আপনার মত মাস্টার ডিগ্রিধারী না। তারা যা করে অনেকটা বাধ্য হয়েই অথবা প্রচন্ড মানুসিক চাপ থেকেই করে৷ তারাও মানুষ, তাদেরও পরিবার আছে। আমি নিজে দেখেছি, রাস্তায় সামান্য কুকুর বাঁচাতেও তারা তাদের সব দিয়ে চেষ্টা করে৷ হাইওয়েতে আমি নিজে দেখেছি, রাস্তার একজনের গায়ের উপর তুলে দিয়ে হত্যা করতে পথচারীকে কারন, সেই পথচারীকে বাঁচাতে গেলে বাসের ভিতরে বসা মানুষদের জীবন দিতে হত। রাত তিনটায় গাড়ী একশত কিলো স্পিডে চলছে, আর একজন দাত খিলাল করতে করতে বাপের রাস্তা পার হচ্ছে ডান বাম না দেখেই। তখন ড্রাইভার কি করবে?

নিজে ঘুষ খাচ্ছেন, গাড়ী কিনছেন অবৈধ টাকায় সেই গাড়িতে করে পারলে হাগতে যাওয়ার জন্য রোডে বার করে রোডের প্রেসার বাড়াচ্ছেন। যারা সৎ অর্থে গাড়ি কিনেছেন তাদের বলছি না, যদিও এই সৎ মানুষের সংখ্যা ৫% আছে কি না সন্দেহ।

আরে ভাই আগে ড্রাইভারদের নিশ্চয়তা দিন, শুধু সঠিক কাগজ থাকলেই চলবে। মোড়ে মোড়ে চাঁদা দিতে হবে না, ট্রাফিকের টি আই অফিসে টাকা দিতে হবে না। তারপর আইসেন এই অশিক্ষিত মুর্খ বেপরোয়া ড্রাইভারকে গালি দিতে, মারতে।

আর শাহাজানের অট্টহাসি নিয়ে যাদের এত মাথা ব্যাথা, এত মানবিকতা বানী তারা কই? যেয়ে দেখেন বিশ লাখ পেয়ে ওই বাচ্চার বাপেও হাসি মুখে প্রেস কর্নফারেন্স করছে। তাইলে গালী কি সেই বাপেরেও কিছু দেয়া উচিত নয়? সে বিচার চাওয়া বাদ দিয়ে চেক নিতে দৌড় দিসে, দেখছেন কি?

এই স্কুলের বাচ্চাদের আর লেলিয়ে দিয়েন না, আগে নিশ্চিত করুন রাস্তায় চাঁদাবাজি ও ট্রাফিক, পুলিশ, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি বন্ধ করা। প্রতিটি নাগরিক ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলা, তারপর এই ড্রাইভারকে ধরতে আসেন। তার আগে শুধু এই ড্রাইভারের ঘাড়ে দোষ দেবার নৈতিক কোন অধিকার আপনার নেই। জানেন কি, এই একদিন বাস চালাতে না পারার কারনে হয়ত একটি পরিবার সারাদিন না খেয়েই কাটাতে হচ্ছে।

আগে নিজে শুদ্ধ হোন, সন্তানের মুখে সৎ উপার্জনের খাবার তুলে দিন তারপর এসব নৈতিকতা চোদাইতে আসবেন। আর যারা বলবেন, সবাই তো দুর্নীতি করে না, তাদের তো দিন রাত থাবড়ানো দরকার। কারন এই যে ব্যাতিক্রম কে উদাহরণ বানিয়ে বেশী ভাগ দুর্নীতিবাজদের তারাই উৎসাহিত করছেন।

আর পুলিশদের গালি দিবেন, জানেন কি একজন পুলিশ অফিসার হতে গেলে কতটাকা ঘুষ দিতে হয়? সে তার দেয়া ঘুষের টাকা তো ঘুষ খেয়েই তুলতে হবে তাই না? না কি আপনার মেয়ের বিয়ের যৌতুক দিয়ে তাদের টাকা ফেরত দেবেন?

এখনি এসব বাচ্চাদের রাজপথ থেকে ফেরত যেতে বলুন। আর আগামী রবিবার থেকে নিজে অন্তত ঘুষ খাবেন না, দিবেন না এবং রাস্তায় সকল নিয়ম মেনে চলবেন এই শপথ করুন। দেশ বাঁচবে তাতে আমি ও আপনিও বাঁচবেন তাতে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here