একাত্তুরের সেপ্টেম্বরনামা (১৩)

0
193

সালাহ উদ্দিন: ১৯৭১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রচারণা চালানোর উদ্দেশ্যে রেডিও পাকিস্তানে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন গভর্নর ডাঃ এ.এম.মালিক। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গভর্নর ছাত্রদেরকে কোন ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপে অংশ না নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগ দেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশ এক সংকটময় সময় অতিবাহিত করছে এই সঙ্কট কালীন সময়ে ছাত্রদের আগাইয়া আসতে হবে। ভবিষ্যৎ নেতৃত্বর জন্য ছাত্ররা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

এদিন জমিয়তে উলামা ইসলাম (হাজারভি) এর সাধারন সম্পাদক মুফতি মাহমুদ সারগোদায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে উপ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য অবিলম্বে রাজনীতির উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহবান জানান। তিনি পূর্ব পাকিস্তানে গঠিত মন্ত্রি সভা অবৈধ আখ্যা দিয়া তা বাতিল করার দাবি জানান। তিনি বলেন, এই মন্ত্রি সভা আসন্ন উপ নির্বাচন প্রভাবিত করবে। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে বেসামরিক সরকার গঠনের দাবি জানান। তার দলের পশ্চিম পাকিস্তান সাধারন সম্পাদক গাউস হাজারভি ও একই দাবি জানান। তিনি বলেন, রাজাকার বাহিনীতে শুধু জামায়াতের লোক নেয়া হয়েছে তিনি এই বাহিনীতে অন্যান্য দলের কর্মীদের নেয়ার দাবী জানান।

পরদিন ২৭ সেপ্টেম্বর শেখ মুজিবের মুক্তি দাবি করেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ন্যাপ এর অল পাকিস্তান প্রধান ওয়ালী খান। এই দলের পূর্ব পাকিস্তান শাখা স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেয়। আওয়ামী প্রীতির কারনে পরে দলটিকে পরে নিষিদ্ধ করা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনের পর দলের নাম পরিবর্তন করে নতুন ভাবে আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টি নামে কার্যক্রম শুরু করে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তৃতাকালেবাংলাদেশের পরিস্থিতি উল্লেখ করে ভারতে অবস্থানকারী শরণার্থীদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি ও আওয়ামী লীগের সাথে একটি মীমাংসায় আসার জন্য পাকিস্তানিদের প্রাত আহ্বান জানান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং।

সরদার শরণ সিং এর বক্তৃতার সময় পাকিস্তানের পক্ষ থেকে দুইবার বাধা দেয়া হয় তা সত্ত্বেও সরদার শরণ সিং তার বক্তৃতা অব্যাহত রাখেন। সউদি প্রতিনিধিও মাঝে মাঝে সরদার শরণ সিং কে বিব্রত করেন। সাধারন পরিষদের সভাপতি আদম মালিক ও তার বক্তৃতায় হস্তক্ষেপ করেন। সরদার শরণ সিং সউদি দাবি তাৎক্ষনিক প্রত্যাখ্যান করেন।

সাবেক বিরোধী দলীয় উপনেতা পাকিস্তান ন্যাশনাল লীগ নেতা এবং জাতিসংঘে পাকিস্তানী প্রতিনিধিদলের সদস্য শাহ আজিজ যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে পাকিস্তান স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন ফান্ড রেইজিং ডিনারে বলেন ভারত শরণার্থীদের ফিরতে বাধা দিচ্ছে। শরণার্থীদের ফেরাতে ভারতকে চাপ দেয়ার জন্য তিনি বৃহৎ শক্তির কাছে আহবান জানান। অনুষ্ঠানে অনেক গণ্যমান্য মার্কিন নাগরিক উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে, মওলানা এম.এম.মান্নানের নেতৃত্বে মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতির ২৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি প্রতিনিধিদল ‘খ’ অঞ্চলের সামরিক আইন প্রশাসক লে: জেনারেল নিয়াজীর সাথে দেখা করেন। সাক্ষাতে মওলানা মান্নান বলেন, পাকিস্তানের নিরাপত্তার জন্য ২৫০০০ মাদ্রাসার শিক্ষক পূর্ণ সহযোগিতা করবেন। তাহারা পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও ইসলামের গৌরব অক্ষুন্ন রাখার উদ্দেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে একযোগে কাজ করে যাবেন। তিনি লে: জেনারেল নিয়াজীকে একটি কোরাআন শরিফ উপহার দেন। নিয়াজি ইসলামকে রক্ষা ও উহার উন্নতির জন্য উলেমা সম্প্রদায়ের অবদানের প্রশংসা করেন।

অন্যদিকে, সিএসপি কফিল উদ্দিন মাহমুদকে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের অতিরিক্ত মুখ্য সচিব (উন্নয়ন) পদে বদলী করা হয়। স্বাধীনের পর কফিলউদ্দিনের চাকুরী অব্যাহত থাকে এবং এরশাদের আমলে অর্থমন্ত্রী হন। কাইউম মুসলিম লীগের দুই শীর্ষ নেতা কাজী কাদের ও ঠাণ্ডা মিয়া ভুটটো এর করাচীর ক্লিফটন রোডের বাসায় সাক্ষাৎ করেন। দুই নেতা সাংগঠনিক কাজে করাচী অবস্থান করছিলেন। তারা পূর্ব পাকিস্তানেরসহ তাদের দলীয় কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করেন।

এদিন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য তিনদিনের সরকারী সফরে মস্কো পৌঁছান। বিমান বন্দরে তাকে স্বাগত জানান সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী আলেক্সি কোসিগিন। প্রধানমন্ত্রীর সচিব ডি পি ধর তাহার সফর সঙ্গী ছিলেন। আর বোম্বাই, ভারতীয় নৌ বাহিনী প্রধান এসএম নন্দ এখানে বলেন পাক ভারত সম্পরকের ক্ষেত্রে আগামী কয়টি মাস অত্যন্ত সঙ্ক জনক হবে। তিনি নৌ বাহিনীর সকল জওয়ান ও অফিসারকে যে কোন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন। তিনি বলেন, আমরা শিথিল থাকতে পারি না। আমাদের জাহাজ ও সরঞ্জাম অবশ্যই জরুরী মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হইবে। তিনি সেখানে বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ অফিসার ও জওয়ানদের মধ্যে পদক বিতরন করেন।

তবে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক গোলযোগের সময় যে সব লোক বিপথগামী হয়েছে তাদের ক্ষমা করায় ইয়াহিয়ার প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করেন সোহরাওয়ারদি কন্যা আখতার সোলায়মান। তিনি বলেন, উত্তেজনা বশত বা চাপের কারনে এমন ভুল হয়ে থাকে। যারা এমন ভুল করে তাদের জন্য সাধারন ক্ষমা এবং স্বগৃহে ফেরত আসার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। সীমান্ত অতিক্রম করে যারা ভারত যান তাদের ফিরে আসার জন্য তিনি আহবান জানান। তিনি বলেন, ভারত শরণার্থী প্রত্যাবর্তনে বাধা সৃষ্টি করছে এবং বিপথগামীদের অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here