বিগত সরকারের সময় বাংলাদেশের বেকার যুবসমাজকে কর্মমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তোলা এবং দেশের ক্রমবর্ধমান বেকার সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর কর্তৃক EARN প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকার ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে গ্রহণ করা হয়, যেখানে বাংলাদেশ সরকার ওয়ার্ল্ড ব্যাংক থেকে প্রায় ৩,২৪০ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করে।
ডিপিপি ও প্রকল্প প্রস্তাবনা যথাযথভাবে অনুমোদনের পর প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য একজন প্রকল্প পরিচালক (PD) নিয়োগ প্রদান করা হয়। ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পের মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১,২০০ কোটি টাকা বাজেটের আওতায় সারা দেশকে দশ (১০)টি প্যাকেজে বিভক্ত করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) নিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এ লক্ষ্যে EOI (Expression of Interest) আহ্বান করে সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিলিয়ে ৪০০-এরও অধিক এনজিও তাদের EOI প্রস্তাবনা দাখিল করে। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর EOI দাখিলকারী এনজিওসমূহের মধ্য থেকে দেশীয় স্বনামধন্য ও কয়েকটি আন্তর্জাতিক এনজিওসহ মোট ২৮টি এনজিওকে ধারাবাহিকভাবে দশটি প্যাকেজে শর্টলিস্ট করা হয়।
এরপর নির্ধারিত গাইডলাইন অনুসরণ করে বিভিন্ন প্যাকেজে শর্টলিস্টকৃত BRAC, TMSS, Pdokhap, Sushilon, RIC, VOSD, Caritas, Uttaran, SUS, AAS, DAM, VARD, DORP, Samahar, ESDO, Labour Foundation,Risda, Bangladesh Women Society, Potashi, EDUCO, Plan International, Care Bangladesh ও Save the Children—এই ২৮টি এনজিওকে RFP (Request for Proposal) দাখিলের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে পত্রের মাধ্যমে আহ্বান জানানো হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট এনজিওসমূহ যথাসময়ে তাদের প্রকল্প প্রস্তাবনা দাখিল করে।
প্রকল্পের যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়নের জন্য গঠিত এভ্যালুয়েশন কমিটি প্রথম ধাপে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে প্রস্তাবনাসমূহ মূল্যায়ন করে নম্বর প্রদান করে। এর ফলে চট্টগ্রাম ৯.৩ প্যাকেজে বাংলাদেশের স্বনামধন্য এনজিও TMSS সর্বোচ্চ ৯২.৭২ নম্বর পেয়ে প্রথম স্থান,প্রত্যাশী এনজিও ৯১.২৫ নম্বর পেয়ে দ্বিতীয় স্থান, এবং Save the Children ৯০.৬৪ নম্বর পেয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করে। একইভাবে অন্যান্য প্যাকেজেও যথাযথ ও ন্যায়সংগত মূল্যায়নের মাধ্যমে এনজিওগুলোর একটি প্রাথমিক চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করা হয়।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে দেশীয় স্বনামধন্য এনজিওসমূহ অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে দেশের সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী উন্নয়ন, যুব উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক সুরক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে এসব এনজিও দীর্ঘদিন ধরে সফলভাবে উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছে।
দেশীয় এনজিওগুলোর অন্যতম শক্তি হলো—তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও মাঠপর্যায়ে সুদৃঢ় উপস্থিতি। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় এসব সংস্থার নিজস্ব অফিস, প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ জনবল এবং দীর্ঘদিনের বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। স্থানীয় বাস্তবতা, সংস্কৃতি ও জনগণের চাহিদা সম্পর্কে গভীর ধারণা থাকায় তারা দ্রুত, স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষম।
অপরদিকে, বিদেশি সংস্থাসমূহ মূলত ডোনার বা অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। সাধারণত তারা সরাসরি মাঠপর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে দেশীয় এনজিওসমূহের মাধ্যমে তাদের উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে থাকে। এসব বিদেশি সংস্থার বাংলাদেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক অফিস, স্থায়ী অবকাঠামো কিংবা মাঠপর্যায়ে দক্ষ ও পর্যাপ্ত জনবল নেই বললেই চলে।
তবে পরবর্তী দ্বিতীয় ধাপে কিছু বিদেশি এনজিওর বিভিন্ন ধরনের চাপ ও প্রভাবের মুখে প্রকল্প পরিচালক অনিয়মের আশ্রয় গ্রহণ করেন। তার সরাসরি নির্দেশনায় বিদেশি এনজিওগুলোকে অস্বাভাবিকভাবে বেশি নম্বর প্রদান করে প্রকল্প পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত (ইনসিওর) করার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রকল্প পরিচালকের এই নির্দেশনার আলোকে একই এভ্যালুয়েশন কমিটিকে দিয়ে পুনরায় মূল্যায়ন করানো হলে অধিকাংশ প্যাকেজে বিদেশি এনজিওগুলোকে এগিয়ে রাখা হয়।
পরবর্তীতে প্রকল্প পরিচালক ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তার প্রত্যাশা অনুযায়ী ফলাফল না আসায়, তারা প্রকিউরমেন্ট কমিটিকে পাশ কাটিয়ে একজন বহিরাগত কনসালটেন্ট নিয়োগ করেন। উক্ত কনসালটেন্টের নির্দেশনা অনুযায়ী তৃতীয় ধাপে প্রকল্প উপস্থাপনা মূল্যায়ন করা হয়। এই ধাপে পূর্বে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী অধিকাংশ দেশীয় স্বনামধন্য এনজিওকে অনিয়ম ও পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অযোগ্য ঘোষণা করা হয় এবং বিদেশি কয়েকটি এনজিওকে প্রকল্প পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
পরবর্তীতে প্রকল্প পরিচালক সংশ্লিষ্ট প্রকিউরমেন্ট কমিটির কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে স্বাক্ষর গ্রহণ করেন। সর্বশেষে, ১৮/০১/২০২৬ ইং তারিখে পৃথক পৃথকভাবে আটটি প্যাকেজের RFP ফলাফল রাত আনুমানিক ৮টার পর ই-মেইলের মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়।







